যে শহরে বৃষ্টি হয় না (১ ম পর্ব)

মাস্টার্স পাস করে যখন কোথাও ভালো চাকরী পাচ্ছিলাম না তখন হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। বাবা অবসর নিয়েছেন। অবসরের যে কটা টাকা পেয়েছেন তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে। ছোট দুটি ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ, আমার পিঠাপিঠি ছোট আরেক বিবাহযোগ্য বোন রেখে নিশ্চিন্তে থাকা দায়।

আম্মার অসুস্থতা, আব্বার ফ্যাল ফ্যাল করে অবাক চাহনি দিন দিন নিজেকে দুর্বল করে দিচ্ছিলো। এদিকে ভালোবাসার মানুষ নিশিতার অপেক্ষা। একটা চাকরী হলে একটা সুন্দর সংসার হবে। আশায় আশায় পথ চেয়ে বসে আছে নিশিতা। তাই আমি সারাদিন হন্যে হয়ে চাকরী খুঁজি কিন্তু মামা চাচাদের খুঁটির জোর না থাকায় আমার চাকরী আর হয় না। অথচ আমার সাথের বন্ধুদের কত অনায়াসে চাকরী হয়ে গেলো।

আমার যে চার পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে চাকরী পাবার যোগ্যতা নেই। সজীব আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।একটা কর্পোরেট অফিসে সে একটা জব পেয়েছে। তাও রিতিমত ঘুষ দিয়ে। অফিসের বড় কর্তাদের খুশি করেই জব ভাগিয়ে নিতে হয়। এটা এখন নাকি অনেক জবের পূর্ব শর্ত। সজীব আমাকে বলেছিলো কিন্তু এত টাকা দেয়ার সামর্থ্য ছিলো না আমার। ফলাফল ইন্টারভিউ দিয়েও আমার চাকরী হয়নি।

হঠাৎ ভাগ্য মুখ তুলে থাকালো। আমার মেজো মামা , মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আরব আমিরাতের রাজকীয় শহর দুবাইতে থাকেন। আমার বিদেশ যাবার কখনো ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু আম্মার আকুলতা, সংসারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ভেবেছি চলে যাবো, সেই জন্য পাসপোর্ট বানিয়ে পাঠিয়েছিলাম।
সেখান থেকে আজ সুখবর এলো আমার ভিসা হয়ে গেছে।
যতোটা খুশি হওয়ার কথা ছিলো ততোটা নিমেষে উধাও হয়ে গেছে । দেশ ছেড়ে যেতে হবে সে কষ্টের চেয়ে ভিসার অগ্রীম মূল্য পরিশোধ করেই যেতে হবে। ৭ লাখ টাকা ভিসার মুল্য। তবে মামার এক কলিগ ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি আমাদের অবস্থা শুনে একটু সদয় হয়েছেন। তাই এখন ভিসার অর্ধেক মূল্য দিতে হবে।
তারপর তারা ভিসার কাগজ নাকি মামার হাতে দিবে। ভিসা যেহেতু হয়ে গেছে তাই বেশি দেরি করলে ভিসা নাকি নষ্ট হয়ে যাবে।
মামা আশ্বস্ত করলেন, আপাতত এই সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যবস্থা হয়ে গেলে ,যাওয়ার পর বাকী টাকা দুবাইতে ব্যবস্থা করা যাবে। এবং সেখানে গিয়ে আস্তে আস্তে দেয়ার প্রক্রিয়া করতে হবে।

এরপর ও এই সাড়ে তিনলাখ টাকা তো আছেই সাথে দেশে ভিসা প্রসেসিং বাবদ এবং টিকেট সহ আরো ষাট হাজার টাকা মেলানো আমাদের পক্ষে কত কঠিন তা কেবল আমরাই জানি।কোথাও টাকা পাচ্ছিলাম না। বিপদের দিন এমনিতে কাউকে পাওয়া যায় না। আব্বার অবসরের টাকা এক লাখ হয়তো পড়ে আছে।আম্মার অসুস্থতায় বেশ টাকা চলে গেছে। আব্বা বার বার সাহস দিচ্ছেন, সব ম্যানেজ হয়ে যাবে বাবা চিন্তা করিস না।
কিছুই ভালো লাগছিলো না। মধ্যরাতেই রুমে ফিরলাম সারাদিন পর।
কাশির শব্দে বুঝতে পারলাম , বাবা এসেছেন।

-সারাদিন কই ছিলি বাবা !

-একটু কাজে ছিলাম। তুমি ঘুমাও নি বাবা ?

-নাহ ! ঘুম কি আর আসে বাবা। তোদের জন্য কিছু করতে পারলাম না রে।

-বাবা প্লিজ এসব কথা থাক। এমনিতে যা করেছো,লেখাপড়া শিখিয়েছো, আর কিইবা করতে বলো।

-শোন বাবা। তোর যদি ইচ্ছে না হয়, তোর বিদেশ যাবার দরকার নেই। তোর একটা চাকরী হয়ে গেলে আমাদের কোন রকম দিন চলে যাবে।

-কদিন আগে হলে হয়তো আমিও তাই ভাবতাম।কিন্তু এখন সে পরিস্থিতি নেই। যেভাবেই হোক বিদেশ যাওয়াটা দরকার। কিন্তু এখন সাড়ে তিন লাখ আর দেশে মেডিকেল আর টিকেট মিলে ৬০,০০০ এর মতো খরচ হবে।
সে টাকা কিভাবে ম্যানেজ হবে জানি না।

-শোন নিবিড়, উত্তরের আমাদের যে জমি আছে সেটা বিক্রি করে দিলে, ৩ লাখ আসবে। আর বাকী টাকা ব্যাংক থেকে লোন নিবো। জমি বিক্রির জন্য আমি লোক দেখেছি। কাল হয়তো বায়না করবে।

-বাবা, এসব কি ঠিক হচ্ছে। আমাদের সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।

-শেষ কোথায় বাবা ! এগুলোতো তোমাদের জন্য। যাই করো বাবা, আমি মরে গেলে তোমার মা, ভাই বোন কাউকে ফেলে যেও না ,কষ্ট দিও না।

বাবা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। বাবা ছেলে অঝোরে কাঁদছি।মধ্যরাতের এই অসহায় কান্না কেবল দেয়ালে টিকটিকি শব্দ করে জানান দেয়, তার ও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

জমি বিক্রি হয়ে গেলো। ব্যাংক লোন মিলিয়ে কাঙ্খিত টাকা হাতে আসার পর মামার কাছে দেয়া হলো। সপ্তাহ খানেক পর ভিসার কাগজ পেয়ে মেডিকেল সহ দেশের যাবতীয় কাজ শেষ করে টিকেট করা হলো।
আগামী শুক্রবার ভোর ছয়টায় সিলেট ওসমানি আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে আমার সরাসরি দুবাইতে ফ্লাইট। ঘরের মধ্যে চাপা একটা কান্না বিরাজ করে। আম্মু ভিসা আসার পর থেকে অঝোর নয়নে কাঁদেন। কিন্তু যেতে তো হবেই সব মায়া মমতা ছেড়ে। মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে এর চেয়ে কি করার আছে। মায়া মমতায় আটকে থাকা সবার জন্য না ।

শেষবারের মতো নিশিতার সাথে দেখা করতে আসলাম। নিশিতার চোখ মুখ ফোলা ফোলা।হয়তো আমি চলে যাব এ খবর শুনে দুদিন থেকে ঘুমায়নি। হয়তো কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে। চুপচাপ বসে আছে। কোন কথা বলছে না। কি বলবে ? কি বলার আছে ! হয়তো সে নিজেই জানে না।
আমিই শুরু করলাম, নিশিতা আমি সত্যি চলে যাচ্ছি।
-জানি যাচ্ছো।যেতে তো হবেই। কোন শক্তি নেই যে আটকাবো। একটা অধিকার থাকলে না হয় কথা ছিলো।

-নিশিতা ভালোবাসার অধিকারের উপর আর কি আছে ! আমি ইচ্ছে করে যাচ্ছি না রে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছি। কিন্তু তুই তো জানিস, আমাদের অবস্থা। একটা চাকরী এতদিন থেকে পাইনি। আর বিদেশ যেতে পারলে হয়তো পরিবারের অবস্থা ভালো হবে। তোকে তখন সম্মান দিয়ে আমার ঘরে তুলবো।

-হু জানি নিবিড়। আবার কবে ফিরবে?

-আমি ঠিক জানি না রে। অনেক ধার দেনা করে যাচ্ছি। সেটা শোধ করতে হবে। আম্মার চিকিৎসা, বোনের বিয়ে, অন্য ভাই বোনের লেখাপড়া, আমি কিছু ভাবতে পারছি না।

-এত কিছুর ভীড়ে তোর কি আমার কথা মনে থাকবে নিবিড় !

-কি বলিস তুই! আমি দেখিস জলদি ফিরে এসে তোক বউ করে ঘরে তুলবো।

-সেদিন যেনো খুব দেরি না হয়ে যায় নিবিড় ।

-জানি না নিশিতা। শুধু দোয়া করো, আমাদের যেনো স্বপ্নগুলো সত্যি হয়। আমি যাই নিশিতা।

নিশিতা হাত বাড়িয়ে একটা প্যাকেট দেয়।

-এর মাঝে কি আছে রে !

-জানিনা আর তোকে কবে পাবো নিবিড় । কবে তোকে দেখবো। এখানে আমার পছন্দের গানের সিডি আছে। একটা নকশী করা কাঁথা আছে, আমি নিজে করেছি তোর জন্য। একটা রুমাল আছে আমাদের স্মৃতির জন্য।
যখন আমাকে খুব মনে পড়বে তুই গান শুনিস ।আর আমাকে ভাবিস।

চোখের অশ্রু আর থামাতে পারে না নিশিতা। বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার। এতক্ষন কষ্টে আটকে রাখা অশ্রু বাঁধ মানে না আর। অঝোর ধারায় গাল বেয়ে পড়ে। দুজন জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলেছি। এ কাঁন্নার শুরু বোধহয় আজ থেকেই।সামনে শুধু অনিশ্চিত যাত্রা। কেবলি অন্ধকার যেদিকে তাকাচ্ছি।
আস্তে আস্তে বন্ধন ছিন্ন করে আমি বাসার দিকে রওনা হলাম। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম, নিশিতা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে একই জায়গায় , আনমনে আমার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে।
পথের বাঁক ঘুরতেই মিলিয়ে গেলো নিশিতা।বুকের মাঝে ধক করে উঠলো, এ দেখাই শেষ দেখা কিনা।

একটু পরেই প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হলো । পুরো আকাশটা যেন কি এক গভীর বেদনায় কেঁদেই যাচ্ছে বিরামহীনভাবে | হয়তো এখনো নিশিতা দাঁড়িয়ে বৃষ্টির পানিতে কষ্ট ধুয়ে মুছে দিচ্ছে আর আমি বৃষ্টির পানিতে ভিজে ভিজে নিশিতার মুখটা মনে করার চেষ্টা করছি।

[চলবে]

-নিলয় আহমেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.