চপলা

বাবার পায়ের শব্দ পেয়েই আমি দৌঁড়ে রুম থেকে বের হয়ে আসি। দেখি বাবার ঠিক পিছনে খুব জড়সড় হয়ে একজন দাঁড়িয়ে আছে। বাবা বললেন ওর নাম চপলা । গ্রাম থেকে এসেছে এখন থেকে এখানেই থাকবে। বেশ ভাল লাগল শুনে। যাক এখন থেকে মা বাবা অফিসে গেলে আমাকে আর একা থাকতে হবে না। চপলাকে মা রাতে আমার রুমে ঘুমাতে বললেন। এবার ভাল করে দেখার সুযোগ পেলাম। উফ মেয়েটা এত চিকন ! মাথার চুলও টকটকে লাল। বেশ মজা লাগলো এই ভেবে যে এখন মেয়েরা জিরো ফিগার হবার জন্য কি চেষ্টাই না করছে আর চুলের এই রঙটি পাবার জন্য কত টাকাই না খরচ করছে অথচ চপলা কোন চেষ্টা ছাড়াই এর অধিকারী। আমি বললাম তোমার চুলগুলো তো বেশ সুন্দর। চপলা কিছুই বলল না শুধু মাথা নাড়ল।
কিছুদিনের মধ্যেই চপলার সাথে আমার বেশ সখ্যতা হয়ে গেল। এতটুকু বয়সে ও যে কত গল্প জানে তার কোন সীমা যেন নাই। ওর কাছে গ্রামের মেঠোপথে হারিয়ে যাওয়ার গল্প শুনতে শুনতে কখন যে নিজেই হারিয়ে যেতাম! কল্পনায় আমি হতাম গ্রামের চপলা। চপলাদের সুখের সংসার ছিল। ওদের দুইটা গরু ছিল , একটুকরো জমি ছিল । বাপজানের মৃত্যুর পর চাচারা ওদের দুই বোন আর মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। চপলার ভাষ্য … ‘ বুঝলেন আফা আমরা দুই বইন আমাগু নাকি বাপের সম্পত্তিতে কোন হক নাই , ভাই থাকলে নাকি ভাইয়ে পাইত।’ যাই হোক বুঝলাম ওরা গ্রাম্য শঠতার শিকার।
আমি স্কুলের আর পড়ার ফাঁকে চপলার সাথে গল্প করতাম। আমি ওকে পড়াতে শুরু করলাম। বিষয়টা খুব আনন্দদায়ক আর রোমাঞ্চকর ছিল। এরপর প্রতিদিন আমাদের ছাত্র আর শিক্ষক খেলা চলত। একদিন আবিষ্কার করলাম চপলা পত্রিকা পড়া শিখে গিয়েছে। বাসায় থাকা রাজ্যের যত পুরানো পত্রিকা ছিল চপলা এমনভাবে পড়তো মনে হয় যেন ও মুখস্ত করছে। এর পর বাসার পত্রিকা প্রথমে চপলার দখলে চলে যেত। উনি পড়ার পর আমরা সুযোগ পেতাম।
চপলা কাজে এতটাই চটপটে ছিল যে কেউ বুঝতেই পারতো না ও বাড়ির এত কাজ করে। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে আমাদের গল্প চলত অবিরাম। আর তাই কত যে মার বকুনি খেয়েছি তার অন্ত নেই। আমার পরীক্ষা চলছিল তখন। পড়া নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত । ঠিক সেদিন চপলা এসেই শুরু করল ‘আফা খবর হুনছইন ?’ তারপর পত্রিকার এক নিউজ পড়েছে তাই নিয়ে কথা শুরু করলো। আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে কথা বলতে নিষেধ করলাম। তারপরও চপলার পায়চারী আর উসখুস দেখে বুঝলাম তার কোন সমস্যা হয়েছে। জানতে চাওয়াতে চপলা হড়বড় করে বলা শুরু করল একজন নামকরা ব্যান্ড শিল্পী নাকি দ্বিতীয় বিবাহ করিয়া সাংবাদিকদের বলেছে ‘ আমি আমার প্রাক্তন স্ত্রী কে ভরন পোষণ দিব আর আগে আমি মদ খেতাম, নেশা করতাম এখন তো খাইনা সব কিছুর জন্য আমার প্রাক্তন দায়ী ।’ চপলা বিষয়টা মানতে পারছে না। চপলার কথা ‘আফা উনি বিয়া কইরা তারে ছাড়ি যাইব তার নিজের ইচছায় আবার নেশা করতেন তাও নিজের ইচছায় এখন দোষ সব উনার বউয়ের?’ আমি বললাম কি করা যাবে বল এমনিতো হয়। চপলা বলল আফা চলেন আমরা মনে মনে ব্যাডারে শাস্তি দেই। আমি উৎসুক হয়ে বললাম কি শাস্তি বল ? সে বলল আফা আমরা সব মাইয়া লাইন দিয়া দাঁড়াইয়ে সব্বাই কষে একটা কইরা চড় দিমু ব্যাডারে।’ আমি ওর কথায় বিস্মিত । কি স্বাধীন চিন্তা! ওর প্রতিবাদের ধরন দিয়ে ও শাস্তি নির্ধারণ করেছে।
দিন গুলো কাটছিল বেশ ভালই। আমি কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজে আমার সুজনের সাথে পরিচয়। সুজন আমার চাইতে দুই বছরের সিনিয়র ছিল। যে কিনা সবসময় আমাকে অনুসরন করত। কলেজের গেটে, করিডরে আবার কখনো বা ছুটির সময় ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। সুজনের সাথে আমার দিন দিন সখ্যতা বাড়তে লাগল। একসময় বুঝতে পারলাম আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি। সুজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাসায় দুই বোন আর মা আছেন। ক্লাসের পর আমরা প্রতিদিন রমনায় আড্ডা দিতাম। একটা সময় মনে হতে লাগল সুজন ছাড়া আমি এই জীবনে চলতেই পারবো না। আমার একান্ত নির্ভরতা সুজন। সুজনের অবস্থা ভাল ছিলনা তাই মাসের হাত খরচ আর টিউশনির টাকা জমিয়ে সুজন কে মাঝে মাঝে দিতাম যাতে ওর উপকার হয়। একদিন বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে সুজনের এক বন্ধুর হোস্টেলে কিছুক্ষন ছিলাম। আর সেই দিন সুজনের আহবানে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। নিজেকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছিলাম। আসলে সুজন কে মনে মনে আমি আমার জীবনসঙ্গীর আসনে বসিয়ে দিয়েছিলাম। এরপর এই সুযোগটা যখন সুজন নিয়মিত নিতে চাইত আমি গোপনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেই। সুজন ও রাজি হয়ে যায়। তারপর একদিন সুজনের কিছু বন্ধুবান্ধব কে সাক্ষী রেখে আমারা গোপনে বিয়ে করে ফেলি। বিষয়টা এমন যে আমরা সিন্ধান্ত নেই সুজনের মাস্টার্সের পর যখন কোন চাকরীতে যোগ দিবে তখন পারিবারিক সম্মতিতে না হয় আবার বিয়ে করবো । আর ততদিন বিষয়টা সবার কাছে গোপন রাখব।
সুজন কে আমি প্রানের চাইতেও বেশী ভালোবাসতাম । সুজন অনার্সে খুব ভাল রেজাল্ট করে আর তারপরই লন্ডনে মাস্টার্স করার জন্য স্কলারশিপ পায়। খুশীতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। সুজন বিদায় নিল । যাবার আগে বার বার বলে গেল ঠিক এক বছর পর ও এলে আমাদের বিয়ে হবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে। কি যে খুশী হয়েছিলাম ঠিক মনে হয়েছিল সব চাওয়া স্বপ্ন বুঝি পূরণ হয়ে গেল। আসলে সুজনের ভাল ছাড়া আমি যে আর কিছু চাইনা।
এর মাঝে চপলার মা এলেন তার এক চাচাকে নিয়ে। জানালেন চপলার ভাল বিয়ের প্রস্তাব এসেছে তাই তিনি নিয়ে যাবেন। কি যে কষ্ট হচ্ছিল বলার নাই। মা যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন অল্প সময়ে যতটুকু সম্ভব কিছু শাড়ি , বরের জন্য পাঞ্জাবী আরও সাথে টাকাও দিলেন। আমি আমার জমানো টাকা থেকে ওকে একটা গলার চেইন কিনে দিলাম। আসলে চপলা যে আমার আত্মার আত্মা হয়ে উঠেছিল ।
সুজন আর চপলা বিহীন আমার জীবন যে আর কাটতেই চায়না। আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়। সুজনের সাথে মাঝে মাঝে কথা হত। মাঝে মাঝে ভিডিও চ্যাটিং হত। সুজনের পরাশুনার চাপ বাড়ছিল। তাই আগের মতো আর কথা হত না। আমিও আমার অনার্স ফাইনাল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
সুজনের ডিজারটেশন শেষ পর্ব হলো। আমি তখন দিন গুনছি আমার প্রতিক্ষা শেষ হবে সেই মধুক্ষনের জন্য। একদিন শুনলাম সুজন দেশে এসেছে। আমি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি জানবো না এ কি হতে পারে? আমি সুজনের বাসায় গেলাম। সুজনকে দেখে বিস্ময়ে হতবিহবল হয়ে গেলাম।সত্যি তাই! সুজন ভাবলেশহীন গলায় বলল আসলাম ! তা তুমি কি খবর? শুধু বললাম আমাকে বলার প্রয়োজন মনে করোনি। সুজন খুব শীতল গলায় বলল……………… ‘তুমি কাল বিকেলে এসো ! আজ ব্যস্ত আছি!’
পরেরদিন সুজন দরজা খুলে দিল খুব সাবলিল ভাবে বলল দেখ মা আর সবাই মিলে আজ সিমিদের বাসায় গিয়েছে। আমি বললাম কে সে? প্রতি উত্তরে বলল দেখ তোমাকে যখন পেয়েছিলাম তখন আমি ততটা পরিপক্ক ছিলাম না। আসলে তোমার সাথে আমার ঠিক মিলবে না। সিমি লন্ডনে পড়ছে। খুব ট্যালেন্ট আর ব্যাবসায়ি বাবার একমাত্র মেয়ে। আমি সিমিকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধু বললাম আমাদের বিয়েটা তাহলে কি ছিল? সুজন বলল দেখ আমাদের বিয়ে টা জাস্ট আ ইন্সিডেন্ট! রেজিস্ট্রি হয়নি। ওটা কে একটা খেলা বলতে পারো। তাহলে আমি খেলার পুতুল ছিলাম? সুজনের সোজা উত্তর…… “ দেখ বিষয়টা আমরা দুজনই এনজয় করেছি ফরগেট ইট! রাগে ঘৃৃণায় শুধু বললাম তুমি কোন দিন সুখী হতে পারবে না। এর শাস্তি তুমি পাবে। এরপর আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করেনি। চলে এসেছিলাম একরাশ ঘৃণা আর এক বুক কষ্ট নিয়ে।
এরপর আমি আমার জীবন এলোমেলো হয়ে গেল। কোনভাবে পরীক্ষাটা শেষ করলাম। রেজাল্ট খুব খারাপ হল ।
এর মাঝে আমাদের অবাক করে দিয়ে হঠাৎ একদিন চপলা এসে উপস্থিত। এসে খুব স্বাভাবিক ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আমাকে এসে বলল আপা আমি এই সম্পর্ক রাখতাম না। ঘরে অসুস্থ শ্বাশুড়ী বাড়ি ভরতি লোকজন সারাদিন কাজ করি তারপর রাইতে ফিরা উনি মারতে আসেন। কাইল আসছিল আমি তারে ধাক্কা দিয়ে ফালাই দিছি। হাতের ঝাড়ু দিয়া এমন মাইর দিছি। তারপর গ্রামের সবাইরে সাক্ষী রাইখা তিন তালাক দিয়ে দিছি। আপা আমি নিজের পায়ে দাঁড়াইতে চাই। এমন বিয়ার কি দরকার। আফনে আমারে আরেকটু লেখাপড়া শিখাইবেন?
চপলা যেন আমার চোখ খুলে দিল। তাইতো জীবনটা কারো হাতের পুতুল না। যে জীবনের দাম ভালোবাসার দাম দিবেনা তার জন্য দুঃখ জমিয়ে রাখার কি আছে। তার জন্য শুধুই ঘৃণা থাকবে আর কোন অনুভূতি নয়। আমি কেন অতীত অতীত করে নিজের জীবনটা নষ্ট করবো ।
শুরু হলো আমার আর চপলার নতুন জীবন। চপলাকে ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিলাম। সে ব্লক বাটিক আর টেইলারিং শিখতে লাগল । আমিও নতুন উদ্যমে বাইরে লিখা লিখি শুরু করলাম। রেজাল্ট খুব একটা ভাল না হলেও ইংলিশ প্রফিসিএন্সি টেস্টে বেশ ভাল ফলাফল করলাম। সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে ফুল স্কলারশিপ পেলাম মাস্টার্স করার জন্য। বাবা মা খুব খুশি। অনেক আগেই সব স্মৃতি নষ্ট করে দিয়েছি। নকল বিবাহের কাগজ টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দিয়েছি। পণ করেছি আর পিছে ফিরে চাইব না। আমি শুধুই সামনে এগিয়ে যাব।

– হালিমা রিমা 

Leave a Reply

Your email address will not be published.