অনুধাবন ( ১৫ তম পর্ব )

হাকিম আর লোকমানের গায়ে কোনরকম হাত দেয়া নিষেধ ছিল তাই কোনরকম মারধোর ওদের করা হয়নি। কিন্তু জোর করে ঠেলে ভটভটিতে ওঠানো, কিংবা খাল পাড়ে ঠেলে ফেলার সময়ে হাকিমের পা বুঝি শক্ত কিছুতে ঠুকে গিয়েছিল। হাসপাতালে প্রথমে মচকেছে ভেবে কিছু না করলেও পরের দিন পা অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়ায় এক্সরে করতে হয়। দেখা যায় খুব বাজে ভাবেই পায়ের হাড় ভেঙেছে। গ্রামের গৃহস্থ পরিবারগুলোতে সারা বছরের থাকা খাওয়ার মতো অর্থ ও খাবার মজুদ থাকলেও কারোই তেমন কাঁচা টাকা পয়সা জমানো থাকেনা। ফলশ্রুতিতে ছেলেদের চিকিৎসার জন্য সেই তালুকদারের শরনাপন্নই হতে হয়। আর তাদের বাবা অবশ্যই তার মেঝো ভাইয়ের ওপর দারুন খুশীও হয় কারণ তালুকদার না এলে এতো তোড়জোড় করে ওদের হাসপাতালে হয়তো নেয়া হতোনা। বড় ধরনের অপারেশন লাগে হাকিমের পায়ে। আট সপ্তাহের আগে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবেনা বলেই জানিয়েছে হাসপাতালের বড় ডাক্তার।

অন্যদিকে লোকমানের শরীরে কিছু কাটাছেঁড়া চোট ছাড়া তেমন কিছু হয়নি ভেবে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার দুদিন পরেই আবার ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে হয় তার হুট করে সশব্দে চিৎকার করে কেঁদে ওঠার দরুন। সাথে উল্টাপাল্টা বকছিল সে। ডাক্তার জানায় মারাত্মক রকমের মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে সে এমন ব্যবহার করছে। দেয়া হয় ঘুমের ঔষধ। পুরো সারাদিন ঘুমেই কাটছে তার বলতে গেলে। সুস্থ স্বাভাবিক দুই ছেলের হঠাৎ অসুস্থতায় পুরো বাড়ি যেন থমকে গেছে। কে এমন করেছে, কেন করেছে কিছুই বুঝতে না পেরে সবাই হতবিহবল। ছেলে দুটোকে গ্রামে সবাই ভালো ছেলে বলেই যে জানে।

গ্রামের বাড়িতে পাশাপাশিই ছিল হাকিমদের আর তাদের ছোটচাচা রতনের ঘর। শুধু মেঝো ভাই তালুকদার শহরের কাছাকাছি থাকে বিধায় দুই বাড়ির মাঝে নামকাওয়াস্তে একটা দুরুমের ঘর আছে। মাঝে মাঝে গ্রামে সালিশ বা অন্য জমি জমা সংক্রান্তে কাজে রাত হয়ে গেলে ঐ ঘরে তালুকদার সাহেব থেকে যায় বলে। এ ঘটনার জেরে হাকিমের মা আর রতনের বৌ দুই জায়ে মুখামুখি লেগে যায় ছেলেরা হাসপাতালে পৌঁছার কয়েক দিনের মধ্যেই। হাকিমের অপারেশন পরবর্তী সময়ে বাবা মা দুজনকেই জানায় ভটভটিতে তাদের সাথে বসে থাকা লোকদের কথোপকথনটুকু। সে রাতেই তালুকদার আর রতনের বড় ভাই কালাম মিয়া থানায় ডায়েরী করার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু তালুকদার তাকে থামায় এই বলে যে ঘরের মধ্যে কোর্ট কাচারী হলে সেটা গ্রামে তাদের অবস্থান নামিয়ে দেবে। যেহেতু তালুকদার ছেলেদের সব খরচ বহন করছে সাথে হাসপাতালের সব খবরাখবরও রাখছে তাই বড় ভাই ব্যাপারটা চেপে গেলেও দুই ঘরের লোকদের মুখ দেখাদেখি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

আর এই এতো বড় ক্যাচালের মধ্যে পরে দলিলের খোঁজ নেয়ার ব্যাপারটা পুরোই ধামাচাপা পরে যায়। এই পুরো ব্যাপারটিতে একজন খানিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও দুই জন মানুষ পড়ে যায় ভীষণ অস্বস্তিতে।

নিজের পরিকল্পনামাফিক কাজ সামনে আগালে ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক। লিমা ব্যবসার কাগজপত্র বুঝে নিচ্ছে একটু একটু করে। মেয়েটার মাথা বেশ ভালো। ম্যানেজারের ভাষ্যমতে অল্প সময়েই অনেক দূর এগিয়ে গেছে ব্যবসার কৌশলগত দিকে। নাজমাকে ভালোয় ভালোয় পার করে দেয়া যাচ্ছে বাড়ি থেকে। এখন অপেক্ষা আর তিন মাসের। রাসেলের সাথে ডিভোর্সের কাগজ হাতে পেয়ে গেলেই ঐ দিক দিয়ে নিশ্চিন্ত। অন্তত সম্পদের ভাগীদার একজন কমলো। অন্যদিকে পুরো ব্যাপারটাই আড়ালে আবডালে করার কারণে লোকে বলবে নাজমার স্বভাব খারাপ। কার না কার সাথে চলে গেছে। কাজেই রাসেল বা বলা চলে তালুকদার পরিবার একটা বদনাম হতে বেঁচে যাবে। দলিলের খোঁজ নেয়ার মানুষেরা আপাতত বেশ কয়েক মাস আর কোন ঝামেলা পাকাতে পারবেনা। সব কিছু ঝামেলা ছাড়া নিয়ম মেনে হলেও একটা খচখচানি কিছুতেই দূর করতে পারছেনা তালুকদার। আর তা হচ্ছে ওয়াদুদকে কিভাবে শায়েস্তা করা যায়। রতন যদি আবারো কোন ঝামেলা করতে চায় বড় ভাইকে দিয়ে লাগলে কেইস দিয়ে থামায়ে দেয়া যাবে। কিন্তু ওয়াদুদের জন্য মোক্ষম কোন অস্ত্র খুঁজে না পাওয়াতেই যত অস্বস্তি হচ্ছে তাঁর।

……………

অন্যদিকে রতন তখন নিজের পরিকল্পনার এমনতর বানচালে কি করবে বা কি করবেনা এই ভেবেই দিশেহারা। তালুকদার যে এমন একটা প্যাঁচ করতে পারে ওয়াদুদ ধারনা দেওয়ার পরও সতর্ক না হওয়ায় নিজের ওপর নিজেরই রাগ লাগছিল রতনের। ঘরে বাইরে এমনভাবে আটকে যাবে বুঝতে পারলে ছেলেদুটোর ওপর আরো তীক্ষ্ন চোখ রাখা যেত। সে যাই হোক এই অসম যুদ্ধে এক পরিকল্পনা বানচালে মুষড়ে পরলে চলবে কেন? অন্য উপাত্তগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে। আর সেক্ষেত্রে মোক্ষম অস্ত্র এখন রেহানা আর শাহানার স্বামীরা। বিশেষ করে রেহানার স্বামী আসলামতো ভীষণ ক্ষেপে আছে শ্বশুরের ওপর। সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অস্থির প্রায়। ওয়াদুদকে আপাতত কিছুদিন এড়িয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আসলামকে নিয়ে নতুন কোন পরিকল্পনা করা যায় কি না তা ভাবতে ভাবতেই বাড়ি থেকে রতন রওয়ানা দেয় আসলামের দোকানের উদ্দেশ্যে।

………………..

হাকিম আর লোকমানের ঘটনায় ব্যাপক অস্বস্তিতে পরে যাওয়া দ্বিতীয় মানুষটি আর কেউ নয় স্বয়ং আজিজ মিয়া। না চাইলে ও ঘটনার সাথে তার দারুন রকমের একটা সম্পৃক্ততা হয়ে গেছে। যে কোন এক পক্ষও যদি ব্যাপারটাকে মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়ায় প্রথম নাম আসবে আজিজের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ব্যাপারটা করলো কে? তালুকদার, রতন নাকি অন্য কোন তৃতীয় পক্ষ? সবার পক্ষেই চাইলে যুক্তি দাঁড় করানো যায়। কিন্তু অন্যের পক্ষে বিপক্ষের যুক্তির চেয়ে নিজের পিঠ বাঁচানো নিয়েই আজিজ মিয়া এ মূহুর্তে বড়ই অস্থির হয়ে আছেন। খাওয়া, ঘুম কোন কিছুতে শান্তি পাচ্ছেন না। পাছে লোকে কিছু সন্দেহ করে ভেবে কাজে যাচ্ছেন যদিও রোজই। তবে তার খুব ইচ্ছে করছে রোশনী আর রোমেনাকে নিয়ে বহু দূরে কোথাও চলে যান।তালুকদার আর তার পুরো পরিবারের ছায়া ও যেখানে পৌঁছাবে না। কিন্তু চাইলেই কি সম্ভব? তার জীবনের সুতো যেন সৃষ্টিকর্তা তালুকদারের হাতের মুঠোতে দিয়ে রেখেছেন। আনমনে থাকার কারণেই বুঝি বারান্দায় রোমেনা বেগমের উপস্থিতি টের পাননি। আর তাই রোমেনার গলার স্বরে ভীষণ ভাবে চমকে ওঠেন আজিজ মিয়া।

আপনের কি হইসে, আমারে বলবেন? এমনভাবে চমকায়ে উঠলেন যেন ঘরে ডাকাইত পরসে।

রোমেনা, রোশনী বোরকায় ভালোমত মুখ ঢাইকা স্কুলে যায় তো? ওর চেহারা দেখন যায়না তো?

ও বোরকা পইড়াই স্কুলে যায়। কিন্তু তার লগে আপনের চিন্তার সম্পর্ক কি? খারাপ কিছু শুনছেন নাকি মাইয়ারে নিয়া? আমি নিজেতো তারে স্কুলে দিয়া আসি, নিয়া আসি।

না, বৌ; ঐ রকম কিছু না। আমার না মাঝে মইধ্যে খুব অবাক লাগে আল্লাহর কাজ কারবারে। আমগো পোলাপাইন আছিলো না সেই এক ভালো আছিল। কিন্তু এমন একজনরে আমাগো ঘরে আল্লাহ আইনা দিল যারে মায়ার লাইগা ছাড়তে ও পারি নাই। আর এখন তারে লইয়া নিত্য ডরে থাকি।

ডরাইতাসেন কেন সেইটা তো কইলেন না?

তালুকদার বড় কঠিন মানুষ গো বৌ, বড় কঠিন মানুষ। বাদ দাও ঐসব কথা। বহুত ঘটনা আছে। তোমারে বললে শুধু শুধু পেরেশানী করবা। বরং তুমি মাইয়াডারে একটু সামলায়া রাইখো। কার কখন কি হইয়া যায় কেউ কি জানে?

………………

পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষ মনে করে সে যেভাবে ভাবছে সেটাই ঠিক। আর বাদ বাকী মানুষরাও তার মতো করেই ভাবছে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, যেমন তালুকদার। তার কূটকৌশল তার প্রতিপক্ষের থেকে একদমই অন্যরকম। আর তাই তার কাজগুলো সে তার মত করে সুনিপুণ ভাবে এগিয়ে নেয়। একটাই দুঃখ তার মতো করে তাকে কেউ বোঝেনি কোনদিন। এমনকি তার নিজের মানুষেরাও না। কেউ কোনদিন তার বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের প্রশংসাও করেনি। শুধু দিনশেষে নিজের প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির যোগফল মিলিয়ে একা একা নিজেকেই বাহবা দিয়ে যায় তাই।

অন্যদিকে তারই ছোটভাই রতন যে কি না শুধুই জিঘাংসার বশবর্তী হয়েই পিছু লেগেছে তারই সহোদরের। কিন্তু রতন এটা জানেনা, যুদ্ধ লাগতে হয় সমশক্তির সাথে, নয়তো হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রবল।

তালুকদারের একটাই সমস্যা। তার শত্রু চতুর্দিকে, এমনকি স্বয়ং নিজের মেয়েজামাইরাও তার বিপক্ষে। তবে তালুকদারের মতো কৌশলী ও প্রভাবশালী লোকেরা অনেক শত্রু চারপাশে নিয়েই বোধহয় খেলতে মজা পায়। কারণ তাদের কাছে জীবন একটা চ্যালেঞ্জের মতো। কথা, কাজ, অর্থ আর বুদ্ধির খেলায় একের পর এক লোক হারানোর মজাই যে অন্যরকম।

-ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

চলবে…

https://www.facebook.com/groups/1749042645384412/permalink/2213178965637442/

Leave a Reply

Your email address will not be published.