রাফারা চিরকাল সুখেই থাকে(১ম পর্ব)

রাফার আজ ভীষণ মন খারাপ। গত চার বছরের একটানা ভালোবাসার মানুষ রিফাতের সাথে অস্থির রিলেশন শেষ করে বিমর্ষ হয়ে বসে আছে নিজের বদ্ধ ঘরে।শেষ দুই বছর কেটেছে সীমাহীন কষ্টে।অনেকটা পুতুলের মতো। রিফাতের কথায় উঠতো,বসতো। কি যেনো হয়ে গিয়েছিলো,সে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। বন্ধু বান্ধবীরা বুঝাতো রিফাত একজন ভুল মানুষ যে তার প্রেমে পড়েছে। রাফা ভাবতো সবাই জেলাস করছে। সে পাগলের মতোই ভালোবাসতো রিফাতকে। আর রিফাত বিনিময়ে তার আবেগ ইমোশন নিয়ে খেলা করলো।

মধ্যরাত অবধি তার ঘুম নেই। কত শত কথা মনে হচ্ছে,সেই লাজুক রাঙ্গা প্রথম ক্ষন,আবেগে ভালোবাসায় এতোটা সময় কেটে গেছে যে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। এই সব ভাবনার মাঝে একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে রিফাত।রাফার এদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। বিশ্বাসহীনতা নিয়ে তার আর বাচঁতে ইচ্ছে ও করেনা। ফোন ধরে না সে ,ফোন সাইলেন্ট করে বালিশের নীচে রেখে দেয় রাফা। ঘুমাতে চেষ্টা করে। কতো রাত ভালো করে ঘুম হয়নি তার।আজ বড্ড ঘুম দরকার। জন্মের মতো ঘুম দরকার।এগিয়ে যায় সামনের টেবিলের দিকে। টেবিলের একপাশে লুকিয়ে মায়ের রুম থেকে চুরি করে নিয়ে আসা ঘুমের বেশ কটা ট্যাবলেট এর দিকে তাকায় রাফা।আস্তে করে চেয়ারে বসে। একটু চিরকুট লেখার জন্য ডাইরির পাতা ছিড়ে লিখতে শুরু করে…

প্রিয় রিফাত,
এই চিঠি যখন তুমি পাবে তখন আমার এই নশ্বর দেহ হয়তো এই পৃথিবীতে থাকবে না। চলেই যাচ্ছি সব ছেড়ে,তোমার সীমানা ছেড়ে অনেক দূরে।তীব্র ঘৃনা হচ্ছে আজ। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকু নষ্ট হয়ে গেছে। এত দিনের ভালোবাসার মূল্য এভাবে পেলে কারো পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব না প্রিয়। এই চিঠি যখন তোমার হাতে পৌঁছাবে,তখন আমি অনন্ত ঘুমের সাত সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি।
আমি সত্যি চলে যাচ্ছি রিফাত।এই শহর ছেড়ে,এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে,তোমার সীমানা ছেড়ে।তুমি স্বাধীন,মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে-বেড়াবে শহর, বন্দর, গ্রামে। ব্যস্ত হয়ে যাবে তোমার স্বপ্ন পূরনে। অসংখ্য মেয়ের সাথে চ্যাট করবে,নতুন কাউকে স্বপ্ন দেখাবে আবার।
আমি তোমায় দিয়ে যাচ্ছি সুন্দর কিছু বিকেল,ঘুম জড়ানো প্রিয় ভোর আর বিনিময়ে নিয়ে যাচ্ছি তোমার মুখোশ পরা ভালোবাসা,বিশ্বাসঘাতকতা।

সত্যি বলছি চলে যাচ্ছি। মায়ের ড্রয়ার থেকে লুকিয়ে বেশ ক’টা ঘুমের ট্যাবলেট সামনে নিয়ে তোমাকে লিখছি। লেখা শেষ করে এগুলো খেয়ে বিদায় নেবো প্রিয়।
থাকার ইচ্ছে নেই রে। সব ইচ্ছে,স্বপ্ন গলা টিপে তুমি হত্যা করেছ নিজ হাতে। আমি জানি আমার এই চলে যাওয়ায় তোমার কিছু যায় আসে না।তুমি তো নিষ্ঠুর। আমি যখন বেদনায় মুষড়ে পড়ে তোমাকে লিখছি ,হয় তুমি অন্য নারীর বুকের খাঁজে প্রেম খুঁজো আর না হয় চ্যাটবক্সের ভেতর অন্য মেয়ের সাথে প্রেমের তুফান তুলো। অন্য কাউকে আমার মতো জান প্রান লাভ বলে পাগল বানিয়ে রাখো। জানি সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না।

আজ আব্বুকে খুব মনে পড়ছে। তার জন্য বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি বুকটা এতোটা শূন্য করেছো যে সব ইচ্ছে মরে গেছে।বিশ্বাসহীনতা নিয়ে বেঁচে থাকা অনেক কষ্টের।তুমি মাঝে মাঝে চাইতে আমি চিঠি লিখি,চ্যাট এ বিরক্ত লাগতো তোমার। তোমার ইচ্ছেটা আজ পূরন করছি। বিদায়ের চিঠি লিখে যাচ্ছি।
আমি চলে গেলে তুমি এসো না,অতৃপ্ত আত্মা দেখে তুমি একটু কষ্ট পাও এটা চাইনা।
সত্যি বলছি অনেক ভালোবাসি তোমাকে কিন্তু এই মুখোশ তোমাকে চাইনা আমি।তুমি তোমার জগত নিয়ে থাকো।
এত এত মেয়ের মাঝেও তুমি কখনো একা হবে,কখনো জানালার ধারে বসে আমায় ভাববে,আমার প্রতিচ্ছবি মনের তুলিতে আকঁবে আর কাদঁবে।আরে দূর !আমি নেই তো কি হয়েছে,দূর আকাশের তারা’রা তো আছে, তাদের একজন হয়েই না হয় তোমার সাথে গল্প করব….।

ব্যস্ত এই শহর যখন নিরব নিস্তব্ধ হয়ে যাবে,যদি সে সময় খুব বিষন্ন হয়,তোমার প্রেমে মাতোয়ারা মেয়েগুলো যখন স্বার্থ শেষে কেটে পড়বে জানি তুমি আমাকে খুব মিস করবে,তখন যদি অঝোর ধারার কান্নারা বুকে জমাট বাঁধে,কষ্টেরা যদি দল বেঁধে তোমায় বুকের ভেতর আন্দোলন করে ,মনে রেখো ,আমি অশ্রু হয়ে তোমার কাছেই ফিরে আসব।
আচ্ছা একটা কবিতা বলেই বিদায় নিচ্ছি আজ…

বন্ধু বিদায়
আর হবে না দেখা
হবে না কোন কথা বলা তোমায়।

সব কথা বুকেই থাক
চাপা কষ্ট হয়ে
আমি নাহয় চলেই যাই
সব হারিয়ে।

আমি তোমাকে এত ভালোবেসেছিলাম যে,ঘৃনা করতে পারছি না।অথচ ঘৃনার তীব্রতা অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিলো। তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে ভুল মানুষ ছিলে সেটা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেলো। যখন বুঝলাম তখন চলে যেতে হচ্ছে।ভালো থেকো, অন্য কারো বুকে ঘুমিয়ে থাকো। বিদায় বন্ধু।
ইতি
রাফা (যার বুকের ভেতর পাহাড় সমান কষ্ট জমা)

টেবিলের এক পাশে চিঠি ভাঁজ করে রেখে অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট একসাথে খায় রাফা। বিছানায় আসে। মাথায় যেনো পাহাড় বেঁধে রেখেছে কেউ। এতোটা ভারী লাগছে। শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই কার যেনো মুখ ভেসে উঠে।সেই বিশ্বাসঘাতকের মুখটা সে ভাবতে চায় না।তবু বার বার এসে যায়।বুকের ভেতর একটা অসহ্য কষ্ট হয়,কাউকে বলা হয়না। শুধু চুপচাপ নিঃশ্বাস নিতে নিতে কেমন যেনো করে উঠে মাথাটা।যন্ত্রনার তীব্রতা কেবলি বেড়ে চলছে।চিৎকার দিয়ে তার কাদঁতে ইচ্ছে করছে,কিন্তু পাশের ঘরে যদি আম্মু জেগে উঠে সেই চিন্তায় তার আর কাঁন্না আসে না।বুকের ভেতর শুধু কষ্টেরা তোলপাড় করে দিয়ে যায়।

ক্রমেই চোখ বুজে আসে রাফার। শেষবার শুধু বাবার মুখটা স্মরণ করার চেষ্টা করে।চলে যাবার সময় বাবাকে দেখা হলোনা। এই মানুষটার জন্য তার বেঁচে থাকতে খুব ইচ্ছে হয় কিন্তু রিফাতের দেয়া কষ্টে বুকের ভেতর টা শূন্য হয়ে গেছে।এভাবে বেঁচে থাকার মানে নেই।আর কিছু ভাবতে পারে না। চোখ বন্ধ হয়ে আসে রাফার। একটা ঘুম দরকার।বড্ড শান্তির ঘুম।

(চলবে)
(২য় পর্বে এই গল্পটি শেষ হবে)

-নিলয় আহমেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.