একজন আজমল হোসেন|পর্ব-১

ফরহাদ হোসেন

ঘুম ভাঙতেই রঞ্জুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

চোখ মেলে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই দেখল কনুইয়ে ভর দিয়ে সোমা ঠিক তার মুখের উপরে তাকিয়ে আছে। সোমার এভাবে তাকিয়ে থাকার অর্থ রঞ্জু জানে। আরেকটা সকাল শুরু হবে ঝগড়া দিয়ে। তাই সে যথাসম্ভব নিজেকে সতর্ক করে নিল। সোমা যত কিছুই বলুক, তাকে কিছুতেই রেগে যাওয়া চলবে না। রঞ্জু মুখ ঘুরিয়ে পাশ ফিরে শুলো।

সোমা বলল, ‘এদিকে ঘোরো।’

রঞ্জু শক্ত হয়ে পড়ে রইল।

‘কি, কথা কানে যায় না?’

‘যাচ্ছে, বলো।’

‘তুমি কি দেশে টাকা পাঠিয়েছ?’

রঞ্জু চুপ। সোমা বলল, ‘কথা বলছ না কেন?’

‘কথা বলছি না, কারণ এত সকালে তোমার সাথে ঝগড়া করার কোনো শখ আমার নেই।’

‘আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই তোমার কাছে ঝগড়া মনে হয়?’

রঞ্জু কোনো উত্তর না দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। সে লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল, এবং ইচ্ছে করেই বেসিনের পানি ছেড়ে রাখল যাতে সোমার কোনো কথা শোনা না যায়।

কিছু জিজ্ঞেস করলেই রঞ্জু এড়িয়ে যায়। রঞ্জুর এই স্বভাবটা সোমার মোটেও পছন্দ না। সে গলার স্বর উঁচু করে বলল, ‘কিছু বললেই তুমি এড়িয়ে যাও। এসবের মানে কী রঞ্জু? এভাবে কি সংসার করা যায়?’

রঞ্জু কিছু বলছে না দেখে সোমা সাময়িক বিরতি দিল। কিছুক্ষণ পর রঞ্জু বের হয়ে এলো। ক্লজেট থেকে কাপড় বদলে কাজে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে ঢুকল কিচেনে। ফ্রিজ খুলে দেখল কী খাওয়া যায়।

সোমা পিছে পিছে এসে বলল, ‘তোমাকে বিয়ে করে কী পেয়েছি আমি? কী দিয়েছ তুমি আমাকে? না সুখ, না টাকা-পয়সা।’

রঞ্জু জবাব দিল না।

‘নাকি ভেবেছ বিয়ে করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছ—এই তো যথেষ্ট!’

রঞ্জু ভেবেছিল সোমার কোনো কথার উত্তর না দিয়ে সে চলে যাবে। কিন্তু সে আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। কাজে যাবার মুহূর্তে সোমার এধরনের কথায় রঞ্জু খুবই বিরক্ত হলো। সে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘দেখো সোমা, তুমি যা বলছ সেটা ঠিক না। তোমাকে সুখী করার চেষ্টায় কোনরকম ত্রুটিই আমি করি না। তুমি যখন যেটা চাও, যেভাবে চাও, দেওয়ার চেষ্টা করি।’ রঞ্জু ফ্রিজের ভেতর আরেকবার তাকিয়ে ফ্রিজ বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল সোমার সামনে। তারপর বলল, ‘তোমাকে সুখী করার আর কোনো উপকরণ আমার কাছে নেই।’

সোমার কণ্ঠে কোনো পরিবর্তন হলো না। সে একইরকম উচ্চৈঃস্বরে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। আমিও তোমার জন্য কিছু কম করি না, রঞ্জু। তুমি যেমন বাইরে কাজ করো, আমিও তেমনি ভেতরের কাজ করি। একজন কাজের মেয়ে এবং ওয়াইফ—দুজনের কাজই আমাকে করতে হয়। ক্লিনিং—লন্ড্রিইং—কুকিং সব আমিই করি।’ একটু থেমে সোমা আবার বলল, ‘তোমার তো আবার ফ্রিজের খাবারে মন ভরে না। তজ্জন্যে প্রতিদিন ফ্রেস রান্না করি। কি করিনা?’

‘আমি বলছি না যে তুমি আমার জন্য কিছু করো না। আমি শুধু বলছি, অন্য কারো সঙ্গে আমাকে কমপেয়ার করাটা আমি একদম পছন্দ করি না।’

সোমা চোখ উলটে তাকাল।

রঞ্জু আবার বলল, ‘আচ্ছা, আমি যদি প্রতিদিন ঘরে ঢুকেই তোমাকে বলি—দেখতো পাশের বাসার শীলা ভাবি কীভাবে তার হাজব্যান্ডকে টেক কেয়ার করে সে বাসায় এলে? তখন তোমার কেমন লাগবে?’

সোমা চোখ বড় করে রঞ্জুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কী করে জানো, শীলা ভাবী কীভাবে তার হাজব্যান্ডকে টেক কেয়ার করে? ও তাহলে এই কথা? এর মধ্যে তার উপরও তোমার চোখ পড়ছে, হ্যাঁ?’

‘আরে বাবা, ব্যাপারটা সেরকম না। কারো ওপরই আমার চোখ পড়ে নাই। আমি একটা এক্সাম্পল দিলাম মাত্র। এখন দয়া করে একটু চুপ করো তো। সারাক্ষণ চেঁচামেচি ভাল লাগে না।’

‘কি! আমি সারাক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচি করি? আমি শুধু জানতে চাইছি, সারাদিন এত কাজ করো, টাকাগুলো যায় কোথায়?’ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রতিবাদে ফেটে পড়ল সোমা।

রঞ্জুর খুব ইচ্ছে হলো বলতে, ‘কোথায় যায় তুমি জানো না? দুই-এক মাস পরপর যে একটা করে গোল্ডের সেট কেনো, সেগুলা কিনতে কি পয়সা লাগে না?’ কিন্তু সেটা না বলে সে বলল, ‘দেখো, এই একই কথা আর কত বার জিজ্ঞেস করবে? যতবারই জিজ্ঞেস করো না কেন, আমার উত্তর একটাই। আই ডোন্ট নো। ওকে? হ্যাপি—ইউ হ্যাপি?’

‘আহা সত্যি কথাটা বললেই তো হয়ে যায়। বলছ না কেন?’ গলার স্বর খানিকটা পরিবর্তন করে বলল সোমা।

রঞ্জুর কোনো ভাবান্তর হলো না।

‘আমার ধারণা, হয় তোমার একটা এফেয়ার আছে—আর নয় তুমি লুকিয়ে দেশে টাকা পাঠাও। যদি দেশে পাঠাও—ফাইন, আমি কি তোমাকে সেটা নিয়ে কখনো কিছু বলব নাকি? তুমি তোমার মা ভাইবোনকে টাকা পাঠাবে তাতে আমার বলার কী আছে?’

রঞ্জু সোমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে যেন নিজের কাছেই বলল, ‘আমার মা ভাইবোনকে পাঠাতে পারলে তো ভালই হতো! তার আগেতো তুমিই… ধ্যাত, এর সাথে এইসব কথা বলার কোন মানে হয় না।’ রঞ্জু এবার বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি আসলেই খুব বেশি কথা বলো।’

‘কি, বেশী কথা আমি বলি? ফাইন, আর বলবো না। প্রমিজ। আর জিজ্ঞাসাও করব না, তুমি কীভাবে জানো যে শীলা ভাবি তার হাজব্যান্ড বাসায় এলে কী করে। অথবা তুমি তার সঙ্গে লুকিয়ে কথা বলো কি না। শুধু আসল কথাটা আমায় বলো…’

‘বুঝছি, তুমি তো আসলে থামার মানুষ না। একবার শুরু করলে এইযে রেলগাড়ির মত চলতে থাকো… ম্যান, আই’ম আউট অফ হিয়ার!’ বলেই রঞ্জু চলে যেতে উদ্যত হলো।

সোমা দরজা আগলে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আউট অফ হিয়ার মানে? কোথায় যাবে তুমি?’

‘কোথায় আবার, মরতে। ভাবছি গাড়ির নিচে লাফ দেবো।’

রঞ্জু সোমার হাত সরিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

সোমা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ফাইন। মরো গিয়ে, তুমি মরলে আমিও একজন খুঁজে নিতে পারব। তুমি কি ভাবছ আমার ভাগ্যে কেউ জুটবে না? আমি একা একা তোমার বিরহে পাগল হয়ে যাব? বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মত চুল এলোমেলো করে বসে বসে কাঁদব? যাও যাও।’ বলেই রঞ্জুর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল সোমা।

রঞ্জু কয়েক মুহূর্ত অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হন হন করে হেঁটে চলে গেল।

শিকাগো শহরের উত্তরে লিঙ্কনউড নামক উপশহরে রঞ্জুদের একতলা বাড়ি। রঞ্জু পেশায় একজন বিল্ডিং মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার। অনেকগুলো রেসিডেন্সিয়াল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের সুপারভিশন তাকে করতে হয়। পাশাপাশি তার নিজেরও পুরোনো বাড়ি কেনা-বেচার ব্যবসা আছে। সে নিজেই যেহেতু সার্টিফায়েড এবং দক্ষ—সে অকশনে ভাঙা কিংবা পুরনো অথবা ব্যাঙ্কে বন্ধককৃত বাড়ি কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট কিনে এবং তার কর্মচারীদেরকে নিয়ে পুন নির্মাণ করে বিক্রি করে দেয়।

অত্যধিক খারাপ মেজাজ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আবাসিক এলাকার লোকাল রাস্তা দিয়েই হেঁটে চলল রঞ্জু। গন্তব্য ডেভন এভিনিউ। বাংলাদেশী এবং দক্ষিণ এশিয়ান অধ্যুষিত এই ডেভন এভিনিউ সম্পর্কে কিছু বলা যেতে পারে—যদিও আমাদের গল্পের সঙ্গে এর তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।

আমেরিকাকে যদি সত্যিই বলতে হয় যে এটা ইমিগ্র্যান্টদের দেশ, তাহলে ডেভন এভিনিউকে বলতে হবে এটাই আসল আমেরিকা। শিকাগো শহরের উত্তর দিকে পূর্বে-পশ্চিমে লম্বা এই রাস্তায় একসঙ্গে বসবাস করছে ভারতীয়, বাংলাদেশী ও পাকিস্তানিদের একটা বিরাট অংশ। পাশাপাশি সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক থেকে আসা অ্যসিরিয়ান খৃষ্টানরা, রাশিয়া থেকে আসা ইহুদিরা থাকে এখানে। তাদের সাথে আরো রয়েছে আধুনিক ক্রিস্টিয়ানিটির নানা গোষ্ঠী। কালো-ধলো-বাদামী মিলে একাকার। শুধু তাই না, যেন আমেরিকার বহুত্ববোধকে স্বীকৃতি দিতেই এই ডেভন এভিনিউর একাংশের নাম রাখা হয়েছে গান্ধী মার্গ। একটু দূরে গেলেই চোখে পড়বে সাইনবোর্ড মুহাম্মদ আলী জিন্না ওয়ে কিংবা অনারারি শেখ মুজিব ওয়ে*। কিন্তু আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে তারা এক সুরে বলবে, ডেভন এভিনিউতে তারা সবাই আমেরিকান।

*উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে শিকাগো সিটি কাউন্সিলে পাশ হওয়া বিলের মাধ্যমে ডেভন এভিনিউর একটি অংশকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ‘শেখ মুজিব ওয়ে’ ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শিকাগোর বাঙালিরা বাংলাদেশের পতাকা, বেলুন-ফেস্টুন, ফ্লোট, বাঁশি বাজিয়ে একটা র‍্যালী করে এগিয়ে যায়। সেই র‍্যালীর শুরুটা হয় এই ‘শেখ মুজিব ওয়ে’ থেকে।

অন্যদিকে বাংলাদেশি স্থপতি এফ আর খানের নামেও আরেকটি সড়কের নাম রাখা হয় ‘ফজলুর আর খান ওয়ে’ যা কিনা শিকাগো ডাউনটাউনের কেন্দ্রস্থলে সিয়ার্স (বর্তমানে উইলিস) টাওয়ারের সামনে অবস্থিত।

আমরা গল্পে ফিরে যাই। বাসা থেকে বের হয়ে রঞ্জু পাশের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল। হাঁটার মাঝে সে একা একাই কথা বলছে। সে বলল, ‘আশ্চর্য যার জন্যে এতকিছু করি আর সে কিনা বলে, (সোমার কণ্ঠের অনুকরণে) ফাইন, তুমি মরলে আমিও একজন খুঁজে নিতে পারবো।’ রঞ্জু মুখ বাঁকা করে বলল, ‘আর এই মেয়ের সাথে আমি সংসার করছি!’ এবার সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এমন একটা জীবন তুমি আমাকে দিছো, হে আল্লাহ্‌! অফিসে রক্ত চোষা বস, ড্রাকুলার মত আমার রক্ত চুষে নেয়। আর ঘরে আমার বৌ, যেন একটা এনফেলিস মশা। এ ডেঞ্জারাস মসকুইটো। সারাক্ষণ মাথার উপর ভন ভন ভন ভন করে সুযোগের অপেক্ষায়, কখন সুচ বিঁধানো যায়।’

রঞ্জু আপন মনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হতে গেল এবং রাস্তার প্রায় মাঝামাঝি এসে সে দেখতে পেল একটা কালো রঙের ভক্সওয়াগন দ্রুত এগিয়ে আসছে তার দিকে। সে দ্বিধায় পরে গেল। সে কি বাকী রাস্তা টুকু পার হতে পারবে, না কি পারবে না। তার হিসেবে একটু গোলমাল হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে রইল মাঝ রাস্তায়।

(চলবে…)

Leave a Reply

Your email address will not be published.