ললিতা (৫ ম পর্ব)

ঘটনার তিন দিন অতিক্রান্ত হল আজ, হারিছও এখন বেশ সুস্থ। এ কয়দিনে ললিতা একবারও কাজে যায়নি। আজ কাজে বেরোবে বলে সাত সকালে ঘরের সব কাজ সেরে হারিছকে খাবার দিয়েছে সে। হারিছ বুঝতে পারছে ললিতা কাজে যাবে বলেই খুব তাড়াহুড়ো করছে।
— কই যাইবি ললিতা?
— কামে যামু, খাইয়া লউ তাড়াতাড়ি।
— আর ১০/১২ দিন কাজ কইরা তুই সব কাম করন ছাইড়া দিবি।
হারিছের দিকে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকায় ললিতা,
— খালি কাম ছাইড়া দিলেই হইতো না, সংসারটা চালাইতে হইবো।
— সংসার চালানি আমার কাম,তোর না।
— একলা সংসার চালাইয়া,ডাক্তার দেখাইয়া, তোমার পক্ষে সম্ভব? বিপদ আপদ আইতে কতক্ষণ। হেইদিন যে বিপদ অইছিন,শারমিন আফা না থাকলে তোমারে কেমনে ছাড়াইতাম! যদি টেহা পয়সা চাইতো কি করতাম?
— অত কিছু তোর ভাবতে অইবো না। তুই কাম করস লোকে আমারে মন্দ কয়।
— কে তোমারে মন্দ কইছে? এ বস্তির কত মহিলারা মাইনষের বাসায় কাম করে তাদের বেলায় দোষ নাই?
— আমারে একজনে কথা হুনাইছে,আমি তোর কামাই খাই। তরে খাডাই।
— কে কি কইতাছে এসবে কান দিবানা। কোন কাম ছোডু না, সৎপথে আয় করলে সব কামই সম্মানের। আমি কি চুরি ডাকাতি করতাছি? নাকি খারাপ কাম করতাছি?
— আমি অতকিছু জানিনা, তুই কাম ছাড়বি ব্যাস! আমি যেমনে পারি তেমনে সংসার চালামু।
— এ রিক্সায় কয় টেহা কামাই হয় তোমার?
— আমি আজই রিক্সা রহমান ভাইয়ের কাছে বেইচা দিয়াম
–রিক্সা বেচলে চলবো কেমনে? অই রিক্সা বেচে যে টেহা অইবো তাতে তুমি ভালা রিক্সা কিনতে পারবা?
— মাস্টার আপা আমারে টেহা ধার দিব কইছে।
— আচ্ছা সময় আসুক।
ললিতা আর হারিছের কথা চাপাচাপি শেষে গলা খাকড়াইয়া মিলন এসে দরজায় দাঁড়ায়, হারিছের ভালমন্দ খোঁজ নিতে আসছে সে,
— কি হারিছ ভাই ভালা নি!
— এই তো ভাই আছি কোন রকম। আসো বস
হারিছের খাওয়া দাওয়া ততক্ষণে শেষ, ললিতা এঁটো কাঁটা প্লেটে তুলছে। একটা পিঁড়ি টেনে বসতে বসতে মিলন হারিছরে জিজ্ঞেস করে, —” তা ভাই,হেইদিনের ঘটনাটা কেমনে কি অইলো কউ তো শুনি!
হারিছ চোখে ইশারা করে ললিতাকে দেখায় মিলনকে। মূলত হারিছ ললিতার থেকে সেদিনের তার পুলিশের হাতে পড়ার পেছনে মূল কাহিনী কি সেটা লুকাচ্ছে। হারিছকে ললিতা অনেকবার জিজ্ঞেস করছে কিন্তু সে বিষয়টা এড়িয়ে গেছে বারবার।
আজও মিলন জিজ্ঞেস করলে সে ললিতাকে দেখিয়ে চোখে ঠারাঠারি করছে। ললিতা বুঝতে পারে এ ঘটনার সত্যতা জানতে তাকে অবশ্যই চালাকির পথ অবলম্বন করতে হবে, হারিছ কিছুতেই তার সামনে এইসব কথা বলবে না। যেই ভাবা সেই কাজ!
সাত সকালে এদিকে আসা মিলন ভাইকে ললিতা খাওয়ার যত্ন করে,
— মিলন ভাই অালু ভর্তা দিয়া অল্প কয়টা ভাত খাইয়া লইন।
— না ভাবী আসি খাইয়াই বের হইছি। লুৎফা অাফনের মতই, সকালে না খাওয়াইয়া ছাড়েনা।
— লুৎফা তো ভালমন্দ রাইন্ধা খাওয়াইবো, আমি তো অালুভর্তা দিয়া অল্প খাইতে কইতাছি।
— না ভাবী, অন্য আরেকদিন খামু নে।
— আইচ্ছা আপনেরা তাইলে আলাপ করেন, আমি কামে যাই।
ললিতা মনে মনে ভাবে সে বের হয়ে গেলে অবশ্যই হারিছ মিলনের সাথে সেদিনের ঘটনার পেছনের আসল কাহিনীটা বলবে তাই যতদ্রুত পারে সে ঘর থেকে বের হতে চাইছে। সামনের দরজা দিয়ে বের হয়ে ললিতা বাড়ির পিছন দিয়ে ঘুরে এসে রান্নাঘরে ঢুকে ঘাপটি মেরে বসে থেকে হারিছ আর মিলনের কথাতে আড়িপাতে।
—“হারিছ ভাই,ভাবীর সামনে এমন চোখ টিপাটিপি করতেছিলা কেন? ঘটনা কি খুইলা কও তো
— ললিতার সামনে এই কথা কওন যাইতোনা, পরে হে আমার উপরে ভরসা করতে পারতো না আর।
—কি হইছিন অইদিন? তুমি তো রহমান ভাইয়ের গ্যারেজ থাইকাবাড়ির দিকে আইতাছিলা তাইলে নাজিরগঞ্জ রোডে গিয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়লা কেমনে?
— আরে, ঐ যে নদীর পাড়ে বড় ঝোপটা আছেনা? ঐখানে রাস্তার পাড়ে দুই পোলা দাঁড়াইয়া রইছে। আমি কাছে আইতেই কইতাছে তারারে নাজিরপুর লইয়া যাইতাম। তারা এইনে বেড়াইতে আইছিন,যাইতে রাইত হইয়া গেছে।
আমি যাইতামনা অমত করতেই আমারে ২টা ৫০০ টেহার নোট দিয়া কয় নাজিরপুর পৌঁছাইয়া দিলে আরও দিব।
— আমি টেহা দেখে সাতপাঁচ কিছু ভাবছি না। রাজী হইয়া গেছি।
— টেহার লাইগা তুমি না কইয়া অতরাইতে যাইবা গা?
— মিলনভাই,তোমার ভাবী মাইনষের বাসাত কাম কইরা আমারে খাওয়ায়, আমার এমনিতেই খারাপ লাগে,তার উপরে যদি কেউ এইডা নিয়া কথা শোনায় আমারে তাইলে আমার কেমুনডা লাগে কউ তো!
— কে তোমারে কথা হুনায়? এ তল্লাটের সব মহিলারাই তো কাজ করে! তা মানুষটা কেডা?
— আছে একজন! ঘটনার দিনও আমারে কত কথা হুনাইছে,বউরে দিয়া কাম করাই অথচ বউ এর খেয়াল রাখিনা! কি করবাম কউ সারাদিনে ৫০ টেহাও রোজগার হয় না, আমি সবকিছু একলা কেমনে সামাল দিয়াম! তাই রাইতের বেলা ১হাজার টেহার ভাড়ার লোভটা আমি ছাড়তে পারছি না!
— সবই বুঝছি। তয় পুলিশ নাকি তোমার কাছে অনেক গাঞ্জা পাইছে ওইডা কেমনে আইলো?
— অর্ধেক পথ যাইতেই শালারপুতেরা আমার কাছে একটা প্যাকেট দিয়া কয় এইডা গামছা দিয়া প্যাঁচাইয়া কোমরে রাইখ্যা দিতাম। আমি অমত করলে একটা ছুরি দেখাইয়া আমারে মারনের ডর দেখাইছে। আমিও ডরাইয়া প্যাকেট টা কোমরে বাইন্ধ্যা লইছি।
ছুরির কথা শুনতেই ললিতার ভেতরটা শিউরে উঠে! ভাগ্যিস ওই ছেলেডি হারিছের কোন ক্ষতি করে নাই।
ললিতা হারিছের থেকে যতটুকু জানার ততটুকু জেনে গেছে তাই এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকে কাজ নেই,সে চুপ করে বেরিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে।
শারমিনের বাসায় যাওয়ার পথে ললিতা আপনমনে ভাবে, হারিছ ললিতাকে কাজ থেকে ছাড়াতে কিছু বাড়তি আয়ের লোভে নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। কিন্তু ললিতার মানুষের বাসায় কাজ করা নিয়ে কে সমালোচনা করে? হারিছকে কে কথা শোনায়
এ বস্তির সকল মেয়ে পুরুষরাই খেটে খায় একমাত্র লুৎফা বাদে, মহিলারা কেউ ইট পাথর ভাঙে, কেউ বাসায় কাজ করে,কেউ অফিস ঝাঁট দেয় কেউবা আবার বাসায় বাসায় পানি দেয়। তাহলে ললিতার কাজ করা নিয়ে সমালোচনাটা করবে কে? কোন খেটে খাওয়া মানুষ তার মতই খেটে খাওয়া মানুষের কর্ম নিয়ে তিরস্কার করেনা। তবে যেটা করতে পারে সেটা হল সমালোচনা। আজ ললিতা কোন খারাপ কাজ করতো তাতে না হয় কেউ সমালোচনা করতো,ললিতার মত কাজ তো সবাই করছে!
ভাবতে ভাবতে ললিতা চলে এসেছে শারমিনের বাসার দোরগোড়ায়। বাসা যথারীতি তালাবদ্ধ। ললিতা তার কাছে থাকা চাবি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে রান্নাঘরটাতে একনজর চোখ বুলায়। সবকিছু এলোমেলো আর নোংরা, দেখলে মনে হয় গত কয়েকদিনে কোন নারী হাতের স্পর্শ পায়নি এ ঘরটা! ভেতর থেকে পচা বাসি খাবারের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে,
ললিতা ব্যতিব্যস্ত হয়ে সর্বাগ্রে রান্নাঘরটা পরিষ্কার করে আর মনে মনে ভাবে শারমিন আপা একা হাতে আর কতটুকু করতে পারে! ব্যস্ত মানুষ গত কয়েকদিন তার অবর্তমানে যতটুকু একা হাতে করেছে ততটুকুই যথেষ্ট।
কি রান্না হবে জানতে ললিতা শারমিনকে ফোন দেয় কিন্তু বারবার ফোনে কল হয়ে কেটে যাচ্ছে কেউ রিসিভ করছেনা। বাধ্য হয়ে ললিতা তার সবচেয়ে অপ্রিয় ব্যক্তি জুবায়েরকে ফোন করে,”ভাইসাব,অাফা ফোন ধরতাছেনা। কি রান্না হইবো বুঝতাছি না। ”
— যা পারো কিছু একটা করে রেখে যাও।
— আইচ্ছা।
ফোনটা কেটে ললিতা ফ্রিজ থেকে মাছ সবজি নামিয়ে নিজের পছন্দমত রান্না করছে।
শারমিনের প্রতি ললিতার কৃতজ্ঞতাবোধ,সম্মান,শ্রদ্ধা আর ভালবাসা আরও অনেক গুণ বেড়ে গেছে। মানুষের মুখে সে শুনতো বড়লোকরা হিংসুটে হয়, গরীবদের মানুষ বলেই মনে করেনা,কথাটা মিথ্যেও না। বস্তির ডানপাশে এক বাসা আছে, খুব ধনী তারা কিন্তু মানুষ দেখতে পারেনা। পুলাপান যদি খেলার ছলেও তাদের বাড়ির আঙিনায় চলে যায় তাহলে ওই বাসার সবাই কেমন জানি ধুরছাই করে। তাদের ভাবে মনে হয় যারা বস্তিতে থাকে তারা মানুষ না।
বেশি দূরে যেতে হয়না শারমিনের বর জুবায়ের সেও তো গরীবদের একদম পছন্দ করেনা! ললিতাও অনুধাবন করে নিয়েছে জুবায়েরের ভিতরের দম্ভ কে! কিন্তু জুবায়ের আবার ললিতার প্রতি ভালবাসা দেখায়, এটাই ললিতার কাছে ভিন্ন অর্থ দাঁ করায়! অথচ শারমিন আপা! এক মহান প্রাণ!
ললিতা কাজ করছে আর এতকিছু ভাবছে, ভাবতে ভাবতে অাচমকা তার মাথায় আসে হারিছের সেদিন এ বাসায় আসাটা! হ্যাঁ সেদিন মানে ঘটনার দিন তো হারিছ জুবায়েরকে রিক্সায় করে পৌঁছে দিয়েছিল এখানে। তার মানে জুবায়ের ভাইসাব কি তারে কিছু কইছিল? ললিতার কাজ করাটা তো জুবায়েরও দেখতে পারেনা, সেজন্য সে হারিছকে নানান কথাও শোনায়। তারমানে কি জুবায়েরই সেই ব্যক্তি! ভাবতে ভাবতে ললিতার শরীরে ভয়ে কাঁটা দেয়। যদি জুবায়ের হারিছকে কিছু বলে থাকে তাহলে হারিছ এ ব্যাপারে কি ভাবছে! জুবায়েরের এ আলগা পিরিত দেখানোটা হারিছ কিভাবে নিচ্ছে! হারিছ তাকে কখনো ভুল বুঝবে না তো!!
ললিতার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে কলিংবেলটা বেজে উঠলো, এ অবেলায় আবার কে আসতে পারে! শাড়ির আঁচলে হাত মোছতে মোছতে ললিতা দরজাটা একটানে খুলেই দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে জুবায়ের। কামুকতাপূর্ণ এক ঝিলিক খেলে যাচ্ছে তার মুখের হাসিতে। ললিতা ভয় পেয়ে চুপসে যেতে থাকে। কােন এক কারনে এ লোকটার প্রতি আর কোন বিশ্বাস কাজ করেনা ইদানিং। হয়ত জুবায়েরের ঐ কামুক দৃষ্টি নয়ত পর নারীর প্রতি আলগা দরদ তার কারণ!

চলবে…..

-অরুন্ধতী অরু

Leave a Reply

Your email address will not be published.