অনুধাবন ( ২৫তম পর্ব )

সকাল থেকেই আজ তালুকদার বাড়িতে সাজ সাজ রব। এতোদিন ধরে ঘরের বাইরে থাকা ঘরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষজন আজ হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরবে। যে যার জায়গায় মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ করছে। আসমা বেগম ছেলে আর ছেলের বৌয়ের পছন্দের খাবার নিজের হাতে রান্না করছেন। তালুকদার সাহেব কখনোই আবেগের বা ভালবাসার বাড়াবাড়ি লোক সম্মুখে না দেখালেও ওনার রোজদিনের কর্মতৎপরতা আজকে যেন একটু বেশী তাড়াতাড়িই শুরু হয়েছে। উনি নিজেও খুব দ্বিধাতে আছেন ছেলেকে আগে তুলবেন নাকি নাতিকে। সে যাই হোক বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি না বের হলে শহরের হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরী হয়ে যাবে। উনি চান সবাই মিলে আজ দুপুরের খাবার একসাথে খাবেন। আড়ত থেকে বরকতকে তুলে নেবেন সাথে বলেই ভেবেছেন। উনি চেয়েছিলেন আসমা বেগম সহ যেতে। কিন্তু আসমা বেগম সাথে যাওয়ার চেয়ে রান্না করতেই বেশী আগ্রহী বিধায় তালুকদার আর জোর করেন নি। কতক্ষণ একা একা বসে থেকে শেষে হাঁক দিয়েই বসলেন, ‘কই গো আসমা, নাস্তা দিতে আর কত দেরী? আমার হাতে তো সময় বেশী নাই।’
তাড়াহুড়া করে নাস্তা শেষ করে আড়তের দিকে ছুটলেন তালুকদার সাহেব। পেছনে তাকালে দেখতে পেতেন দরজায় দাঁড়ানো আসমা বেগম খুশীতে শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছছেন। কতদিন পর তার ছেলেটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। নাতি, ছেলের বৌও আসবে। কিন্তু সব ছাপিয়ে ওনার রাসেল ওনার ঘরে ফিরে আসছে আবার, চাইলেই ছেলেকে আগের মতো প্রতিদিন দেখতে পাবেন; সেটাই যেন আসমা বেগমকে বেশী আপ্লুত করে রাখছে। নিজের মনের খুশীর পাশাপাশি তালুকদারের চোখের আলোটুকু দেখেও বড় ভালো লাগছে তার। আসমা বেগমের এতোদিনের সংসার জীবনে কেন যেন মনে করতেন তালুকদারের মায়া দয়া বড় কম। কিন্তু গতকাল রাত থেকেই স্বামীর উচাটন মনের কাজকর্মে থেকে থেকেই উনি খুশীতে কাঁদছেন আর নিজেকেই নিজে মনে মনে ধিক্কার দিচ্ছেন, কি একটা ভুল ধারনাই না ওনার নিজ স্বামীকে নিয়ে ছিল। আসলেই শুধুমাত্র মা বাবাই বোধহয় জীবনের যে কোন সময় সন্তানের যে কোন আনন্দে খুশীতে ভাসতে পারেন।

বরকত আর ম্যানেজার দুজনেই আজ তাড়াতাড়িই এসেছেন আড়তে। আজিজ মিয়া তখনো এসে পৌঁছেনি। তালুকদার পৌঁছেই বরকতকে তাড়া দিল গাড়িতে ওঠার। ম্যানেজার সাহেবের সাথে কিছুক্ষণ কথা শেষে যেই তালুকদার গাড়িতে উঠতে যাবেন তাদের সামনে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে নেমে আসে পুলিশের কনস্টেবল।

সালাম তালুকদার সাহেব, কোথাও যাচ্ছিলেন?

হ্যা, একটু শহরে যাচ্ছি। কোন সমস্যা?

না সমস্যা না। তবে বড় স্যার আপনাকে এখুনি একটু থানায় যেতে বলেছে। খুবই আর্জেন্ট।

আমি আসলে আমার নাতিকে হাসপাতাল থেকে আনতে যাচ্ছি। আজকেই হাসপাতাল থেকে ছাড়বে। এসে থানায় চলে আসলে হবেনা? ইচ্ছে করেই ছেলেকেও আনতে যাচ্ছেন সে কথা এড়িয়ে গেলেন।

আপনি বরং এখুনি চলুন। মনে হয়না থানায় বেশী সময় লাগবে।

অনেকগুলো চিন্তা একই সাথে মাথায় এসে ঘুরপাক খেতে লাগলো। কি হতে পারে এতো আর্জেন্ট কলের? তার চেয়েও বড় ব্যাপার হাসপাতালে ছেলে ছেলের বৌ দুজনেই অপেক্ষায় থাকবে। আর কাউকে পাঠাতেও মন সায় দিচ্ছে না। নিজের প্ল্যানে কোন গড়বড় হলে তালুকদারের মেজাজ খারাপ হয়। কিন্তু পুলিশের ডাক অগ্রাহ্য করার মতো এতো বোকা উনি না। তাই বিরক্তিটুকু চেপে রেখে মাথা নেড়ে বললেন, আচ্ছা চলেন যাই। আড়ত থেকে থানা বেশী দূরের পথ না। মনে মনে ভাবছিলেন কোন কারণে উনি যদি আটকা পরে যান তাহলে আজিজ মিয়াকে পাঠানো যেতে পারে। কিন্তু গতকাল তো উনি নিজেই বাড়ি বয়ে আজিজকে বলে এসেছেন শরীর খারাপ লাগলে আজ আসতে হবেনা। নিজের ওপরও এটা ভেবে রাগ লাগছিল তালুকদারের। হুট করে মাথায় প্ল্যান এসে যাওয়াতে জলদি গাড়ি থামাতে বললেন।

বরকত, তুই এক দৌড়ে আজিজের বাড়ি যা। তারে বলবি, যেন আড়তে আসে। শরীর খারাপ লাগলে আজ কাজ করার দরকার নাই। আমার পেছনের ঘরে যেন শুইয়া থাকে। আমার যদি থানায় কোন কারণে দেরী হয় তাইলে তুই আর আজিজ যাবি হাসপাতালে। তুই তো চিনস ই কোথায় যাইতে হইবো। ম্যানেজার সাবরে বলবি হাসপাতালে ফোন দিয়া দিতে আমাদের একটু দেরী হইতে পারে, ওরা যেন চিন্তা না করে। বরকত নেমে গেলে তালুকদার একাই রওয়ানা দিলেন থানার পথে। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলেন না যদিও থানা থেকে এতোটা জরুরী তলবের কারণ কি হতে পারে?

তালুকদারের মুখ থানার সবারই কম বেশী চেনা। এর ওর সালামের জবাব দিতে দিতেই ডিউটি অফিসারের রুমে ঢুকলেন। এই ছেলেটা নতুন এসেছে এই থানায়। কাজে কর্মে বেশ চটপটে যতদূর শুনেছেন। কি একটা ফাইলের যেন কাজ করছিল। মুখ তুলে তালুকদারকে দেখে দাঁড়িয়েই সালাম দিল।

স্যরি তালুকদার সাহেব আপনাক এতো জোর করে ডেকে আনার জন্য। কিন্তু এছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা। প্লিজ বসেন।

না না ওসি সাহেব, আপনারা নিজেদের কাজ করছেন। দরকার লাগলে তো অবশ্যই খবর পাঠাবেন। বলেন কি ঝামেলা করেছি?

না না সে কি আপনি কেন ঝামেলা করবেন। বরং অন্য লোকেই না আপনাকে ঝামেলায় ফেলেছে। কাজের কথায় আসি। আমরা সেদিন একই সাথে আপনার বাসায় এবং গুদামে আগুন লাগার বিষয়টা তদন্ত করেছি। প্রাথমিকভাবে কয়েকজন দোষী সাব্যস্ত হলেও মূল হোতা বের হয়েছে দুজন। অনেক রাত হয়েছে দেখে আপনাকে কাল আর জানাইনি। কাল রাতেই আমরা দুজনকেই গ্রেফতার করেছি। একটু সামান্য উত্তম মধ্যম দিতেই দুজনেই স্বীকার করেছে তাদের অপরাধ। তার মধ্যে ঘরের ভেতর তেল ফেলে আপনার পুত্রবধুর ক্ষতির চেষ্টা করেছেন আসলাম মানে আপনার মেয়ের জামাই। আর গুদামের আগুন লাগে আপনার ছোট ভাই রতনের নির্দেশে। দুটো ঘটনাই এটেম্পট টু মার্ডারের আওতায় পড়ে। এ ধরনের কেসগুলো আমরা খুব দ্রুত কোর্টে পাঠিয়ে দেই। আমি আপনার কথা ভেবে ব্যাপারটা এ বেলার জন্য থামিয়ে রেখেছি। দুজনই শুধু আপনার কাছের মানুষই না বলা চলে বোধ করি নিজের ঘরের মানুষ।এখন আপনি যা বলবেন তাই করবো। আপনি এলাকার সম্মানিত মানুষ। আপনি আমাদের দিকে খেয়াল রাখেন আপনার ইজ্জতের দিকে খেয়াল রাখাও আমাদের দায়িত্ব।

‘ওয়াদুদের নাম কেন কোথাও নাই? পুরো প্ল্যান ওয়াদুদের হওয়া সত্ত্বেও ধরা খাইলো নিজের ঘরের দুই বলদ’, এসব ভেবে নিজের মনের বিরক্তি চেপে রাখাটাই কষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। কোর্টে কি পাঠিয়ে দেবেন কি না দুজনকেই এ সিদ্ধান্ত নিতেও ভাবতে হচ্ছে। অথচ ওয়াদুদ হলে এ বেলা ওটাকে জেলে পাঠিয়ে বেশ কিছুদিন আটকে রাখা যেত। “আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ অফিসার। আমি এ ব্যাপারটা আর সামনে আগাক তা চাচ্ছিনা। বুঝতেই পারছেন নিজের ঘরের ব্যাপার লোকে জানলে আমার জন্যই সমস্যা। কিভাবে কি করা যায় আপনি পরামর্শ দিন প্লিজ।” “আপনি কেস উইথ ড্র করে নিন। কিছু পেপার ওয়ার্ক আছে। আমি, আপনি চাইলে ওদেরকে আরেকটু কড়কে দিয়ে ছেড়ে দিব। শুনেছি আপনি নাতিকে আনতে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। আমি বলবো, অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিন। আপনাকে এখানে বেশ খানিকটা সময় ব্যয় করতে হবে। অনেকগুলো কাগজের ব্যাপার বুঝতেই পারছেন। আপনি কি ওদের সাথে কথা বলতে চান?” “ধন্যবাদ অফিসার, না কথা বলতে চাইনা। আপনার ফোনটা একটু ব্যবহার করতে পারি অফিসার? একটু আড়তে জানিয়ে দিতাম, নয়তো ওরা হাসপাতালে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।”

একবারের রিংয়েই ফোন উঠালো ম্যানেজার সাহেব।”হ্যালো ম্যানেজার, আমি তালুকদার। বরকত কি ফিরেছে আজিজ কে নিয়ে?” “জ্বি সাব, অনেকক্ষন আগেই আসছে। আপনের ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলাম। বরকতকে কি থানায় পাঠাবো?”

“না পাঠাতে হবেনা। আমি গাড়ি পাঠায়ে দিতেসি আজিজ মিয়াকে বলো বরকতকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যাইতে। আগে লিমাদেরকে তুলে তারপর যেন রাসেলকে তুলতে যায়। আর যাওয়ার পথে আমার বাসায় একটু জানায়ে দিতে বইলো, আমি একটু থানায় কাজে আটকে গেছি। সব ঠিক থাকলে দুপুরে বাসায় চলে আসবো।” “জ্বি সাব। কোন সমস্যা হয় নাই তো? আমার কোন সাহায্য লাগবে?” ‘না সেরকম কিছু না। কালকে আড়তে এসে এই ব্যাপারে কথা বলবো নে। ফোন রাখলাম।”

অফিসার কাজ গোছানোর ফাঁকে তালুকদার চারদিক দেখে নিচ্ছিলেন। জীবনের কত বিচিত্র রূপ, থানায় আসলে বুঝি তার খানিক বোঝা যায়। আমাদের জীবনটাও তো এমন খাঁচায় বন্দী মানুষের মতো। এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াই যদিও জানিনা কি আছে পর মূহুর্তেই। তারপরও কত স্বপ্ন রোজদিন বুনি অজানা দিনে সুখে থাকার আশায়।

-ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

চলবে….

Leave a Reply

Your email address will not be published.