মাই এক্স (১৬ তম পর্ব)

একটু পরেই সবাই চলে আসবে। সবাই মানে তারিন, তিথি, শেলি অদিতি আর শিউলি। শিউলি ছাড়া বাকীরা আমরা ইউনিভার্সিটি গ্যাং। শিউলি কেবল ডাক্তার। এর মধ্যে আমি, শেলি আর তিথি ইউনিভার্সিটিতে ঢুকি। তারিনও ইউনিভার্সিটি, বাট অন্য সাবজেক্ট। শেলির বিয়ের পরে আবার আমরা সবাই একসাথে। পার্থক্য শুধু একটাই। আমাদের কারোরই হাবি থাকছে না এই দাওয়াতে। আর গেট টুগেদারটা আমার বাসায় করার কারণ, আমার চাকরী। ইউনিভার্সিটির চাকরীটা কনফার্ম হওয়ার পরে সবাই ধরেছিল, এবার খাওয়া দে।

অবশেষে ঠিক করলাম আজকে ট্রিটটা দেব। আজকে মানে বৃহষ্পতিবারে।দিনটা চুজ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কালকে সবারই ছুটি।আমাদের এই কজনের গ্রুপের দুজন আগে থেকেই চাকরী করত। কেবল আমি আর তিথিই একসময় বেকার ছিলাম। তিথি নিরুপায় হয়ে আর আমি দেমাগে। এনিওয়ে, এখন আর কেউই নেই। সবাই চাকরীজীবি। আমি ইউনিভার্সিটিতে আর তিথি ওর বরের কলেজে। আমার ছেড়ে আসা পোষ্টে।
পার্টি শেষ হতে রাত হলেও সমস্যা নেই। ড্রাইভারকে বলে রেখেছি। সবাইকে পৌঁছে দেবে। সমস্যা অবশ্য হবে শাহেদকে নিয়ে। ও কোথায়, সে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। ‘ট্রেনিং’ বলে অনেকদিন হল চালাচ্ছি।ইদানিং ‘কবে আসবে’র উত্তর দিতে ভয় পাচ্ছি। ছয় মাস হতে চলল।
সমস্যা আরেকটা আছে। যদি কেউ আবদার করে বসে, স্কাইপিতে আর নয়তো ইমোতে লাগা। অনেকদিন কথা হয়না, কথা বলব। তাহলে? শেলি ছাড়া আর কেউ জানে না আসল ঘটনা। তিথিকেও বলিনি। বাকীদেরও না।
আজ অবশ্য আরও একটা ঘটনা ঘটেছে। আজ ছিল ইউনিভার্সিটি জয়েন করার দশম দিন। দশম দিনটা ইম্পর্ট্যান্ট না, ইম্পর্ট্যান্ট হচ্ছে আজকে প্রথম ক্লাস নিয়েছি। ঘটনাটা এতো দ্রুত হয়তো হত না। একেবারে জুনিওরদের এতো দ্রুত ক্লাস দেয়া হয় না। প্রথম কিছুদিন যায়, স্যারদের লেকচারের স্লাইড রেডি করতে।
আমার অবস্থাও তেমন হতে যাচ্ছিল। এই কদিন কেবল গেছি, আর টিচার্স রুমে আড্ডা মেরেছি। ক্লাস দিচ্ছে না বলে কিছুটা মন খারাপ লাগছিল, বাট উপায় ছিল না। আসলে, আমি জয়েন করার আগেই, সব রুটিন করা হয়ে গেছে। ক্লাস ডিস্ট্রিবিউটও হয়ে গেছে। তাই…।
এমন সময় রিনি আপা একটা ঝামেলা করলেন। রিনি আপা হচ্ছেন আমাদের বছর দুয়েকের সিনিওর। মানে সুমনদের ব্যাচ। কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ ইউনিভার্সিটিতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। উনাকে ফোন করা হল, ফোন আনরিচেবল।
ওয়ারেস স্যারকে ইনফর্ম করা হল। উনি আপাততঃ অফিশিয়াল অ্যাকশানে যেতে বারণ করলেন। কেবল আমাকে ডেকে বললেন
— ক্লাস নিতে পারবা?
মনে হল হাতে স্বর্গ পেলাম। বললাম
— পারব।
রিনি আপার ক্লাসগুলো আমাকে দেয়া হল। এই ঘটনা তিনদিন আগের। আজ ছিল সে ক্লাস। প্রথম বারের মত ক্লাস নিলাম, তাও আবার নিজের ইউনিভার্সিটিতে। অসাম ফিলিং। এই কিছুদিন আগে যে মানুষটা সামনের বেঞ্চগুলোতে বসে, বড় বড় চোখ করে স্যারদের লেকচার গিলত, আজ সে ক্লাস নিচ্ছে? একরাশ স্টুডেন্টের সামনে, ডায়াসে দাঁড়িয়ে? গর্ব আর উত্তেজনায় ছটফট করছিলাম।

তবে প্রথম মিনিট দশেক ভয় লাগলেও এরপরে আর লাগেনি। কনফিডেন্ট ফিল করছিলাম। সেই মাস খানেকের কলেজের অভিজ্ঞতা এতোটা কাজে দেবে ভাবিনি। অনেকখানি স্টেজ ফ্রিনেস চলে এসেছে। রুমভর্তি স্টুডেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার যে ভীতি কলেজের প্রথম কিছুদিন ছিল, সেটা কিছুদিন ক্লাস নেয়ার পরেই কেটে যায়।
একসময় ক্লাস শেষ হল। বেরিয়েই সোজা ওয়ারেস স্যারের রুমের দিকে ছুটলাম। সামনে বসা পিওন জানাল, উনি ভেতরেই আছেন। অনুমতি নেয়ার মত ধৈর্য্য ছিল না। হুরমুড় করে স্যারের রুমে ঢুকলাম। স্যার রুমেই ছিলেন, কোন কিছু পড়ছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসি দিলেন। মুখে কিছু বলতে পারছিলাম না। এগিয়ে গিয়ে স্যারের আশীর্বাদ নিলাম। যখন সোজা হয়ে দাঁড়ালাম তখন উনি বললেন
— এক্সাইটেড?
কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কোন রকমে বললাম
— অদ্ভুত একটা ফিলিং। এক্সপ্রেস করতে পারছি না।
— তো এতোদিন ট্রাই করনি কেন?
উত্তরে কিছু বলতে পারলাম না। কি বলব? বড়লোকের বউ হয়ে মজা লুটছিলাম? শুয়ে বসে থেকে গায়ে আলসেমি ভর করেছিল? স্মিত একটা হাসি দিয়ে শুধু বললাম
— বুঝিনি, এতোটা ভাল লাগবে।

এরপরে ‘কেমন চলছে’ টাইপের কিছু ফর্মালিটি কথা জানতে চাইলেন। উত্তরে যা মনে এল বলে বেরিয়ে এলাম। দারুণ এক অনুভূতি। গত কয়েকমাসের জীবনের ভয়ঙ্কর উত্থান পতনের যে কষ্ট, সেটা মনে হল, কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেলাম। টিচার্স রুমে ঢুকে চেয়ারে বসলাম। হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে গেল। কি করব? ইস, আজ যদি শাহেদ থাকত!

চাকরীটা পেয়ে সেদিনই সবাইকে জানাই। অনেকদিন পরে, সেই ইউনিভার্সিটি লাইফের তৃণা হয়ে গিয়েছিলাম। সেই উচ্ছ্বলতা, সেই আড্ডা। অথচ এই কিছুদিন আগেও এদের সাথে আলাপ করতে প্রেস্টিজে লাগত। আমার বন্ধু তখন হয়েছিল, ডিসি ভাবি আর এসপি ভাবীরা। ওপর মহল, নিজের স্ট্যাটাস এসব ছিল সবার আগে বিবেচ্য। পুরনো বান্ধবীরা কেউ ফোন করলেই ভাবতাম, কোন হেল্প নিতে ফোন করেছে। নটা পাচটা চাকরী করে ঘেমে নেয়ে বাসায় ফিরে আসা মানুষগুলোকে কেমন গরীব গরীব লাগত। সেই আমি এখন উঠতে বসতে ওদের ফোন করি।
অ্যাপোয়েণ্টমেণ্ট লেটারটা পেয়ে একে একে পরিচিত সবাইকেই ফোন করি। বন্ধুদেরও। শোনার পরে, সবার মুখে একটাই কথা, ‘খালি মুখে এই খবর শুনব না। ট্রিট চাই। আমারও ইচ্ছে করছিল। এই অকেশানে সবার সাথে আবার আড্ডা হবে। বাসায় আসতে বললাম।
— বৃহষ্পতিবারে আয়। রাতে।
শিউলি একটু গাঁই গুঁই করছিল, ওর নাকি নাইট ডিউটি। এক্সচেঞ্জ করতে সমস্যা হবে। তবে শেষমেশ রাজী হল। সবার কথা ভেবে। বাকীরাও সবাই একে একে এগ্রি করল। সিদ্ধান্ত হল এটা টিপিক্যাল লেডিস পার্টি হবে। সবাই একা আসবে। আমিও আপত্তি করলাম না।
এদিকে আমার জীবন এখন অনেকটাই সহনীয় হয়ে এসেছে। সুমনের অত্যাচার নেই। ফ্ল্যাটের ঝামেলার একটা আপাতঃ সুরাহা হয়েছে। ম্যানেজার সাহেব লোন রিসিডিউল করতে রাজী হয়েছেন। ছয় মাস সময় দিয়েছেন। এরপরে কি হবে, এখনও জানি না।

বাসায় পৌঁছে ঘড়ি দেখলাম। হাতে বেশ কিছুটা সময় আছে। বাজার আগেই করে রেখেছিলাম। বুয়াকে বলে সকালেই দরকারী মশলা বাটিয়ে রেখেছিলাম। এখন কাজে নামতে হবে। ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে একটা শাওয়ার নেয়া অভ্যেস হয়ে গেছে। বাথরুমে ঢুকে পানির ট্যাপটা ছাড়তে যাব, এমন সময় মনে হল ফোনটা বাজছে। পানিটা চালু রেখেই বেরোলাম। নম্বরটা অচেনা। ভয় পেয়ে গেলাম। আসলে গত তিন চার মাস যে ঝড় গেছে, তার পর আননোন নাম্বারের ফোন ধরতে ভয় হয়। ধরলাম না।
শাওয়ার নিলাম। বেড়িয়ে টপাটপ রান্না গুলো সারলাম। সবশেষে চিংড়ীটা ধরলাম। এটা রান্না করতে গিয়ে কেবল শাহেদের কথা মনে পড়ছে। কত পছন্দ যে করত!
শাহেদের ব্যাপারে যে কি করব? শাহেদকে কি মৃত ধরে নিয়ে জীবনে এগিয়ে যাব? না খোঁজ খবর করে যাব? নাম ধরে খোঁজ করা যাচ্ছে না। জানাজানি হয়ে যাবে। তাই ক্রসফায়ারের লিস্টের খোঁজ করছি। পত্রিকায় যাদের নাম এসেছে, সেখানে শাহেদের নাম নেই। এক হতে পারে, এটা টপ সিক্রেট। সুমনের নির্দেশে ঘটেছে। তাই কোথাও আসেনি। আর নয়তো…। সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবে অসম্ভব না। লাশ যেহেতু পাইনি, তাই এখনও আশা ছাড়িনি। এটাও বুঝতে পারছি, একেবারের ওপর মহলের কেউ না হলে, শাহেদের সঠিক খবর কেউ দিতে পারবে না। এখনও সেভাবে কাউকে পাইনি। আসলে আমি আপ্রাণ সোর্সের খোঁজই চালিয়ে যাচ্ছি।
ইন্টারকমে ফোন আসল। মনে হয় কেউ এসেছে। ফোন রিসিভ করলাম। শেলি। বললাম, পাঠিয়ে দিন। এর কিছুক্ষণ পরে কলিং বেল বাজল। দরজা খুললাম। বললাম
— আয়।
শেলি ঘরে ঢুকে পুরো ঘর দেখল। লজ্জাই লাগছে। বিয়ের দেড় বছর হলেও ওকে ডাকিনি আমার বাসায়। শেলি বোধহয় ইচ্ছে করেই আগে এসেছে। উদ্দেশ্য, সুমন সম্পর্কে জানতে চায়। আনইউজুয়াল না। সুমনের অত্যাচার যখন তুঙ্গে, তখন প্রায় প্রতিদিনই ওকে ফোন করতাম। কোনভাবে যদি হেল্প করতে পারে। অন্ততঃ একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট। এরপরে যখন ওর ডেরার খোঁজ পেলাম সেদিনই তো…
এনিওয়ে, শেলিকে এরপরেও ফোন করেছি, বাট ক্যাজুয়াল সব আলাপ। ‘চাকরী কেমন চলছে’ কিংবা ‘বর কেমন লাগছে’ টাইপ সস্তা আলাপ। সুমন টপিকটা আর নিজে থেকে উঠাইনি। শেলি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত, ‘আর সমস্যা করছে না’ উত্তর দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতাম। আজকে মনে হচ্ছে কোমড় বেঁধে এসেছে। আবার ট্রাই করবে।
— রান্না একটু বাকী আছে, চল রান্নাঘরে গল্প করি।
শেলি এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। সেদিকে লক্ষ্য করে বললাম
— ঘুরে দেখতে চাইলে, দেখ।
আমি রান্নাঘরে ঢুকলাম। প্রায় শেষ। মোবাইলটা পাশেই রাখা ছিল। ফোনটা বেজে উঠল। আবার সেই আননোন নাম্বার। ধরব কি না ভাবছি এমন সময় শেলি রান্নাঘরে ঢুকল। আমার মুখ কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে ছিল। সেদিকে তাকিয়ে শেলি অবাক হল। জানতে চাইল
— কে করেছে?
নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইলাম। বললাম
— জানি না। আননোন নাম্বার ধরি না আজকাল।
ফোনটা অফ করে দিলাম। ব্যাপারটা বিশ্বাস না করলেও, তর্ক করল না। এরপরে জানতে চাইল
— সুমন ভাইয়ের আর কোন খবর জানিস?
শেলির দিকে তাকালাম। বোঝার চেষ্টা করলাম ও কিছু জানে কি না। মনে হল জানে না। তবে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম না। এড়াতে গেলেই সন্দেহ করবে। বললাম
— নাহ। আর ডিস্টার্ব করছে না, এটাই।
শেলি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল
— সুমন ভাইটা যে এমন মানুষ বেরোবে, কখনও ভাবিনি। ইভেন আমার বরটাও দেখলাম উনার ভয়ে কাঁপে। একটা কিছু জিজ্ঞেস করলেই মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ঐ ব্যাপারে কিছু জানতে চাইলেই, পাশ ফিরে ঘুমায়। জিজ্ঞেস করাই বন্ধ করে দিয়েছি।
— রিসেন্টলি কি জিজ্ঞেস করেছিস?
শেলি অবাক হয়ে তাকায়। চোখে প্রশ্ন। বুঝলাম ভুল করে ফেলেছি। এক্ষুনি প্রশ্ন করবে। এমন সময় কলিং বেলটা বাঁচিয়ে দিল। আওয়াজ শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম। শেলিকে বললাম
— চিংড়িটা একটু দেখিস। আমি দেখি কে আসল
মনে হচ্ছে বাকীদের কেউ এসেছে। নীচে বলে রেখেছিলাম। তাই বোধহয় পারমিশান চেয়ে ইন্টারকমে ফোন করেনি। শেলির ব্যাপারে কেন করেছিল কে জানে?
এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললাম। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। মনে হল ঘরটা ঘুরছে। আমি টলছি।

চলবে…

 -রাজিয়া সুলতানা জেনি

Leave a Reply

Your email address will not be published.