ললিতা (৭ম পর্ব)

সাত সকালে জুবায়েরের ফোন আসে ললিতার ফোনে, দ্রুত রান্না করতে যাওয়ার নির্দেশ করেছে। হারিছের জন্য সিদ্ধভাত রান্না করে ললিতা ছুটে জুবায়েরের বাসায়। জুবায়ের আজ অনেক ভালমন্দ রান্নার জন্য নির্দেশ দিচ্ছে ললিতাকে,গরুর মাংসের কালোভুনা,খাশির রেজালা, চিংড়ি মাছ পুদিনা পাতা দিয়ে ভুনা, আলুর চপ আরও কত কি! সত্যি বলতে ললিতা এত উচ্চমানের খাবার খুব কমই নিজের হাতে রান্না করেছে, তাই সে কিছুটা ভয়ও পেয়ে যায়,সে ভাবে “আমি কি পারবো এতকিছু রাঁধতে!”
জুবায়ের রান্নার তদারকি করতে বারবার কিচেনে আসছে।জুবায়েরকে দেখেই ললিতার গলা শুকিয়ে আসে, কিন্তু ললিতার মনে কতগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আজ সে প্রশ্নের সম্মুখীন জুবায়েরকে হতেই হবে। কিন্তু জুবায়েরের উপস্থিতিতে ললিতা তার প্রশ্নের খেই হারিয়ে ফেলছে।
কিন্তু না তাকে আজ শক্ত হতেই হবে।
যতবার ললিতা জুবায়েরকে প্রশ্ন করবে বলে অগ্রসর হয় ততবারই জুবায়েরের কামুক দৃষ্টি তাকে পিছু টেনে আনে।
জুবায়ের একটা চেয়ার টেনে রান্নাঘরের দরজায় বসেছে,”তুমি তো এসব কখনো রান্না কর নি তাই না ললিতা?” ললিতা একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে, “ভাইজান আজ কি বিশেষ কেউ আইবো?”
জুবায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ললিতার দিকে তাকিয়ে কপালে তিনটা ভাঁজ এনে বলে, “কেন আমি কি খেতে চিনিনা? নাকি কখনো এসব খাই না?” ”
খাইতো পারেনই তবে অতকিছু একদিনে অাগে কোনদিন রানতে কইছেন না তো! আর এসব তো আফাই নিজ হাতে রানতো যেদিন বাসায় থাকতো। ” ললিতা আবারও শুধায়,”কেউ আইবো?”
“ললিতা,সব ব্যাপারে নাক গলানোর চেষ্টা করো না। তোমাকে যা করতে বলছি সেটা কর।”
ললিতা স্পষ্ট বুঝে জুবায়ের কিছু লুকাচ্ছে তার থেকে তবে সেটা কি? “ভাইজান, আজ বন্ধের দিন আফা আইলো না ক্যান? ” জুবায়ের তার ধীরে ধীরে জেগে ওঠা রাগত স্বরটা সংযত করে প্রতিউত্তর করে, “তোমার আপা আসলো না কেন সেটা তুমি গিয়ে জিজ্ঞেস করো, এখন রান্না করছো চুপ করে রান্না করো,নাহলে রান্নায় ভুল করবে,দুইবার লবণ দিবে,দুইবার হলুদ দিবে আর সব খাবার নষ্ট করবে।”
জুবায়েরের সাহায্যে ললিতা সবগুলো রান্নাই মোটামুটি সম্পন্ন করেছে ফেলেছে । জুবায়ের তরকারিগুলো রান্নার রেসিপি বলে দিয়ে ললিতাকে সাহায্য করেছে। বিশেষ কেউ যে আসছে সেটা নিশ্চিত। ললিতার এর থেকে বেশি কিছু জানতে চাওয়ার সাহস হচ্ছেনা।
কাজের ফাঁকে ললিতা খেয়াল করেছে জুবায়ের তার শরীরটা কতটা কুনজরে গিলে খাচ্ছে! ললিতার তাই রান্নার ফাঁকে বারবার তার শরীরটাকে শাড়ির অাঁচলে ঢাকার চেষ্টা করছে যদিও জুবায়ের সেটাও লক্ষ্য করছে। তবে জুবায়েরের আজ ললিতার শরীরে হাত দেয়ার মত ইচ্ছাশক্তি যে নাই সে বিষয়ে ললিতা নিশ্চিত কারন আজ সে কিছুটা অন্য মুডে আছে।
কিচেন ছেড়ে ভেতরের রুমে প্রবেশ করেই জুবায়ের ললিতাকে ডাকে, অগত্যা ললিতাও যেতে বাধ্য। স্টেপলার দিয়ে আটকানো একটা মাঝারি ধরণের প্যাকেট জুবায়ের ললিতার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
— কি এইডা ভাইজান?
— খুলে দেখো।
— খুলতে হবেনা আমি বুঝেছি কি আছে এতে।
— কি আছে বলতো?
— বলতে হবেনা ভাইজান, যাই আছে আমি এটা নিব না।
— কেন নিবেনা? পরনের শাড়িটার দিকে চেয়ে দেখেছো ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেছে।
— সেটা তো আপনার দেখার বিষয় না, আমার স্বামী আছে দেখার জইন্য।
— আরে ঐ মুরোদহীন হারিছ তোমারে কি হালে রাখছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি!
ললিতার ভেতরে যেন সাহসটা দ্বিগুন বেড়ে যায় হঠাৎ করেই, “আপনি আমারে কি ভাবেন ভাইজান? ”
— এত ভাইজান ভাইজান করো কেন? ভাই হওয়ার মত কি দুনিয়াতে কেউ নাই?
— আপনার কি হতে ইচ্ছা বলেন তো!
—তুমি হারিছ রে ডিভোর্স দেও, আমি তোমারে বিয়ে করতে চাই।
ললিতার মাথায় যেন আকাশটা ভেঙে পড়ছে, কি বলে এই বড়লোকের বেটা?
— “আফনে কিন্তু সীমা ছাড়াইয়া যাইতাছেন কইলাম!”
— কেন কি করবে সীমা ক্রস করলে?
— শারমিন আফাকে সব বলে দিব।
— তুমি তাহলে জানোই যে এ বাসায় তখন তোমার আর কোন কাজ থাকবেনা।পাশের ফ্ল্যাটের ওরাও চলে গেছে,তোমার অকর্মা বর ৫ হাজার টাকার রিক্সা বেঁচে দিয়ে৬০ হাজার টাকার অটোরিক্সা কেনার স্বপ্ন দেখছে ঘরে বসে বসে, আর তুমি? মানুষের বাসায় কাজ না করলে খাবে কি? বুড়ো আঙুল?
— হ্যাঁ বুড়ো আঙুলই, আফনের মত মানুষের ছত্রছায়ায়ই থাকা উচিত না।
আমি আজ আপনার থেকে ঠিক এইডাই জানতে চাইতাম যে আফনে আমারে কেমন মনে করেন? প্রথম প্রথম ভাবতাম আপনে আমারে ছোটবোনের মত স্নেহ করেন কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই দেখছি আপনার আসল চেহারা!
চুপচাপ ললিতা বেরিয়ে আসে জুবায়েরের বাসা থেকে।কতটুকু নোংরা মানসিকতার হতে পারে এমন মানুষগুলো সেটা ললিতা বারবার ভাবছে। তার দুটি পা যেন আর চলছেনা কিছুতেই,যে জুবায়েরকে সে বড়ভাই এর মত ভাবতো সেই জুবায়ের কিনা তারে বিয়ের কথা বলছে! তাকে নোংরা দৃষ্টিতে দেখছে! নোংরা প্রস্তাব দিচ্ছে!
ললিতা এ বাসায় আর কাজ করবে না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞাও করে নিয়েছে। জুবায়ের যেকোন পদক্ষেপ নিতে পারে ললিতার উপরে তাই আগে থেকেই সতর্ক হওয়া ভাল। টাকাই জীবনে সব না,প্রয়োজনে না খেয়ে থাকবে কিন্তু সম্মান হারানো যাবেনা।
কিন্তু যদি ললিতা কাজটা ছেড়েও দেয় তাতে কি জুবায়েরের নোংরা স্বভাবটা পাল্টানো যাবে? এ জন্য ললিতার কি করা উচিত? সে কি শারমিনকে সব বলে দিবে? শারমিনকে বলে দেয়ার পর তাদের সম্পর্কের পরিণতি কেমন হতে পারে ভেবে ললিতার ভয়ে শরীরে কাঁটা দেয়। ললিতা এটাও ভাবছে, শারমিন যদি তার কথাতে বিশ্বাস না করে!
নাহ্ ললিতা আর ভাবতে পারছে না তবে তাকে কিছু একটা করতেই হবে,তারও আগে তাকে শারমিনকে জানাতে হবে জুবায়েরের বিপথগামিতার গল্প। ললিতা আজ কদিন ধরেই দেখছে জুবায়ের কার সাথে সারাক্ষণ ফিসফিসিয়ে ফোনে কথা বলে আবার সেদিন বাথরুমে কিছু আপত্তিকর জিনিসও পেয়েছে তাতে ললিতার আর বুঝতে বাকি থাকেনা যে জুবায়ের শারমিনের অনুপস্থিতিতে ঠিক কি কি করছে!

ললিতাকে নতুন কাজের সন্ধান করতে হবে, বারান্দার চৌকিটায় বসে আনমনে ভাবছে সে কি করা যায়? কিভাবে সে নতুন কাজের সন্ধান করতে পারবে? নতুন কাজের ভাবনা মাথায় ঘুরতে ঘুরতে ললিতার চিন্তা অাটকে যায় শারমিনের বাসার কাজ ছাড়ার ব্যাপারে! সে ললিতাকে কি বলবে? হারিছ কাজ করাটা পছন্দ করেনা এটা বলবে? নাকি জুবায়েরের মূল চরিত্রটা উন্মোচন করে দিবে শারমিনের কাছে? জুবায়েরের কীর্তিকলাপ তো ললিতা প্রকাশ্যে আনবেই কিন্তু কিভাবে? শারমিন আপা যাতে ললিতাকে ভুল না বুঝে সে চেষ্টাটা করবে সে, তবে আপাটা যে কষ্ট পাবে তা সে কিভাবে লাঘব করবে? ভাবছে তার আগ পর্যন্ত সে নিজেকে জুবায়েরের থেকে নিরাপদে রাখতে পারবে তো?
ললিতা ভেবেই চলেছে তো ভেবেই চলেছে, এদিকে হারিছ তাকে সেই কখন থেকে ডাকছে তার কোন খেয়ালই নেই।
— কি রে ললিতা, এত কি ভাবতে বইছস?
চিন্তার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে আসে ললিতা,
— কিছু ভাবি না তো!
— কি হইছে তোর? বেশ কয়দিন তোরে দেখতাছি মুখটা শুকনা,মনটা বেজার কইরা বইয়া থাকস! কি হইছে তোর।
“কিছু হয় নাই” বলে ললিতা বসার চৌকিটা টেনে হারিছকে বসতে দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে যায়।
“তুমি এ অবেলায় বাড়ি আইলা যে! ” হারিছরে শুধায় ললিতা, হারিছ এদিকে ভাড়া নিয়ে আসছিল তাই পেটে চারটে ভাত দেয়ার জন্য বাড়িতে ফেরে। ললিতাও তার স্বামীর অভুক্ততার কথা ভেবেই হাড়িতে চাল নিয়ে রান্নাঘরে উনুন জ্বালাতে যায়।
—রান্না করবি নাকি রে?
— হ
— শারমিন আফার বাসাত তে ভাত আনস নাই?
— না,
— শারমিন আফার বাসায় অহন কেডা আছে রে? দেখলাম মেহমান আইছে!
ললিতার কান খাড়া হয়ে যায়, কে আইতে পারে? ঐদিন লুৎফা জুবায়েরের সাথে আলাপ করা যে মহিলাটারে দূর দেখাইছিল সেই মাইয়াডা নয়তো? কেমন জানি ভীষন গা ঘেঁসে ঘেঁসে দুজনে এই রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। মেয়েটা ললিতার পরিচিত নয়।
— শোন, তুমি কেমনে জানলা বাসায় মেহমান আইছে? কেমন মানুষ আইছে?
— আমার রিক্সা দিয়াই আইছে তে! কম বয়সী সুন্দরী এক মাইয়া।
আজ থেকে হারিছ ভাড়ায় অটোরিক্সা চালাচ্ছে, ভালই ইনকাম হয়েছে সকাল থেকে তাই ফুরফুরে মন নিয়ে দুপুর বেলা ভাত খাইতে বাড়ি ঢুকেছে।
অাগ্রহ নিয়ে ললিতা আবার জিজ্ঞেস করে, “মাইয়াডা কেমন বয়সের হইবো গো?”
—কত আর! ২৮/ ২৯ হইবো আর কি! তোর তাতে কাম কি!
— না ভাবতাছি ভাইসাবের কোন বইন টইন কিনা!
ললিতা নিজের রান্নাতে মন দেয়ার ভান করে কিন্তু সত্যিকার মনটা ছুটে চলে জুবায়েরের ফ্ল্যাটে। শারমিন আপা নাই আর এ সুযোগে এই অভদ্র লোকটা নিজের রুচিমত সময় কাটাচ্ছে। কে এই মহিলা তা ললিতাকে জানতেই হবে।
পড়ন্ত বিকালে বস্তির দুএকজন মহিলা আজকাল গলির মাথায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয়, গল্প করে। কখনো সাংসারিক আলোচনা,কখনো ও পাড়ার মেয়েছেলেদের নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে আবার কখনোও বা কার ঘরে কি চলছে! ললিতার এসব আলাপচারিতা বা খোশগল্প কোনদিনই ভাল লাগতো না। হাতে কাজ নেই ঘরের ভেতরে ভ্যাপসা গরম বিধায় ললিতা একটু গলির মুখে এসে দাঁড়ায়, লালুর মা, রহিমা চাচী, লুৎফাভাবী সবাই এখানে খোশ গল্পে মেতে আছে। ললিতাও তাদের কাছে ভীড়ে।
ছোট ছোট খোশ গল্পে মেতে উঠে ললিতাও কিন্তু দৃষ্টি তার জুবায়েরের ফ্ল্যাটের দিকে। গলির মোড় থেকে বাসার গেইটটা স্পষ্ট দেখা যায়। দীর্ঘসময় নজর রাখার পর হঠাৎ করেই ললিতার দৃষ্টিবন্ধী হয় এক অস্পরী মার্কা সুন্দরীর দিকে যাকে সে সেদিন জুবায়েরের সাথে কথা বলে হেসে ঢলে পড়ে যেতে দেখেছিল

চলবে…

-অরুন্ধতী অরু

Leave a Reply

Your email address will not be published.