উত্তরাধিকার ( ১ম পর্ব )

 

গুলশানের সুদৃশ্য এক আলিশান বাড়ির ড্রয়িং রুম। এন্টিক সোফা আসবাবে সাজানো। চারপাশে প্রাচুর্যের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রচন্ড রকমের হাস্যকর ভাবে সোফায় পা তুলে বসে আছে লোকটি। তার পায়ে কাঁদামাটির চিহ্ন চোখে পড়ে। সহজেই বুঝা যায় এ বাসায় ঢোকার পর সার্ভেন্ট হাউজের ওপেন টেপ থেকে পা দুটো ঘসে মেঝে এসেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের কাঁদামাটি এতো সহজে পায়ের দখল ছাড়তে নারাজ। কম দামী একজোড়া চামড়ার স্যান্ডেল বড় বেমানান ভাবে পড়ে রয়েছে ইরানী কার্পেটে।

লোকটির নাম নুরুমিয়া। সবাই তাকে নুরা নামে ডাকে। জমির দালালী করে। বয়স চল্লিশ পার হয়েছে। এই মুহূর্তে তাকে দেখাচ্ছে ধূর্ত শেয়ালের মতো। তার চোখ দুটো অনবরত ঘুরছে দামী আসবাবে। হাত দুটো এক করে কোলে রাখা। হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দুটো প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন করছে। একবার বাম চেপে ধরছে ডানকে, পরক্ষণে ডান ছিটকে ফনা তুলে ঝাপিয়ে পড়ছে বামের উপর। এটা নুরার মুদ্রাদোষ। কিন্ত তার ঠোট জোড়ায় লেগে আছে এক অমায়িক স্বর্গীয় হাসি। বহু প্রচেষ্টায় নুরা রপ্ত করেছে এ হাসি। এটাই তার ব্যবসার একমাত্র পুঁজি।

– কখন এলে নুরু?
তড়াক করে দাড়িয়ে পড়ে সে। চোখ, হাত যে যার মতো সুবোধ বালকে পরিণত হয়। ঠোটে স্থান পায় তার ট্রেডমার্ক হাসি।
– স্যার, বেশিক্ষণ না।
বাস্তবে প্রায় দুই ঘন্টা যাবত বসে আছে সে। তার মাঝে বিরক্তির ছিটেফোটা নেই। দেখে মনে হচ্ছে মাত্র এসে সোফায় গা এলিয়েছে। কোন এক বাহকের মাধ্যমে জানতে পারে নুরু শাহরিয়ার সাহেব কিছু জমি কিনবে। তাই সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই চলে এসেছে। নাস্তা খাওয়ার সময় হয় নি। তার উপর দুই ঘন্টা অপেক্ষা। পেটে রীতিমতো ছুঁচো দৌড়াচ্ছে। কিন্তু চেহারায় তার লেশমাত্র নেই।

শাহরিয়ার সাহেব রেশ রাশভারী টাইপের লোক। অকারণে কোন কিছু নিয়ে আগ্রহ দেখান না। তার বাবা একজন সরকারী আমলা ছিলেন। তার রেখে যাওয়া অর্থ সম্পদ কাজে লাগিয়ে সৎ ব্যবসার মাধ্যমে কঠিন পরিশ্রম করে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছেন। অনেকদিন থেকে ইচ্ছাপোষণ করছেন তার পৈত্রিক নিবাসে বেশ কিছু জমি কিনে একটি মানসম্পন্ন কলেজ করবে। সেই উদ্দেশ্যে নুরুকে খবর দিয়েছে। অবশ্য নুরু জানে না শাহরিয়ার সাহেব তাকে খবর দিয়ে আনিয়েছে।

– তারপর, কি খবর তোমার? কেমন চলছে তোমার দালালী?
চোখ কপালে উঠে যায় নুরার। তাকে সরাসরি দালাল বলার সাহস কেউ দেখায় না। সবাই তাকে এড়িয়ে চলে। মেজাজ ঠান্ডা রাখে সে। অনেক বড় মাছ। তাকে খেলিয়ে খেলিয়ে ডাঙ্গায় তুলতে হবে। হিসেব করে পা ফেলতে হবে। নুরা হাসি হাসি মুখ করে বলে,
– কি যে বলেন স্যার? এই একটু আধটু ব্যবসা করে খাই। লোকে কত কথা বলে।
স্মিত হাসি ফুটে উঠে শাহরিয়ার সাহেবের ঠোটে।
– তা কি কি ব্যবসা কর তুমি?
– আমার দুইখান ইটের ভাটা আছে স্যার।
– তাই নাকি? তাহলে তো আমার লোকজন ভুল লোককে খবর দিয়ে নিয়ে এসেছে।
– জ্বী না স্যার, আমাদের এলাকার জমিজমা বিক্রির লগে আমি এট্টু জড়াইয়া আছি। বলেন স্যার কি দরকার?
– চলো নাস্তার টেবিলে বসি। নাস্তা খেতে খেতে কথা বলি।

নাস্তার আয়োজন দেখে নুরার চক্ষু চড়কগাছ। দুজন মানুষ নাস্তা করবে অথচ টেবিলে কি নেই। জিভে জল এসে যাচ্ছে নুরার। তার অবস্থা অনুধাবন করে শাহরিয়ার সাহেব বলেন,
– তোমার যেটা পছন্দ নিয়ে খাও।
– জ্বী স্যার, আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি নিয়ে খাচ্ছি।
শাহরিয়ার সাহেব মনে মনে বলেন, তোকে খাওয়ানোর জন্যই ঢেকে এনেছি। তিনি ভাবলেশহীন ভাবে একটি পরোটা এবং সবজির প্লেট টেনে নেয় নিজের দিকে।

শাহরিয়ার সাহেব চেয়ে চেয়ে নুরার খাওয়া দেখে। সব রকম নাস্তা খেয়ে ঢাউস এক কলা মুখে দিয়ে এবার কথা বলার ফুসরত হয় নুরার।
– স্যার, কোথায় জমি কিনবেন?
নুরার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শাহরিয়ার সাহেব উল্টো প্রশ্ন করেন,
– তুমি কি চা খাবে?
– জ্বী স্যার, একটু হলে মন্দ হয় না।
তিনি বেয়ারাকে দুই কাপ চা দিতে বলেন। নুরার জন্য দুধ চা দিতে বলেন। তারটা বলার দরকার নেই বেয়ারা জানে। স্যার লেবু চা পছন্দ করেন।

নুরা মাত্র চায়ের কাপ মুখে তুলে লম্বা চুমুক দিয়েছে। শাহরিয়ার সাহেব একটি জমির আরএস দাগ উল্লেখ করেন। নুরা এতোটাই চমকে উঠে যে, তার জিহ্বা পোড়ার সাথে সাথে বুকের কাছে সাদা জামায় ছলকে চা পড়ে বুকের চামড়ায় ছ্যাঁকা লাগে।
– কি হলো নুরা?
– জ্বী না, কিছু না।
– তুমি কি এই দাগের জমিটা চেন?
– জ্বী স্যার, চিনি।
– পাশাপাশি চারটে দাগে প্রায় এক একরের বেশি জায়গা আছে। আমি এ জায়গাটুকু কিনতে চাই, তুমি ব্যবস্থা কর।

নুরা বরফের মতো জমে যায়। তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইতে থাকে। এখন তার মনে হচ্ছে তার সামনে জ্যান্ত এক বিশাল সিংহ বসে আছে। হাসিখুশি মানুষটি মুহূর্তে বিশাল সিংহে রূপধারণ করেছে। সে নড়তেচড়তে ভয় পাচ্ছে। তাকে আস্ত গিলে খাওয়ার অপেক্ষায় আছে সামনে বসা লোকটি।
– কি হলো নুরু? কথা বলছ না কেন?
অনেক সাহস সঞ্চয় করে নুরা বলে,
– স্যার, আপনি কি জানেন? এগুলো সব বাড়ি?
– হ্যা, জানি। তবু কিনতে চাই।
– কেউ বিক্রি করবে না স্যার।
– কত দাম হলে বিক্রি করবে আমাকে জানাও। তুমি খোঁজ খবর নিয়ে সাতদিন পর এসো। আর হ্যাঁ, আমি ড্রাইভারকে বলছি তুমি যেখানে যেতে চাও, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে।
কথা শেষ করে শাহরিয়ার সাহেব সোফা ছেড়ে ডুপ্লেক্স বাড়ির সিড়ির দিকে হাটা শুরু করে।

নুরা এসি গাড়ির ভেতর বসে দড়দড় করে ঘামতে থাকে। জীবনে এতো ভয় কোনদিন পায় নি নুরা। এলাকার মানুষ তার ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। সেই নুরার সাথে এমন ব্যবহার। তার বাপ দাদার ভিটে মাটি কিনে নিতে চায় লোকটি। কি উদ্দেশ্য লোকটির? শুনেছে একটি কলেজ করবে। তাহলে তাদের ভিটেমাটে কেন? নুরার মাথার চিকন বুদ্ধি কাজে লাগছে না। কোন কুলকিনারা পাচ্ছে না সে। নিশ্চয় এর মাঝে অন্য কোন কাহিনী আছে। তাকে জানতে হবে এর আসল রহস্য!
চলবে———-

– বাউল সাজু

Leave a Reply

Your email address will not be published.