স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার

তপু ছিল আমার বাল্যবন্ধু। বয়সে ও ক্লাসে আমার চেয়ে এক ক্লাস উপরে হলেও পাড়ায় ওর সমবয়সী কেউ ছিল না। তাই না চাইলেও বিকেল বেলার খেলার সময়টুকু ওকে আমাদের সাথেই মেয়েলি খেলা খেলতে হতো। আমাদের পুতুল খেলার সাহায্যকারী ছিল সে। বাজার করে দেয়া, ফুটফরমাশ খাটা, পুতুল বিয়ের সময় দুপক্ষে কথা বলা এসব কাজ ও হাসিমুখেই করতো। ওর পাল্লায় পরে অবশ্য আমাদেরও পায়ে ফুটবল বা হাতে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে সপ্তাহে এক দুবার দৌঁড়াতে হতো।

খুব ভালো ছাত্র ছিল সে। পুরো পাড়ায় ওকে সবাই চিনতো সে হিসেবে। আমাদের অবশ্য তাতে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না কখনোই। পড়াশোনা নিয়ে এতো মাথা ঘামানোর সময় কোথায়? শুধু সন্ধ্যায় পড়তে বসলে যখন মা বলতো সারাদিন আছিস খেলা নিয়ে, তপুকে দেখ কি ভালো রেজাল্ট করে সবসময়। তখন ইচ্ছে করতো ওকে দিয়ে আসি মাথায় একটা ঠুয়া, এতো ভালো স্টুডেন্ট হতে কে বলেছে তাকে? তবে ওর সাথে আমার অন্যরকম খাতির ছিল সবসময়ই, একই বিল্ডিংয়ে থাকতাম দেখে হয়তো। আর তাছাড়া আমাদের বাবা মায়ের ও ছিল দারুন বন্ধুত্ব।

আমাদের সে সময় ক্লাস সিক্স মানেই ক্যাডেটের ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করতো সবাই। পুরো পাড়ায় একটা ট্রেন্ডের মতো ছিল। তপু টিকে যাবে এটা আমরা সবাই জানতাম। প্রথমবার ক্যাডেটে যাওয়ার আগের দিন বিকালে ও হুট করেই আমাকে বললো তোকে খুব মিস করবো রে। পরের কয়েকটা দিন আর সপ্তাহ সত্যি ওকে খুব মিস করেছি। কিন্তু শিশুরা বোধহয় কোনকিছুই খুব বেশীদিন ধরে রাখেনা মনে। তাই আবার যারা খেলার সাথী আছে তাদের নিয়েই মেতে উঠলাম।

তপু ছুটিছাটায় বাড়ি এলে দেখা হতো, কথা হতো; কিন্তু সেই আগের মতো বন্ধুর মতো সম্পর্কের সুর যেন কেটে গিয়েছিল কোথায়। কয়েক বছরের মাঝে বাসা বদলে সরে যাই দুই পরিবারই। ছমাসে ন’মাসে হয়তো দেখা হতো। ততদিনে আমি স্কুল পেরিয়ে কলেজে, আর তপু এইচএসসি দেবে। ওর রেজাল্ট বরাবরই ভালো। আমার রেজাল্ট ওর মতো না হলেও আমার হিসেবে ভালোই ছিল। ওর ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল পাইলট হবার। খেলার সময় আকাশে প্লেন উড়ে যেতে দেখলেই ও সব ফেলে হাঁ করে ওদিকেই তাকিয়ে থাকতো। আর তাই এইচএসসি শেষ করে জিডি পাইলট কোর্সে আবেদন করে, চোখে স্বপ্ন ফ্লাইং অফিসার হওয়ার।

কোর্স শুরু হবার আগে কয়েক মাস ওর হাতে ছিল। আমার তখন ইন্টার পরীক্ষা সামনে। মা-বাবা বললো আমার পড়া একটু দেখে দিতে। পড়তে বসে কথা কাটাকাটিই হতো বেশী সময়, কিন্তু ওর পড়ানোর ধরনটা খুব ভালো ছিল। তাই শেষ বেলায় আমার সিলেবাসটুকু দুমাসে ও দারুন করে গুছিয়ে দেয়। আমার পরীক্ষা শেষ হয় আর ও চলে যায় ওর কোর্সে। আবারো যাওয়ার আগের দিন সেই একই কথা, ‘তোকে খুব মিস করবো রে’।সাথে একটা ডায়েরী দিয়ে যায়। বলে যায়, যেন ও যাওয়ার পরে পড়ি। ওকে আমার বন্ধুর চেয়ে বেশী কখনোই মনে হয়নি, ও কখনো ওরকম করে কিছু বলেওনি তাই হয়তোবা। কিন্তু এবারের যাওয়ার সময় ওর গলা কি একটু ধরে এসেছিল?

কৌতুহল চাপিয়ে রাখতে পারিনি। ডায়েরীটা খুলেই ফেলি। প্রতিটা পাতায় নানা ঢংয়ে আমার স্কেচ করা নানা বয়সের। বলা হয়নি ও অনেক ছোটবেলা থেকেই দারুন আঁকতো। কিন্তু আমাকে এতোটা খেয়াল কখন করতো তাই যে বুঝিনি। শুধু শেষ পাতায় কয়েকটা লাইন লেখা,

‘ তোকে কখন থেকে যে ভালোবাসি নিজেও জানিনা। কিন্তু তোকে ছেড়ে প্রতিবার কলেজে ফিরে যেতে বুকের মাঝে অন্যরকম কষ্ট হয়। ইচড়ে পাকা ভাবছিস? ভাবতে পারিস, আমার কিছু যায় আসেনা। সামনে তুই ইউনিতে যাবি, তোর পরিধি বাড়বে, বন্ধু বাড়বে, কেউ খুব কাছের প্রিয়জনও হয়তো বা হতে চাইবে। আমি তোকে কিছু বলিনি এই দোহাই দিয়ে ফিরিয়ে যেন দিতে না পারিস তাই এই ডায়েরীটা এবেলা তোর হাতে দিয়ে গেলাম। এরকম তোর স্কেচে ভরা আরো কয়টা ডায়েরী আমার আছে জানিস? না এখন বলবোনা। যেদিন তুই নিজে থেকে দেখতে চাইবি সেদিন দেখাবো।

আমার সাদামাটা দিন বর্ণিল হয়
তোর একটুখানি হাসিতে,
রঙ ছাড়া রাত স্বপ্নে হারায়
তোর অবাক কথার মায়াতে।

দিনগুলো সব রাঙিয়ে দিতে
থাকবি কি মোর পাশে?
এটুকুই চাই এক জীবনে
চেয়ে থাকি তোর আশে।’

আমাকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়ে তপু চলে গেলো তার কোর্সে। আমার জীবনের সতেরোটি বসন্তের মিলিত বাসন্তী হাওয়ায় আমি দুলতে লাগলাম তপুকে তার ভালোবাসার প্রত্যুত্তর দেওয়ার স্বপ্নে। মনে মনে কি তাহলে আমিও ওকে অন্যভাবে ভাবতাম? নয়তো একটা ডায়েরীর পাতায় কিছু ছবি আর কয়েক ছত্র লেখা আমাকে এতোটা দোলা কেন দিয়ে যাবে?

তার পরের কয়েকটি বছর ছিল স্বপ্নের মতো। আরো সুন্দর করে বললে মিষ্টি কোন স্বপ্নের চেয়েও মধুর। এইচএসসি শেষ করে আমি ভর্তি হই মেডিকেল কলেজে। আমি ডাক্তারী পড়া শুরুর পর থেকে তপু ওর একটা স্বপ্নের কথা বলতো আমায় যখনই দেখা হতো। ও আমাকে নিয়ে উড়ে যাবে বাংলাদেশের দূর্গম সব এলাকায় যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। ছোট ছোট স্বাস্হ্য ক্লিনিক থাকবে যেখানে মানুষ তাদের ন্যূন্যতম স্বাস্হ্যসেবা পাবে। আমি হাসতাম ওর কথা শুনে; কিন্তু ভালোও লাগতো এই ভেবে যে দেশের মানুষের জন্য এমন করে ভাবা কয়েকজন মানুষ থাকলে দেশ সামনে এগিয়েই যাবে। আমার চোখেও স্বপ্ন দেখাতো ওমন করেই।

ওর পাসিং আউটের পরপরই আমাদের বিয়ে হয়। দুই বাসার কারোই আপত্তি ছিল না আমার ছাড়া;পড়া শেষ না করে বিয়ে করতে চাচ্ছিলাম না। অথচ আমার জীবনে যে বিয়ের ঐ দুটি বছর এক জনমের স্মৃতির মতো বুকে চেপে কাটবে তা জানলে বুঝি আরো আগেই বিয়েতে রাজী হয়ে যেতাম। সেদিন ছিল আমাদের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী। পুরো পরিবারের সবাই মিলে রাতে খেতে যাওয়ার কথা একসাথে। ওর আসতে এতো দেরী হচ্ছিলো। বার বার ফোন দিয়েও পাচ্ছিলাম না। অথচ অফিসের কাজে চিটাগাং থেকে ঢাকায় চলে আসার কথা আরো অনেকক্ষন আগে। অবশেষে ওর অফিস থেকে ফোন আসে। আমার জীবনের সমস্ত আলো এক নিমিষে অন্ধকার হয়ে যায়, চিটাগাং থেকে ফেরার পথে প্লেন ক্র্যাশে আমার তপুই শুধু মারা গেছে।

আমার জীবনের তারপরের আরো কয়েকটা বছর কিভাবে গেছে আমি জানিনা। আমার পরিবার, তপুর পরিবার সবাই বলেছে আমি যেন অন্য কাউকে বিয়ে করি। অন্তহীন ভালোবাসার মায়ায় আমাকে স্বপ্ন দেখানো মানুষটাকে এক জীবনে ভুলে যাওয়া কি এতোই সহজ? ওর স্বপ্নকে যে নিজের স্বপ্ন করে নিয়েছি এক জীবনের তরে। সবার কথার থেকে মুক্তি পেতেই দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাই বিদেশে।

………..

রয়েল অস্ট্রেলিয়ান ফ্লাইং ডক্টরস এসোসিয়েশনের সাথে আজ প্রথম শিফট করে আসলাম। তপুর এক জীবনে দেখা স্বপ্নের বিদেশী রূপ। তিন বছরের কাজের চুক্তি হয়েছে ওদের সাথে। যথাযথ দক্ষতা আর জ্ঞান নিয়ে আমি অবশ্যই ফিরে আসবো আমার ভালোবাসার মানুষটির স্বপ্নপূরণে।

-ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

Leave a Reply

Your email address will not be published.