উত্তরাধিকার ( ১৮ তম পর্ব)

– নুরু ভাই বাড়ি আছেন?

সকাল বেলা ঘরের বাইরে থেকে অপরিচিত গলার ডাক শুনে অবাক হয় নুরা। এতো সকালে তাকে কে ডাকছে? এলাকার যে কারো গলা তার পরিচিত। অন্য সময় হলে গালির ফোয়ারা ছুটতো তার গলায়। কিন্ত বদুকে পুলিশ তুলে নেয়ার পর থেকে সে কিছুটা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। সে বিছানায় শুয়ে থেকেই যথাসম্ভব শান্ত গলায় সাড়া দেয়।
– কে?
বাইরে থেকে কেউ উত্তর দেয় না উল্টো আবার তাড়া আসে।
– নুরু ভাই, একটু বাইরে আসেন।
– খাড়ান আইতাছি।
বলে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে বাইরে তাকিয়ে সাথে সাথে দরজা বন্ধ করে ফেলে। দরজা বন্ধ করে দু’হাতে আচ্ছা মতো চোখ কচলাতে থাকে। সে কি এখনো ঘুমিয়ে আছে? সে কি স্বপ্ন দেখছে? তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে, তার ঘরের দরজায় সকাল বেলা পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাবতে চেষ্টা করছে। সে গতকাল কি কি করেছে? গত কিছুদিনের মাঝে সে কোন অন্যায় করে নি। তাহলে তার দরজায় পুলিশ কেন? দরজা বন্ধ করে সে তার বউকে ঘুম থেকে জাগায়।
– তুই তাড়াতাড়ি তগো বাইত যা, তর বাবারে ডাইক্কা নিয়া আয়।
– কি অইছে?
মেজাজ খুব খারাপ থাকায় মুখ খারাপ করে গালি দিয়ে ফেলে। সে ভুলে গিয়েছে তার শ্বশুরকে কথা দিয়েছে বউয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না। পর মুহূর্তে সে সাবধান হয়ে যায়।
– দরজায় পুলিশ খাড়াইয়া আছে। তুই তর বাপরে ডাইক্কা নিয়া আয়।
এদিকে পুলিশ ডাকাডাকি শুরু করেছে। বউকে অন্য দরজা দিয়ে বের করে দিয়ে সে সামনের দরজা খুলে বের হয়। পুলিশের একজন এসআই এবং দু’জন কনস্টেবল এসেছে।

এসআই বেশ মন খারাপ করা কন্ঠে বলে উঠে,
– নুরা ভাই, কাজটা আপনি ঠিক করলেন না। আমাদের অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছেন।
পুলিশ দেখলেই তার মাথার ঠিক থাকে না। সে সবাইকে স্যার বলা শুরু করে।
– স্যার, হঠাৎ কইরা পেটটা মোচড় মাইরা উঠল। এতো হক্কালে আপনেরা কেরে?
– আপনাকে ওসি স্যার দেখা করতে কইছে।
– আমি কি করছি?
– আপনি কিছু করেন নি। ওসি স্যার দেখা করতে বলেছে।
– স্যার, আমি তো পুলিশ দেখলেই ভয় পাই। এট্টু বসেন। আমার শ্বশুর আসুক। তারপর যামুনে।
– ঠিক আছে, আপনি ততক্ষণে তৈরি হয়ে নিন। আমরা একটু বসি।
অল্প সময়ের মাঝে আশে পাশের অনেক লোকজন জমায়েত হয়ে যায়। খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে বদু ছুটে এলেও সামনে আসার সাহস পাচ্ছে না। দূরে দাড়িয়ে উঁকিঝুকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। এমনি সময়ে তার পেছন থেকে কেউ কথা বলে উঠে,
– কিরে হউমকে যাওনের সাহস পাছ না?
বদু ফিরে তাকিয়ে রহিমউল্লাকে দেখে মাথা নিচু করে ফেলে। সে জানে রহিমউল্লা তাকে পছন্দ করে না।
– ল, আমার লগে, তর কোনু ভয় নাইক্কা।
বদুর ইচ্ছে না থাকলেও রহিমের পেছনে পেছনে আসতে থাকে।

রহিমউল্লা এসআই জোবায়েরকে দেখেই চিনতে পারে। রহিমউল্লাকে দেখে জোবায়ের সালাম দেয়।
– স্লামুলেকুম আংকেল। কেমন আছেন?
– আমি ভালা আছি। নুরা কি করেছে? তাকে ধরতে আইছেন কেন?
– জ্বী না, তাকে ধরতে আসি নি তো। ওসি স্যার ভাইকে দেখা করতে বলেছেন।
– কি জন্নি?
– আমাকে তো বলেনি।
– আইচ্ছা আপনেরা বন। আগে আপনেরা নাস্তা করেন হেরপর যাইবনে।
– না আংকেল, এখন নাস্তা করব না। নুরা ভাই আজকে এক সময় গেলেই হবে।
– না না বন।
এবার রহিমউল্লা নুরাকে ধমক দেয়।
– তুই অহনও তাগো নাস্তাপানি দেস নাই কেন? নাস্তা পানি দিয়া হেরপর আমারে খবর দিতি। যা, নাস্তার ব্যবস্থা কর।
রহিমউল্লা পুলিশকে নাস্তা খাইয়ে বিদায় করে। এরপর জমায়েত লোকদের বিদায় করে। নুরাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– চ্যালাতো একটা রাখছস ভীতুর ডিম। শয়তানটা আড়ালে দাড়াইয়া উঁকিঝুকি মারতাছিল।
সকাল থেকে অনেক ঝামেলা গিয়েছে এখনো কারো উপর রাগ দেখানোর সুযোগ পায় নি নুরা। এবার রাগে ফেটে পড়ে। যত রকমের খারাপ গালি আছে, তা একসাথে নুরার মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে।
– তরে আমি দুধ কলা দিয়া পোষতাছি এর লাইগ্গা? তুই আমার বিফদে হউমকে আওনের সাহস পাছ না। তর মোতন লোক আমার লাগব না। যা, আমার হউমকে থেইক্কা।
নুরার গালির তোড়ে বদুর ভেসে যাবার অবস্থা। সে সামনে থেকে যেতে পারলে বেঁচে যায়। নুরার বকা খেয়ে পালিয়ে বাঁচে।

সবাইকে বিদায় করে দিয়ে রহিমউল্লা ধীরে সুস্থে নাস্তা সারে। নাস্তা শেষ করে নুরাকে নিয়ে বসে।
– ক ত এই কয়দিন কি কি খারাপ কাম করছস?
– কাহা সত্য কইতাছি আমি কুনো খারাপ কাম করি নাই।
– তরে কি করে বিশ্বাস করি? তাইলে ওসি সাব তরে দেখা করতে কইল কেরে?
– আমি কিছু কইতে পারমু না।
– আইচ্ছা ওসি সাবরে আমি ফোন করি। দেহি কি কয়।
বলে রহিমউল্লা ওসি সাহেবকে মোবাইলে কল করে। প্রথমবার কল রিসিভ করে না কেউ। দ্বিতীয়বার রিং হবার পর ওসি সাহেব নিজেই কল রিসিভ করেন।
– হ্যালো।
– স্যার, আমি রহিমউল্লা।
রহিমউল্লা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি বাড়ির পরিচয় দেয়। সে জানে এখন তার বাড়ির একটা আলাদা পরিচয় আছে। ওসি সাহেব বলেন,
– বলেন, কি জন্য ফোন করেছেন?
– স্যার, আমগো বাইত্তে পুলিশ আইছিল বেইন্নালা। আপনে নাকি নুরাকে দেখা করতে কইছেন?
– হ্যাঁ, তাকে পাঠিয়ে দেবেন আমার কাছে। তার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
– আমারে কি কওন যাইব স্যার?
– না এখন বলা যাবে না। জানতে হলে আপনি পরে আসবেন। নুরাকে আজকেই পাঠিয়ে দেবেন।
– জ্বী আইচ্ছা স্যার।
বলে সংযোগ কেটে দেয় রহিমউল্লা। নুরার দিকে তাকিয়ে বলে,
– তুই আজগাই ওসি সাবের লগে দেহা করিছ।
– আপনে আমার লগে যাইয়েন।
– না, তরে একলা যাইতে কইছে।
– আমার ডর করে।
– খারাপ কাম করার সোময় ডর লাগে না কেন? আমার অহন বাজারে কাম আছে। আইচ্ছা আমি দুফুরের খাওনের পর থানায় যামুনে। তুই দুফুরের খাওনের পরপর যাইছগা।
বলেই রহিমউল্লা বের হয়ে যায়।

রিয়ার মোবাইলের স্ক্রিনে  আলো জ্বলে উঠে। সে কল রিসিভ করে মোবাইলটি কানে ঠেকায়। অপর প্রান্তে বলে উঠে,
– আস সালামু আলাইকুম স্যার, আমি ওসি কামরুল বলছি।
– হ্যাঁ বলো। কি খবর?
– স্যার, সকালে পুলিশ পাঠিয়েছিলাম নুরার বাড়ি।
ওসি সাহেব বিস্তারিত জানায় যা যা ঘটেছে। বিকেলে নুরা অফিসে আসবে এটাও জানায়। রিয়া ওসি সাহেবকে কিছু দিক নির্দেশনা দেয়। নুরার শ্বশুর আসবে শুনতে পেয়ে রিয়া তার সাথে আপাতত কিছু না বলার সিদ্ধান্ত জানায়।
– কামরুল, তুমি নুরাকে খুব হালকাভাবে ধমক দিয়ে দেবে। তাকে কিছু বুঝতে দেওয়ার দরকার নেই। পরে সে নিজেই তোমার কাছে আসবে।
নির্দেশনা দিয়ে লাইন কেটে দিয়ে সে রিশাকে ফোন করে। প্রথমবার রিং হতেই রিশা কল রিসিভ করে।
– হ্যা, রিয়া বলো।
– আপু, নুরার বাড়িতে পুলিশ গিয়েছিল।
– ভেরি গুড। তারপর।
– নুরা ভয় পেয়ে তার শ্বশুরকে খবর দিয়ে এনেছিল। তার শ্বশুর ওসি সাহেবের সাথে কথা বলেছে।
– ওসি সাহেব কি তাকে কিছু বলেছে?
– না আপু, তার শ্বশুরকে পরে আসতে বলেছে।
– তাহলে, নুরার শ্বশুরকে আপাতত কিছু না জানাতে বলে দাও। ওসিকে বলে দাও নুরা আসার পর পর যেন তোমাকে সব রিপোর্ট করে।
– আমি এখনি বলে দিচ্ছি আপু। ভালো থেকো। বাই।

রিশার সাথে কথা শেষ করে সে রিয়াদকে কল দেয়। রিয়াদের ফোন ব্যস্ত পেয়ে লাইন কেটে দেয় সে। সামনের ফাইলে মনোযোগ দেওয়ার সময়টুকু পায় না রিয়া। তার আগেই বেজে উঠে তার ফোন। সে না দেখেও বুঝতে পারে এটা রিয়াদের কল। সে ইচ্ছে করে কল রিসিভ করে না। পুনরায় বেজে উঠে তার ফোন। রিয়াদের নাম্বারে বিশেষ রিংটোন দেয়া আছে। এবার রিসিভ করে বেশ গম্ভীর স্বরে রিয়া হ্যালো বলে। তার কন্ঠ শুনে রিয়াদ ভরকে যায়।
– রিয়া, আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম।
– তুমি তো ব্যস্ত থাকবেই। আমাকে লাইনে রেখে কারো সাথে টাংকি মারছ কিনা কে জানে?
– কি বলো এসব? এমন সুন্দরী বউ থাকলে কোন শালা টাংকি মারবে? অবশ্য আমার কপাল খারাপ। সুন্দরী বউয়ের চেহারা মন চাইলে মোবাইলে দেখতে হয়।
– গ্যাস দেয়া শিখলে কবে থেকে? লক্ষণ তো সুবিধের মনে হচ্ছে না।
– আমি আবার গ্যাস দিলাম কখন? তুমি কি বলতে চাও আমার বউ সুন্দরী নয়?
– কি করে বুঝি? কেউ তো লাইন দেয় না।
– পোশাকটা খুলে রাস্তায় বের হয়ে দেখ। কতজন পেছন পেছন ঘুরে।
– নোংরা কথা বলবে না। একেবারে চৌদ্দশিকে ভরে দেব।
– আরে, তোমাকে পুলিশের পোশাক খুলে স্বাভাবিক পোশাকে বের হতে বলেছি। বিশেষ করে তোমাকে যদি শাড়িতে দেখে কেউ, নির্ঘাত সাথে সাথে মুনি ঋষিরাও তোমার প্রেমে দিওয়ানা হবে।
– যাও, তুমি শুধু বেশি বেশি বলো।
– বাকিটা বলব?
– লাইনটা কেটে দিলাম কিন্তু।
– আরে রাখ রাখ, ফোন দিয়েছিলে কেন সেটা জানা হলো না?
– নুরার কাছে আজ থানা থেকে পুলিশ গিয়েছিল।
রিয়া বিস্তারিত তাকে জানিয়ে ফোন রেখে দেয়। রিয়াদটা আসলেই একটা পাগল। রিয়ার নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হয়। রিয়াদের মতো কেয়ারী স্বামী, শাশুড়ি নয় সে মা পেয়েছে। তাদের পরিবার একটা সত্যি আদর্শ পরিবার।

বিকেলে নুরা থানায় যাবার পর তাকে ওসি সাহেব একঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে রাখে। নুরা যখন বিরক্তির চরম শিখড়ে তখন ওসি সাহেব তাকে খবর পাঠায়। নুরা সারা জীবন অপেক্ষা করাতে অভ্যস্ত। সে কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সে সালাম দিয়ে ওসি সাহেবের রুমে প্রবেশ করে।
– স্যার, ম্লামুলেকম।
– তুমি কি নুরু মিয়া?
– জে স্যার।
– তুমি নাকি মানুষ হিসেবে খুব খারাপ?
– কে কইছে স্যার?
অনেক কষ্টে মুখ দিয়ে বের হয়ে আসা গালি গিলে ফেলে।
– অনেকেই বলে। তুমি অন্যের জমি নিজের নামে নামজারি করে নিয়ে নাও।
– স্যার, হগ্গলগুলা মিছা কতা।
– তোমার নামে অনেকগুলো অভিযোগ আছে। তুমি সাবধান হয়ে যাও।
– স্যার আমি কিচ্ছু করি নাই।
– তুমি তোমার বাড়ির অনেকের জমি দখল করে রেখেছ।
– না স্যার, সব মিছা কতা।
– এর পর কেউ অভিযোগ নিয়ে এলে কিন্তু মামলা নিয়ে নেব। সাবধান হয়ে যাও।
– জে আচ্ছা স্যার।
– ঠিক আছে এখন চলে যাও। আমার কথাগুলো মনে রেখ। তোমার মঙ্গল হবে।
– জে আইচ্ছা স্যার, সেলামালেকুম।
কোন রকমে রুম থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে পঙ্খিরাজের গতিতে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। সে ভুলে গিয়েছে তার শ্বশুর তাকে অপেক্ষা করতে বলেছে।

চলবে——–

-বাউল সাজু

Leave a Reply

Your email address will not be published.