ললিতা (৬ষ্ঠ পর্ব)

জুবায়েরের উপস্থিতি ললিতাকে বড্ড অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে,ললিতার কিছুটা ভয় ভয়ও কাজ করছে ভেতরে ভেতরে , জুবায়ের তো কখনোই অবেলাতে এভাবে বাসায় আসেনা, সে সেই কোন বিকালে ফেরে তখন ললিতার চলে যাওয়ার সময় হয়ে যায়, কখনও বা সেসময়ে জুবায়ের ফিরেও না।
একটা সময় ছিল জুবায়ের বাসায় থাকলেও একা বাসাতে ললিতার কোন সমস্যা হত না, কিন্তু জুবায়েরের দৃষ্টিভঙ্গি ললিতার কাছে ভিন্ন ঠেকছে বিধায় সে এ খালি বাসাতে একা একা ভয় পাচ্ছে।
আজকাল জুবায়ের নানান ফাই ফরমায়েশের অজুহাতে ললিতাকে কাছে ডাকে। এই তো কিছুদিন আগেও ললিতা হাতে গোনা মাত্র দুতিন দিন শারমিনের বেডরুমে ঢুকেছে অথচ এখন জুবায়ের বাসায় থাকলেই এটা সেটা দেয়ার জন্য ললিতাকে ডেকে নেয়। জুবায়েরের হুকুম তামিল করতে তাদের বেডরুমে ঢুকলে ললিতা জুবায়েরের খালি গায়ে শুয়ে থাকা দেখে আরও বেশি অস্বস্তি হয়।
আজও রুমে ঢুকেই জুবায়ের ললিতাকে ডাকে, “একগ্লাস পানি দিয়ে যাও তো ললিতা!” না শোনার ভাণ করে ললিতা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে জুবায়ের আবার উচ্চস্বরে চেঁচায়,”শুনতে পাও নি কি বলেছি? ”
ললিতা এবার বাধ্য হয়েই পানি নিয়ে ওই রুমে যায়,গ্লাস আর পানির জগটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে ললিতা বলে,”এই যে ভাইজান পানি দিয়া গেছি।” চোখ বুজে রেখেই জুবায়ের বলে, “ঢেলে দাও গ্লাসে।”
ললিতা পানিটা গ্লাসে ঢেলে দিয়ে চলে যাচ্ছে, জুবায়ের তখন উঠে বসে, তোমারে পানি দিতে বলছি আমি,ড্রেসিং টেবিল টা বলেনি।তাহলে ড্রেসিং টেবিলে রেখে চলে যাচ্ছো যে!
দৃঢ়কন্ঠে উত্তর দেয় ললিতা,”ঢেলেই তো দিলাম।তরকারিটা পুড়ে যাইতাছে। ”
জুবায়ের রেগে রেগে উত্তর দিচ্ছে,
—“পুড়ে গেলে যাক,আগে আমার হুকুম তামিল করবে তারপর অন্য কাজ করবে। ”
— করেছি তো ভাইসাব।
— কই করলে? পানিটা আমার হাতে দিয়েছো?
ললিতা আর কথা বাড়াতে চায়না তাই পানির
গ্লাসটা জুবায়েরের হাতে ধরিয়ে দেয় আর সে ফাঁকে জুবায়েরের হাতটা ললিতার হাতকে ছুঁয়ে দেয়।এক নিমিষেই ভয়ে কেঁপে উঠে ললিতার সমস্ত দেহ। দ্রুত হাতটা সরিয়ে রান্নাঘরে চলে যায় সে।
ভাবনায় পড়ে যায় ললিতা, জুবায়েরের এই কামুকতা আর শারমিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা কোন দিকে যাবে সে। শারমিন তার জন্য যা করছে তাতে ললিতা হয়তো কোনদিনই সে ঋণের দায় মেটাতে পারবেনা। কিন্তু পরিস্থিতি ললিতাকে সে দায় মেটাতে দিবে কিনা সেটা এখন ললিতার ভাবনার বিষয়।

ললিতার জন্য আরও এক দুঃসংবাদ অপেক্ষা করে ছিল আগে থেকেই। শারমিনের পাশের ফ্ল্যাটে ললিতার যে কাজটা ছিল সেই মনি ভাবীরা এ শহর ছেড়ে যশোর ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছে।মনি ভাবীর বর দীর্ঘদিন ধরেই ওখানে চাকরি করে কিন্তু ছেলেটার সমাপনী পরীক্ষার জন্য এতদিন যেতে পারেনি। পরীক্ষার ঝামেলা সব মিটমাট হওয়াতে তারা এ সপ্তাহেই চলে যাবে।
দরজা ঠেলে মনি ভাবীর বাসায় ঢুকতেই বাচ্চা ছেলেটা দৌড়ে এসে ললিতাকে সে সংবাদটা দেয়, বলে,”ললিতা আপা ললিতা আপা ,আমরা বুধবারে যশোর চলে যাইবো,তুমিও যাইবা আমাদের সাথে?”
“যশোর যাইবো মানে? একবারে চইলা যাইবো নাকি? “মনে মনে কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে ললিতা দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটে,সেখানেই মনি ভাবীকে পায় সে।
— “ভাবী, সাইম কি কইতাছে? আপনারা নাকি চইলা যাবেন ভাই যেখানে থাকে?”
— হুম ঠিকই কইছে,তুমি তো তিন চারদিন আসো নাই। এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত হইছে।
—কবে চইলা যাবেন?
— বুধবারে তোমার ভাই আসবে এর মধ্যেই সব গোছগাছ সারতে হবে।
ললিতার মনটা ভারী হয়ে গেছে সেটা মনি ভাবীর দৃষ্টি এড়ায় না, “কি করবো ললিতা বলো,দুজন দুই জায়গায় ভাড়া থাকা,টানাটানি সবই ঝামেলা, এখন সুযোগ আছে,ছেলেরে তো ঐখানেই ভর্তি করতে হবে। ”
মনি ভাবী ভাবছে তাদের চলে যাওয়ার সংবাদে ললিতার মন খারাপ হয়েছে কিন্তু ললিতার মন খারাপ অন্য জায়গায়। মনি ভাবীর চলে যাওয়ার সংবাদে তার মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে গেল। সে মনে মনে চাইছিল শারমিনের বাসার কাজটা যেভাবেই হোক ছেড়ে দিবে।
অর্থের চেয়ে সম্ভ্রম রক্ষাটা একটা মেয়ের কাছে অতি জরুরি।
এ ভাবনাটা ললিতার মাথায় যখনই হাতুড়ি পেটাচ্ছে ঠিক তখনই মনি ভাবীর বাসার কাজটা চলে যাওয়াটা যেন ললিতার দুচোখে অন্ধকার দেখা।
বুধবার মানে আর পাঁচদিন! কাজ শেষে ফেরার পথে মনি ভাবী ললিতার মাসের পাওনাটা বুঝিয়ে দেয়। মনি ভাবীর অনুরোধ সবকিছু গোছগাছে যেন ললিতা একটু সাহায্য করে।
টাকাগুলো নিয়ে বাড়িতে ফেরার পথে সে টাকাগুলো আবার ভাঁজ খুলে দেখে নেয় একনজর, দুচোখে জল জমে তার। আগামী মাস থেকে তাকে আবার আগের মত অভাবের সাথে পাঞ্জা লড়তে হবে। জুবায়েরের লোভাতুর দৃষ্টি,কামনার্ত স্পর্শকে পাশ কাটিয়ে তাকে শারমিনের বাসার কাজটা করতেই হবে।
হারিছ আবার ললিতার সাথে প্রতিদিনই কাজ ছাড়ার জন্য অশান্তি করছে কিন্তু ললিতা জানে হারিছের কথায় কাজ ছেড়ে দিলে তাদের যে কতটা দুর্ভোগ পোহাতে হবে!
হারিছের যে সাধ আছে কিন্তু সাধ্যি নেই তা ললিতার চেয়ে ভাল আর কে জানে! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ললিতা।
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, এখনো আঁধার পুরোপুরি নামেনি,আবছা অালো এখনো পৃথিবীতে বিরাজমান।
বাড়ি ফিরে দেখে আজ হারিছ সকাল সকালই চলে এসেছে। বারান্দায় ছোট্ট টুলটায় বসে হারিছ টাকা গুনছে। অাবছা অালোতে ললিতা দেখছে হারিছের হাতে কয়েকটা হাজার টাকার নোট। অবাক হয়ে ললিতা ভাবে এতগুলো টাকা হারিছ কোথায় পেল। এক নিমিষেই সে ঘরের পাশে আমগাছটার দিকে তাকায় যেখানে হারিছ তার রিক্সাটা বেঁধে রাখতো। কিন্তু রিক্সাটা সেখানে নেই! হারিছ কি তবে রিক্সাটা বেঁচে দিয়েছে? ভাবছে ললিতা।
—ললিতা, রিক্সাটা বেচে দিছি রে।
—ভাল করছো।
আর কোন উচ্চবাচ্য না করে ললিতা ঘরে ঢুকে।রাতের রান্নার আয়োজন করে সে।
— কি রে ললিতা তোর মুখ ভার ক্যান!?
— কই! না তো!
— তোর মন খারাপ থাহে কিন্তু কস না আমারে! কেরে আমি তোর পর নাকি?
— মন খারাপ না, মনি ভাবীরা যশোর চইলা যাইতাছে সবাই। আমার আয়ের পথটা যে বন্ধ হইয়া যাইতাছে!
— ভালই হইতাছে,এখন তুই শারমিন আফার বাসার কাজটাও ছাইড়া দিবি।
— তারপরে কি দুজনে ভিক্ষা কইরা খামু? কোন খান্দানি বংশের পোলা যে আপনা থাইকা ধন সম্পত্তি আইবো?
— হেইডা আমি বুঝবাম।
— তোমার বুঝ আমার জানা আছে। হাতে কাজ করায় অগৌরব হয়না, গায়ে গতরে খাইটা খাইতাছি।
আর কথা বাড়ায় না হারিছ,
সেও বুঝে তার একার আয়ে পরিবার যে চলবে না কিন্তু কি করবে? ললিতা মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করবে এমনটা সে মানতে পারে না যে।
হারিছ ললিতাকে কোন সুখই দিতে পারেনি,না ভালভাবে বাঁচার সুখ, না মা হওয়ার সুখ। হারিছ বরাবরই সেজন্য হীনমন্যতায় ভোগে।অভাবের সংসার থেকে হারিছ কে বিয়ে করে আসে ললিতা কিন্তু এখানেও অভাবের সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে তাকে ছুটতে হচ্ছে।
মনি ভাবী চলে যাওয়ায় ললিতার এখন কাজের চাপ কম। শুধু শারমিনের বাসাতেই কাজ এখন তাই জুবায়েরকে এড়ানোর জন্য ললিতা একটু দুপুর দুপুর কাজ সেরে রান্না করে খাবার ফ্রিজে রেখে আসে। সন্ধ্যেবেলা অাচমকা শারমিনের ফোন,
— কেমন আছো ললিতা।
— আমি ভাল, আফনে কেমন আছেন?
— আলহামদুলিল্লাহ অাছি ভাল। তোমার এ মাসের বেতন দিয়েছে তোমার ভাই ?
— না আফা,
— তুমি চাওনি?
— তার কাছে চাইবো ক্যান? টাকা তো অাফনেই দেন তাই চাইনি। অাপনার লহে অনেকদিন দেখাও হয়না!
— কবে দেখা হবে তার ঠিক নাই, বোন। তুমি তোমার পাওনাটা তার থেকে চেয়ে নিও।
— দেখা হবেনা ক্যান আপা?
— সেসব কথা থাক ললিতা, তুমি বরং এখন তোমার কাজ কর্ম কর। আমি রাখছি।
ললিতা চিন্তায় পড়ে যায় শারমিনের কথা শুনে। “শারমিন আপা কি রাগ করে চলে গেছে? ” ভাবছে ললিতা। ললিতার মনেও সন্দেহ জাগে যখন কদিন ধরেই ললিতা রান্না ঘরটা বড্ড এলোমেলো হয়ে থাকে , একটা মাত্র খাওয়ার এঁটো প্লেট থাকে। তার মানে কি শারমিন আপা আসেনা বাসায়? তাদের মধ্যে কি কোন ঝগড়া অশান্তি হয়েছে?
মাসের পনের দিন চলে যাওয়ার পরও জুবায়ের ললিতাকে বেতন দেয়না, ললিতাও আগ বাড়িয়ে টাকা চাইতে যায়না জুবায়েরের কাছে। নেহায়েত বিপদে পড়ে আজ ললিতা জুবায়েরের কাছে টাকা চাইবে বলে মনস্থির করে নেয়।
সাপ্তাহিক ছুটির বার হওয়াতে জুবায়ের বাসাতেই ছিল, কার সাথে যেন ফোনে ফিসফিসিয়ে কথা বলছিল। বেডরুমের দরজার কাছে গিয়ে হালকা গলা কেশে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় ললিতা। ঘাড় ঘুরিয়ে ললিতাকে দেখে জুবায়ের পরে কথা বলছি বলে ফোন কেটে দেয়।
—ভাইসাব
— হ্যাঁ ললিতা ভিতরে আসো।
— ভাইসাব আমার এ মাসের বেতনটা যদি…….
—শারমিন দেয়নি? না আপা কইছিল আপনার কাছে চাইতাম।
— বসো দিচ্ছি।
না বসে ললিতা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে,অালমারি খুলে টাকা নিয়ে পিছনে ঘুরে জুবায়ের দেখে ললিতা দাঁড়িয়েই আছে।
— তোমাকে না বসতে বলেছি!
—বসবো না,আমি চইলা যামু,সব কাজ শেষ করে গেছি।
জুবায়েরের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায়। সে ওয়ারড্রব থেকে একগাদা কাপড় বের করে ললিতার হাতে ধরিয়ে দেয় ধোয়ার জন্য। ললিতার বেতনের টাকাটাও সে সাথে তার হাতে গুজে দেয়। মুঠোর মধ্যে টাকা নিয়ে জুবায়েরের নোংরা দুর্গন্ধ ছড়ানো কাপড়গুলো দুহাতে অাঁকড়ে নিয়ে বাথরুমের দিকে ছুটে ললিতা। ওয়াশিং পাউডারে কাপড়গুলো ভেজাতে গিয়ে ললিতা লজ্জায় ভেঙে পড়ে,জুবায়ের শার্ট প্যান্ট আর মোজার সাথে পাঁচ ছয়টা আন্ডাওয়্যারও ললিতাকে ধোঁয়ার জন্য দিয়েছে। অান্ডারওয়্যারগুলো দেখে ললিতা খুবই লজ্জিত হয়।

চলবে…..

-অরুন্ধতী অরু 

Leave a Reply

Your email address will not be published.