ফিরে আসা দুঃস্বপ্ন

কপালের উপর নলটার ঠান্ডা স্পর্শে চমকে উঠলেন আব্দুর রশিদ৷ আজ বেশ শীত পড়েছে৷ তারমাঝে উনার শরীরে পাতলা একটা পাঞ্জাবী আর লুঙ্গি৷
ঘরের বাইরে এলাকার একছেলে এসে ডাক দিয়েছে তাকে৷ সুন্দরগলায় বলেছে খালুজান একটু শুনবেন? চাইর বাই দুই বাসাটা কোনদিকে?
আব্দুর রশিদ কিছু ভাবেননি৷ না ভেবে বের হয়ে এসেছেন৷
এখন মনে হচ্ছে না আসলেই ভাল ছিল৷ আবার মনে করলেন ঘরে মেয়েটা শ্বশুর বাড়ি থেকে বেড়াতে এসেছে৷ না এলে বরংচ টানাহ্যাঁচড়া হত ঠুস ঠাস গুলি ফোটাও বিচিত্র ছিল না৷
কালো কাপড়ে তার চোখ বেঁধে কাদা মাখা একটা মাইক্রোবাসে তুলে ফেলা হল৷ এই শীতের সময় এরা কাদা পেল কই কে জানে৷
ভয়ে আব্দুর রশিদ পেশাব করে দিলেন কাপড় চোপড়ে৷
পাশের ছেলেটা অশ্রাাব্য  গাল দিয়ে তার কোমড়ে লাথি ঝাড়ল৷ নিজের পেশাবে নিজেই হুমড়ি খেয়ে পড়লেন রশিদ সাহেব৷ সিগারেট ধরাল কেউ৷ সাথে উৎকট গাঁজার গন্ধ৷ এই গন্ধ তিনি চেনেন৷ ভালমতোন চেনেন৷

মাইক্রোটা রায়ের বাজার বদ্ধভূমির অনতিদূরে ফাঁকা একটা জায়গায় ওরা থামাল৷ রশিদ সাহেব কে টেনে হিঁচড়ে নামাল৷ তার লুঙ্গি খুলে গেছে৷ খিস্তি খেউর আর হাসির হুল্লোড় উঠেছে ওদের মাঝে৷
ওরা রাস্তার ধারধরে রশিদ সাহেব কে টেনে হিঁচড়ে নিচে নামিয়ে আনল৷
রশিদ সাহেব একজন হেডমাস্টার৷ জীবনে একটাও অসৎ কাজ করেন নাই৷ আর ছ’মাস পর অবসরে যাবেন৷
সামাদ উদ্দীন এর সাথে মামলা নিয়ে লেগেছে তার৷ স্কুলের জমি সামাদউদ্দীন গিলে ফেলতে চেয়েছিল৷ গিলে ফেলেছিলও৷ মুখে হাতদিয়ে বের করে এনেছিলেন আব্দূর রশিদ৷ বহু ঘুরে ফিরে এখানে ওখানে ঢু মেরে নিরাশ হয়ে একদিন কোর্ট থেকে চলে আসছিলেন৷ হঠাৎ কেউ ডাক দিল৷ এই যে শুনুন৷ তিনি মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন৷ লোকটা বলল স্যারে আপনেরে বুলায়৷
তিনি গেলেন একটা কক্ষে৷ চারপাশে মোটামোটা আইনের বই রাখা৷ মাঝে একটা টেবিল আর চেয়ার৷ ছোটখাট এক লোক বসে৷
লোকটা কিছু একটা দেখছিল৷ সম্ভবত মামলা সম্পর্কিত কোন কাগজ৷ লোকটা ইশারায় বলল বসেন৷
তিনি বসলেন৷
লোকটা মাথা তুলে বলল এই চেয়ারের জন্য আপনার পায়ে ধরে এই মূহুর্তে সালাম করতে পারছি না স্যার! আমি মোতালেব৷ আপনার ছাত্র৷ আব্দুল মোতালেব৷
রশিদ সাহেব চিনতে পারলেন না৷ হাজার হাজার ছাত্র তার হাতের নিচ দিয়ে চলে গেছে৷ অনেকেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত৷ বিচারপতিটতি থাকাও অসম্ভব কিছু না৷
তিনি বললেন আমি আসলে…
মোতালেব বলল না চেনার কথাই স্যার৷ প্রথম যখন আপনি জয়েন করেন সেই ব্যাচের ছাত্র ছিলাম৷ হঠাৎ দেখেই চিনেছি৷ আমাকে আপনি অনেক সাহায্য করেছিলেন স্যার৷ বিনে পয়সায় পড়িয়েছিলেন পরীক্ষার শেষের দিকে৷ যাক এসব৷ না চিনলে নাই৷ আপনার সমস্যা কি সেটা বলেন৷
রশিদ সাহেব বললেন সমস্যার কথা৷
কাগজপত্র দেখালেন৷
মোতালেব সাহেব বললেন ব্যবস্থা করিয়ে দিতে পারব স্যার৷ কিন্তু শেষপর্যন্ত আপনি টিকতে পারবেন কি!
রশিদ সাহেব অবাক হয়ে বললেন মামলা করব, স্কুলের জায়গা খেয়ে ফেলতেছে লোকটা টেকা না টেকার ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না!
মোতালেব বললেন স্যার এরা ক্ষমতাবান লোক৷ হাতে না পারলে ভাতে মারবে, ভাতে না পারলে হাতে৷ আপনার যে মামলা এতে দুই রকমের ব্যবস্থাই হবে৷ দেওয়ানী ফৌজদারী দুইটাই৷ একটা করলে এই কেইস তেমন স্ট্রং হবে না৷
আর মামলা স্ট্রং হলেই হবে না৷ আপনের পেছনে কেউ নাই৷ এদের পেছনে অনেক লোক থাকবে৷ আপনেরে অন্যভাবে ফাঁসায়ে দেবে৷ তখন কি করবেন! আর যদি ফাঁসাতে না পারে তখন জানের উপরে এসে পড়বে৷
রশিদ সাহেব বললেন আমি আপোস করিনাই বাবা, কখনও৷ অন্যায় করিনাই৷ ছেলেপুলেরে মানুষ করছি৷ একটা দুইটা না৷ হাজার হাজার৷
মোতালেব বললেন স্যার আপনি না থাকলে ছেলেপিলে আসবে ক্যামনে! ওরা কিছু না পারলে সেই ব্যবস্থাই নিবে৷
রশিদ সাহেব বললেন যদি কিছু করতে পার তো কর বাবা৷ নাহলে আমি চক্কর কাটি৷ কাটতে থাকব৷ ইস্কুলের জায়গা নিতে দিব না৷
এর বাপে রাজাকার আছিল একাত্তরে৷ পোলা হইছে পান্ডা বাহিনীর প্রধান৷ সামাদ উদ্দীন এর বাপ রইছ উদ্দীন রাজাকার আছিল৷ স্বাধীন দেশে সামাদ ঐ একই কাজ করতেছে৷ হের বাপে করছিল পাকিস্তানীগো লগে মিইলা৷ আর হে করতেছে ওখন৷
মোতালেব অস্থির স্বরে বলল স্যার এসব বইলা লাভ আছে! সামাদ উদ্দীন এলাকার গডফাদার৷ সামনে নির্বাচনে খাড়া হইব৷ টিকেট নমিনেশন কনফার্ম৷ আপনের মতন দুইএকজনরে গায়েব কইরা দিলে কারও কিছু আসবে যাবে না! আমি ভালোর জন্যই বলতেছি স্যার৷
রশিদ সাহেব ফাইল পত্র গোটাতে গোটাতে বললেন আপনে আপনের ভাল নিয়া থাকেন বাবা৷ আমি দেখি কি করা যায়৷
মোতালেব বললেন আপনি ঠিক আগের মতোনই আছেন স্যার! আমি ব্যবস্থা নিয়া দিতাছি৷ তবে আমি থাকব না৷ আমার এইখান থেকে ট্রান্সফার হয়া গেছে৷ আগামী মাসে অন্য জায়গায় চলে যাব….
রশিদ সাহেব উজ্জ্বল মুখে বললেন আপনে করে দেন বাবা….
সেই জের ধরে তিনি যে এই পরিস্থিতিতে পড়বেন সেটা চিন্তাই করেননি৷
মানুষ এমন হয় কেমনে? একাত্তরের রাজাকার আর এখনকার এই মানুষগুলার মইধ্যে ফারাক আছে কোন৷ স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পরেও এরা আছে৷ বহাল    তবিয়তে তাদের কাজ কর্ম করতেছে! আগে এদের প্রতিরোধ করার জন্য মুক্তি আছিল এখন কেউ নাই! কি হবে..
ঘাড়ে চাপদিয়ে রশিদ সাহেব কে ছেলেরা হাঁটুর উপরে দাঁড়া করাল৷ উনার লুঙ্গিটা কোঠাও খুলে পড়ে গেছে৷ পাঞ্জাবি লজ্জাস্থান ঢেকে রেখেছে কোনরকমে৷
তার চারপাশে পাঁচছ’জন উঠতি বয়সের ছেলে পিলে৷
চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে৷
গাড়ীতে তিনি ভয় পেয়েছিলেন৷ তার মনে হয়েছিল সাতচল্লিশ বছর পর হঠাৎ করে আবার একাত্তরের সেই রাত গুলো ফিরে এসেছে !
স্বাধীন দেশে ফিরে এসেছে আগের সেই পরাধীনতার রাত৷
একটা ছেলে গম্ভীর স্বরে বলল চাচা মিয়া আপনেরে কেন উঠাইয়া আনছে বুঝতে তো পারতেছেন৷
রশিদ সাহেব বললেন পারতেছি৷ তার কন্ঠস্বরে কোন আবেগ নাই কোন ভয় কোন শংকা কিছু নাই৷
গাড়িতে তো পেশাব কইরা দিছিলেন ভয়ের চোটে৷ এখন ভয় পাইতেছেন না!
রশিদ সাহেব বললেন না বাবা পাইতেছি না! ভয় চলে গেছে৷
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল ভয় চলে গেল কেন!
রশিদ সাহেব বললেন ভয় থাইকাই হবেটা কি৷ মউতের সময় হইছে মনেহয়৷ নিজের মনরে মানায়ে নিছি৷
ছেলেটা বলল আপনেরে না মাইরা উপায় নাই৷ উপরের অর্ডার!
রশিদ সাহেব বললেন তাইলে মাইরা ফেল৷ দেরি করতেছ ক্যান!
ছেলেটা পিস্তল উঠাল৷ রশিদ সাহেবের কপালে ঠেকাল৷ নলের ঠান্ডা স্পর্শে তিনি চমকে উঠলেন৷
আরেকটা ছেলে বলল ভাই গুলি না কইরা ঘ্যাচাংদেন৷ হুদা শব্দ কইরা লাভ কি! গাড়িত বড় মাল একটা আছে৷
পিস্তল হাতে ছেলেটা বলল তাহলে তুই ই কর কামটা৷
বাকিরা হেসে উঠল৷
রশিদ সাহেব অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন৷
স্বাধীনতার সময়ে রাজাকার আলবদরেরা এমনই হেসেছিল৷ তিনি সেই সময়ের পিশাচ গুলোর থেকে এদের আলাদা করতে পারেননা৷

রশিদ সাহেবের পা দুটো কাঁপতে কাঁপতে একসময় স্থির হল৷ ছেলে গুলো চলে যাচ্ছে৷ খোলা চোখে রশিদ সাহেব যেন তাকিয়ে আছেন, বধ্যভূমির দেয়ালটার দিকে!
ওরা যেতে যেতে হাসছে৷ একজন বলছে আজ মাল খাব মাল! লাড়কিও আছে….
নোংরা জলকাদায় রশিদ সাহেবের দেহটা মৃদু দুলছে৷ গলার কাছে কাটা যায়গায় রক্ত চাটছে এক বেওয়ারিশ কুকুর৷ তার প্রচন্ড খিদে৷ সে চিন্তা করছে একটা কামড় বসাবে কি না!

পলাশ পুরকায়স্থ

Leave a Reply

Your email address will not be published.