হ্যালো

রং নাম্বারে যে এত রঙ থাকতে পারে আগে বুঝিনি। সবেমাত্র চাকরীতে ঢুকেছি। একদিন অফিসের ব্যস্ততায় মোবাইলে কল আসলো। রং নাম্বার। রেখে দিলাম। আবার ফোন। আবার রেখে দিলাম। তৃতীয় বার যখন আসলো তখন বেশ বিরক্তি নিয়ে বললাম কেনো বারবার ফোন করছেন? ওপাশ থেকে কিন্নরী কণ্ঠ জানালো সে আমাকেই ফোন করেছে। আমার সাথেই কথা বলতে চায়।

বললাম আমাকে চিনেন?

বলল না, পরিচিত হওয়ার জন্যই ফোন করেছি।

পরে জেনেছিলাম, সে তিনটি র‍্যান্ডম নাম্বারে ফোন করেছিল। তার মধ্যে আমার হ্যালো বলার মধ্যে কি যেন পেয়েছে, যে তার মনে হয়েছে আমার সাথে তার ফ্রেন্ডশিপ হতে পারে।

ক্লাস টেন-এ পড়া এক মেয়ে হন্যে হয়ে বন্ধু খুঁজছে।

আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম দেখুন আপনি আমার চেয়ে অনেক ছোট। আর তাছাড়া আপনার সাথে আমার বন্ধুত্ব কখনোই হওয়ার নয়। আর বন্ধুত্ব করলে কিছুদিন পরেই আপনি দেখা করতে চাইবেন। আর দেখা করলে প্রেমে পড়তে চাইবেন। আর প্রেমে পড়লেই আপনি আমাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইবেন। এদিকে আমার আবার জাঁদরেল প্রেমিকা আছে। আপনাকে পেলে তখন কচুকাটা করবে। কেলেংকারিয়াস ব্যাপার হবে। তারচেয়ে এখন প্লিজ আসুন আমরা রাস্তা মাপি।

এসব বলেও তার কাছ থেকে নিস্তার পাওয়া গেল না। সে মফস্বল শহরের মেয়ে। এনডব্লিউডি কল (তখন অনেক এক্সপেন্সিভ ছিল) করতো। প্রায় প্রতিদিন। আমি কখনো ধরতাম, কখনো ধরতাম না।

এর মধ্যে আমি নিজের অজান্তে একটা ভুল করে ফেললাম। আমি মেয়েটিকে প্রচণ্ডভাবে এভয়েড করা শুরু করলাম। যা যা করলে বা বললে মেয়েটি অপছন্দ করবে সেগুলো বলা শুরু করলাম। বোঝাতে চাইলাম আমি এমনই। যাতে সে দূরে সরে যায়।

কিন্তু আমি তখনো জানতাম না। মেয়েটি আমার এই নেগেটিভ ট্রেইটগুলোই পছন্দ করবে।

মেয়েটির নাম মিষ্টি। সে মিষ্টি করে কবিতা আবৃত্তি করতে পারতো। আমি শুনতে না চাইতেও অনেকবার শুনিয়েছে। আমি কখনোই তাকে বলিনি যে সে সুন্দর আবৃত্তি করে। পাছে আবার প্রশ্রয় পেয়ে যায়। একদিন সে জসীমউদ্দিনের কবর কবিতা আবৃত্তি করে শোনালো –

এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

আমি বললাম দাদীরে দুই নয়নের জলে ভিজিয়ে না রেখে ফরমালিনে চুবাইয়া রাখলেওতো আস্ত থাকতো।

সে এইসব অপমানও গায়ে মাখতো না। সে জানতো সে অনেক ভালো আবৃত্তিকার। স্কুল প্রোগ্রামে পুরষ্কারও  পেয়েছে।

একসময়ে আমি হাল ছেড়ে দিয়ে তার বন্ধুত্ব গ্রহণ করলাম। তবে শর্ত সাপেক্ষে। প্রথম এবং শেষ শর্ত – কখনোই দেখা করা যাবে না। ছবি পাঠানো যাবে না। আমরা অদেখা বন্ধু হয়ে রইলাম।

এভাবে প্রায় দশ বছর চলে গেল। সেই অদেখা বন্ধু ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনার পার্ট চুকিয়ে চাকরীতেও ঢুকে গেল। তবুও সে আমার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলল। ফোন করলে আমি নির্লিপ্ত থাকি। বোঝাতে চাই যে আমি ব্যস্ত বা কথা বলতে চাচ্ছি না। তারপরেও তার আমাকে ফোন করা চাই। নয়তো মেসেজ। জন্মদিনে উইশ।

তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে সে আমার ইমেইল এড্রেসের সূত্র ধরে আমাকে ফেসবুকে আবিষ্কার করলো। বলল আমরা এখন আর অদেখা বন্ধু নই। আমার ধারণা ছিল সুকন্ঠীরা সাধারণত বাহ্যিকভাবে সুন্দর হয় না। কিন্তু সে ছিল অসম্ভব রূপবতী।

আমাকে বলেছিল আপনাকে আমি কল্পনায় যা ভেবেছি আপনি তাই।

আমার এক সুদর্শন বন্ধু ছিল। গার্লফ্রেন্ডবিহীন। ওকে দেখলে একটা প্রবাদ মনে পড়তো। অত বড় ঘরণী না পায় ঘর, অত বড় সুন্দরী না পায় বর। ওর অবস্থা ছিল ডানাকাটা হ্যান্ডসাম হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো গার্লফ্রেন্ড নাই। বিবাহতো দূর কি বাত।

একদিন বললাম এই ফোন নাম্বারে কল করে কথা বল। দেখ কিছু করতে পারিস কিনা। সে নীলক্ষেত থেকে কি কি সব বই যোগাড় করে বেশ ভালো করে স্টাডি করল। সম্ভবত হাউ টু পটানো যায় মেয়ে টাইপের কিছু।

কিছুদিন পর সে আপডেট জানালো মেয়েটির সাথে তার নিউমার্কেটে মিট হয়েছে। এক রিক্সায় করে ঘুরাঘুরিও করেছে। কিন্তু মেয়েটি তার মনকে অন্য কোথাও জমা দিয়ে রেখেছে।

আমি খুব টেনশন করতে লাগলাম। মেয়েটি আবার আমার জন্য নিজেকে অপচয় করছে নাতো! এরপর একদিন ফোন করলে আমি খুব কষ্ট নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুর্ব্যবহার করলাম। বললাম আর কখনোই যাতে সে আর আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা না করে।

মেয়েটি ততদিনে ম্যাচিউরড হয়েছিল যথেষ্ট। তাই হয়তো অপমানটুকু গায়ে লেগেছিল। আর সে ফোন করেনি কখনো।

কে জানে এতদিনে সে তার বন্ধক রাখা মনটিকে অন্য কোথাও রাখতে পেরেছে কিনা!

-জামান একুশে 

ছবি কৃতজ্ঞতা- সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন তমাল 

Leave a Reply

Your email address will not be published.