একজন আজমল হোসেন|পর্ব-২

ফরহাদ হোসেন

কালো ভক্সওয়াগনের চালক দূর থেকে রঞ্জুকে রাস্তা পার হতে দেখেই হর্ন বাজাল কয়েকবার। কিন্তু রঞ্জু সেদিকে না তাকিয়ে আপন মনেই হাটতে থাকল। গাড়িটা যখন রঞ্জুর গায়ের থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে ঠিক সেই মুহূর্তে সে অনুধাবন করল পরিস্থিতির ভয়াবহতা। মুহূর্তের মধ্যে তার সব ইন্দ্রিয় সক্রিয় হয়ে গেল এবং এক লাফে ছিটকে সরে গেল। এবং ঠিক একই সময়ে ভক্সওয়াগন থেমে গেল রঞ্জুকে পাশ কাটিয়ে সামান্য দূরে। রঞ্জু অগ্নিমূর্তি ধারণ করল। সে চালককে লক্ষ্য করে বলল, ‘হেই, ক্যান্ট ইউ সি অ্যান্ড ড্রাইভ?’ 

        ভক্সওয়াগনের চালকের আসন থেকে মাথা বের করল একজন আফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। মাথা ভর্তি ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল ছোট করে ছাটা। সে তার বাম হাত বের করে মধ্যম আঙ্গুল উঁচু করে রঞ্জুর দিকে নোংরা ইঙ্গিত করে কর্কশ কণ্ঠে বলল, ‘গো টু হেল।’ বলেই সে দ্রুত গতিতে গাড়িটি চালিয়ে চলে গেল।

পাঠক, ভক্সওয়াগন চালক এই কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের সঙ্গে আমাদের আবার দেখা হবে খুব শীঘ্রই এবং থাকবে প্রায় পুরো গল্প জুড়েই।

        রঞ্জু কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আবার শুরু করল হাঁটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পৌঁছে গেল ডেভন এভিনিউতে। সে যাবে তার পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টে। ফুটপাথ দিয়ে রঞ্জু ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সে শুনতে পেল একটা মেয়ে কণ্ঠ—দূর থেকে তাকে ডাকছে, ‘হেই, রঞ্জু ভাই?’

রঞ্জু দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল শান্তা—দ্য পার্টি গার্ল। সদাহাস্য এই মেয়েটি সারাক্ষণ পার্টি মুডেই থাকে। শান্তা শিকাগোতে আছে অনেক বছর ধরে। বিয়ে করেছে একটা শ্বেতাঙ্গ ছেলেকে। ছেলের নাম ব্র্যাড। একদিন কাজ থেকে ফিরে অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলতে যেয়ে শান্তা দেখল তার কাছে চাবি নেই। কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে কী করা যায় ভাবছিল, তখন শান্তার উপর তলার বাসিন্দা ৬ ফুট লম্বা আমেরিকান সাদা, ৩০ বছরের যুবক ব্র্যাড এগিয়ে এসে বলল, ‘আর ইউ ওকে?’ এভাবেই ব্র্যাডের সাথে তার পরিচয়—তারপর প্রেম—তারপর বিয়ে। বিয়ের পরে ব্র্যাড হয়ে গেল পুরাদস্তুর বাঙালি। পাঞ্জাবী-পায়জামা পরে অনুষ্ঠানে যায়। আর শান্তা হয়ে গেল পার্টি গার্ল।

শান্তা এগিয়ে কাছে আসতেই রঞ্জু বলল, ‘আরে পার্টি গার্ল, তুমি এখানে?’

‘এই তো, উইকএন্ডে পার্টি, তাই গিফট কিনতে এলাম।’

‘ব্র্যাড কেমন আছে ভালো?’

‘হ্যাঁ ভালো। ভাবী কেমন আছে?’

‘তোমার ভাবী। আর বলো না। আচ্ছা আসি।’ বলেই রঞ্জু হাঁটা শুরু করল।

‘ঝগড়া করছেন নাকি?’

রঞ্জু একবার ঘুরে তাকাল, কিন্তু কিছু না বলে যেভাবে হাঁটছিল, সেভাবেই হাঁটতে থাকল।

শান্তা চিৎকার করে বলল, ‘শিওর ঝগড়া করছেন।’ বলেই সে হাসতে হাসতে একটা দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। 

        সেই কালো ভক্সওয়াগনটা একটা গ্যাস ষ্টেশনে এসে ঢুকল। কৃষ্ণাঙ্গ যুবক গাড়ি থেকে বের হয়ে গ্যাস ডিসপেন্সার গাড়ির গ্যাস ট্যাঙ্কের মধ্যে ঢুকিয়ে মিটারের দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির সামনের প্যাসেঞ্জার সীটে বসে রয়েছে একজন কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরী। বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ। সে একবার বাইরে তাকাল তারপর ঘার ঘুরিয়ে তাকাল পেছনের সীটের দিকে। সেখানে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ অচেতন হয়ে আধ শোয়া অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মানুষটির মুখে অনেকগুলো ক্ষত চিহ্ন। ঠোটের কোনে রক্ত শুকিয়ে গেছে। হাতেও বেশ কয়েক জায়গায় রক্তের দাগ। মাথায় ব্যান্ডেজ পড়া। এখানেও রক্তের দাগ। ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে আছে কিন্তু তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যন্ত্রণায় তার মুখ কুচকে আছে।

কৃষ্ণাঙ্গ যুবক গ্যাস ভরা শেষ করে তার জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকাল। কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে সে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘Oh no, shit, god damn it!’

কৃষ্ণাঙ্গিনী জানালা দিয়ে মাথা বের করে জানতে চাইল, ‘What?’

        ‘I left the thing home!’

‘What thing?’

‘You know what thing, god damn it.’

‘What the hell are you talking about?’

        কৃষ্ণ-যুবক গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই গ্যাস ষ্টেশন থেকে বের হয়ে যে রাস্তায় এসেছিল সেদিকেই ফিরে চলল।

        কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি পুরনো অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল কালো ভক্সওয়াগন। গাড়ির সামনের সীট থেকে তারা দুজনেই এবার একসাথে পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখল মানুষটা এখনো অচেতন হয়ে পরে রয়েছে।

‘Watch him; I’ll be back in a minute.’ যুবক বলল যুবতীকে।

‘I gotta pee.’ যুবতী বলল।

‘You gotta pee?’

‘See, he’s still unconscious. He is not gonna go anywhere.’ যুবতী পেছনের সীটে অচেতন মানুষটিকে দেখিয়ে বলল।

‘So what? You ain’t going no where.’

‘Like I said, I have to pee.’ বলেই কৃষ্ণ সুন্দরী গাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।

‘You better get back in the car.’

কৃষ্ণাঙ্গ যুবক আরেকবার তাকাল গাড়ির পেছনের সীটে তারপর কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ঢুকে পড়ল অ্যাপার্টমেন্টের ভিতরে।

যুবক-যুবতী চলে যেতেই অচেতন মানুষটি একটু নড়েচড়ে উঠলেন। তার মুখ থেকে ছোট্ট একটি শব্দ বের হলো কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল না। সে অনেক কষ্ট করে তার শরীরটাকে টেনে তুলে কোনো রকমে উঠে বসলেন। ভয়ার্ত চোখ মেলে দেখলেন গাড়িতে কেউ নেই। মাথাটা একটু উঁচু করে তাকালেন আশে পাশে। তার চোখে-মুখে মৃত্যু ভয় স্পষ্ট। তিনি তার শরীরের সর্বোচ্চ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে গাড়ির দরজা খুলে বের হলেন। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আরেকবার তাকালেন চারপাশে তারপর খুড়িয়ে খুড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব একটা গলির মধ্যে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। 

দুই কাপ কফি শেষ করেও রঞ্জুর মেজাজের কোনো হেরফের হলো না। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল আজ রাতে সে বাসায়ই ফিরবে না। যা থাকে কপালে। এক রাত বাসায় না গেলে কি হবে? সোমার একটা শিক্ষা হওয়া দরকার। তার একটু খিধেও পেয়েছে। সকালে কফির সঙ্গে কিছু খাওয়া হয় নি। দুপুর পেরিয়েছে সেই কখন। সে ওয়েটারকে ডেকে মেনু চাইল। 

যুবক-যুবতী দুজন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ফিরে দ্রুত এগিয়ে গেল গাড়ির কাছে। পেছনের সীটে চোখ পড়তেই দুজনের চেহারা পাংশু হয়ে গেল। নেই—যে মানুষটাকে আধমরা অবস্থায় ফেলে রেখে গিয়েছিল সে নেই। যুবক রাগে অন্ধ হয়ে বলল, ‘What?’ সে যুবতীর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘I asked you to watch him, now he’s gone, god damn it.’

কৃষ্ণ সুন্দরীর কালো মুখ আরো কালো হয়ে গেল। সে বলল, ’We gotta find him; he can’t go far, let’s look around.’

তারা তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে দিল। তারপর একে অপরকে দোষারোপ করতে করতে গাড়ি নিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়ল পাশের গলির মধ্যে। তারপর শুরু করল চিরুনি অভিযান। আশেপাশের সমস্ত গলি চষে ফেলল। এতটুকু সময়ের মধ্যে আহত একটা মানুষ কত দূর আর যাবে? বেশিদূর যাবার শক্তি-সামর্থ্য তার নেই। ধরা তাকে পড়তেই হবে।

আহত মানুষটি তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ে একটি বাড়ির পেছনের দরজায় গিয়ে বসে পড়লেন। তারপর বসে বসেই দরজায় ধাক্কা দিতে থাকলেন। সে ভাঙ্গা এবং দুর্বল কণ্ঠে বললেন, ‘Help… help… Please, open the door. Help please…’ সে একবার পেছনের গলির রাস্তার দিকে তাকালেন তারপর আবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললেন, ‘Please, open the door. Help please, I need help.’

কেউ দরজা খুলছে না দেখে আহত মানুষটা ভাবল পাশের বাসায় গিয়ে সাহায্য চাইবে কি না। কিন্তু উঠে দাঁড়াবার মত শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। তিনি একবার দরজা ধরে উঠে দাড়িয় আবার বসে পড়লেন। তারপর দরজায় মাথা ঠেকিয়ে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ কেটে গেল এভাবে।

আরো বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দিল একজন সাদা চুলের আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ মহিলা। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। সে কিছুটা অবাক হয়ে দেখলেন একজন অপরিচিত লোক বসে রয়েছে। তিনি বললেন, ‘Can I help you?’

আহত মানুষটা কোনো রকমে মাথা তুলে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘Yes, please let me get in.’

সাদা চুলের বৃদ্ধা এবার ভালমতো লক্ষ্য করে দেখলেন যে মানুষটার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত। নির্যাতনের চিহ্ন শরীরের সবখানে। তিনি তার হাত ধরে বললেন, ‘Who are you? Oh, my god! What happened to you?’

আহত লোকটা কিছুই বললেন না।

বৃদ্ধা হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ধরে দাঁড় করালেন লোকটাকে। তারপর তার দুই হাতের নীচে হাত ঢুকিয়ে তাকে ঘরে ঢুকতে সাহায্য করলেন।

কালো ভক্সওয়াগন সারা অলিগলি চষে ফেলল কিন্তু যাকে খুঁজছে তাকে খুঁজে পেল না। অতঃপর তারা গেল ডেভন এভিনিউতে। গাড়ি পার্ক করে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক আর যুবতী বের হয়ে এসে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে ঢুকল একটা রেস্টুরেন্টে। কাকতালীয় ভাবে সেখানে রঞ্জু বসে রয়েছে। এবং কয়েক ঘন্টা আগে এদের গাড়ির সামনেই রঞ্জু পড়েছিল। অল্পের জন্যে রক্ষা পেয়েছে।

দুপুর পেরিয়ে গেছে সেই কখন। সোমা রান্না শেষ করে বাসার সামনের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে। সোমা ঘার ঘুরিয়ে দেয়ালে ঝুলানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল দুপুর প্রায় দুটা। সে নিজেকেই একবার বলল, ‘আশ্চর্য, আজ এত দেরি করছে কেন রঞ্জু? এত দেরি তো ও কখনো করেনা। এতক্ষণে তো খিদে লেগে যাবার কথা।’

সোমা আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। সে ফোন করল রঞ্জুকে। অপর প্রান্ত থেকে রঞ্জু ফোন ধরতেই সোমা বলল, ‘কী ব্যাপার এত দেরি করছো কেন তুমি? আমি যে খাবার নিয়ে বসে আছি, সে খেয়াল আছে?’

‘তোমাকে কে বসে থাকতে বলেছে সোমা? আমি আজ বাসায় ফিরছি না। তুমি আমাকে আর ফোন করবে না। গুড বাই।’ বলেই রঞ্জু ফোন কেটে দিল।

সোমা ফোন হাতে বসে রইল চুপচাপ।

সাদা চুলের বৃদ্ধা আহত মানুষটিকে সোফাতে শুইয়ে দিয়েছেন। প্রথমেই তাকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খাইয়ে দিয়েছেন তিনি। একটা ফার্স্ট-এইড বাক্স খুলে তুলোতে এন্টিসেপ্টিক লাগিয়ে তার ক্ষত গুলো মুছে দিলেন। একটু সময় দিয়ে বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন, ‘Who are you? Should I call the police?’

‘No.’ সে কোনো রকমে মাথা নেড়ে জানাল।

‘Are you from India?’

‘No.’

‘Where are you from?’

‘Bangladesh!’ ক্ষীণ স্বরে বললেন তিনি।

‘Bangladesh?’

‘Yes’.

‘Do you know Ron? He’s from Bangladesh too.’

‘No’.

‘Ron always takes care of my problem. His company owns this building.’

বৃদ্ধার চোখ-মুখ হঠাৎ করেই উজ্জ্বল হয়ে গেল। তার কিছু একটা মনে পড়েছে যেটা ভেবেই তিনি উত্তেজিত হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, ‘I think I know who can help you.’ বলেই তিনি চলে গেলেন ভেতরে এবং তার কর্ডলেস ফোনটা নিয়ে এসে আবার কথা বলা শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘What’s your name?’

‘My name is Ajmol, Ajmol Hossain.’ আজমল হোসেন দুর্বল এবং ভাঙ্গা কণ্ঠে কয়েকবার তার নাম বললেন এবং প্রায় সাথে সাথেই জ্ঞান হারালেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.