“নারীর সাহিত্য: প্রেম কম, বেজেছে শিকল ভাঙার সুর”

পুরুষের সাহিত্যে যেভাবে উঠে এসেছে প্রেম এবং প্রবঞ্চনার কাতর অভিব্যক্তি, নারীর সাহিত্যে তার ছিঁটেফোটাও যেন নেই।

নারী সাহিত্যিকরা বরাবরই ফেমিনিস্ট, সমাজের আচার এবং নিয়মের বিরুদ্ধচারণই যেন ব্রত হয়ে উঠে নারী সাহিত্যিকদের। তাদের সাহিত্যের পরতে পরতে যেন শিকল ভাঙার সুর।

খ্রিষ্টপূর্ব ছয় শতকের গ্রিক সাহিত্যিক স্যাফোকে অনুমান করা হয় প্রথম মহিলা সাহিত্যিক হিসেবে। স্যাফো ছিলেন নারীবাদী।
প্রাচীন স্যাফো থেকে শুরু করে আধুনিক বেশিরভাগ লেখিকাই তাদের কলমে তুলে এনেছেন পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধবাদ।

কিন্তু কেন?
নারীর জীবনে কি প্রেম আসে না? থাকে না প্রবঞ্চিত হবার করুণ গল্প?
নাকি সমাজ, সভ্যতাই নারীর কথা জানতে নারাজ ছিলো সবসময়?

একজন পুরুষ সাহিত্যিকের প্রেম আর বিরহের বহিঃপ্রকাশ যেভাবে ছুঁয়ে যায় পাঠকের হৃদয়,
নারী সাহিত্যিককে কি সে আন্তরিকতা নিয়ে কখনো গ্রহণ করা হয়েছে?
নাকি যুগেযুগেই সাবলীলভাবে নিজের গল্প বলতে আসা নারীকে দেয়া হয়েছে চরিত্রহীনার তকমা?
এমনকি সেসব গল্পকে সাদরে গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হয় নারীরাও।

যুগেযুগে নারীরা প্রচণ্ড বিরুদ্ধতার স্বীকার হয়েছেন সাহিত্য চর্চায় এসে।
তাই সাহিত্যে নারীর আগমন সীমিত, আরো সীমিত টিকে থাকার লড়াইয়ে জিতে যাওয়া নারী সাহিত্যিকের সংখ্যাটা।প্রচণ্ড বিরুদ্ধতার সাথে সংগ্রাম করে লিখতে হয়েছে বিশ্ব সাহিত্যের প্রত্যেক লেখিকাকে। পান নি প্রকাশকদের সাড়া, পান নি পাঠক সমাদর, পান নি পুরস্কারের ফুলঝুরি।

বিশ্বসাহিত্যে নামী নারী সাহিত্যিকের সংখ্যা হাতে গোনা যাবে। অ্যান ব্র‍্যাডস্ট্রিড, জেন অস্টেন, মেরি শেলি, ইডিথ ওয়ার্টন এমন উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম নিলেই ফুরিয়ে যায় তালিকা।এদের প্রত্যেকের ব্যক্তিজীবন এবং সাহিত্যজীবন ছিলো সংগ্রামমুখর। নানা ঘাতপ্রতিঘাত বেরিয়ে লেখকসত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রাখার এ যুদ্ধ বরাবরই পুরুষের চেয়ে বেশি।

বাংলা সাহিত্যেও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী। তিনি মধ্যযুগের কবি। তার জীবনে আছে প্রেমিক জয়চন্দ্রের প্রবঞ্চনার এক করুণ গল্প। প্রেমিকের দেয়া আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি সারাজীবন অবিবাহিতই ছিলেন। চন্দ্রাবতী কতটুকু স্বীকৃতি পেয়েছে সাহিত্যে?দ্বিতীয় যিনি স্বীকৃত সাহিত্যে তার নাম রামি মতান্তরে চন্ডীদাসের প্রেমিকা রজকিনী। চণ্ডীদাস যতটা খ্যাত হয়েছে, রজকিনী তার প্রেমিকা ছাড়া আর কোনো পরিচয়ে পরিচিত হয়নি তেমন।

সাহিত্যে আসা বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, নুরজাহান বেগম কিংবা হালের তসলিমা নাসরীন এবং তৎপরবর্তী নারী লেখিকাই সাহিত্যে প্রেম, বিরহ বা লৌকিকতাকে তুলে আনেন নি। বরং প্রত্যেকেই নারীর মুক্তির কথাই যেন বলে যাচ্ছেন বারবার।

আসলে একশো একটা শিকল দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ প্রত্যেক নারীর জীবনে বঞ্চনা ছাড়া আর কোনো গল্প নেইও। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী কেবলই অন্যের প্রেমের উপাদান অথবা ছলনাময়ী। নারীরও যে থাকতে পারে নিজস্ব অভিব্যক্তি, নিজের কিছু গল্প সাহিত্য বরাবরই তা অগ্রাহ্য করেছে। নারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। আঙ্গুল সামনের দিকে তাক করলেই সে নারী অবাধ্য, উচ্ছৃঙ্খল আর চরিত্রহীন। মস্তক অবনত রইলেই সে পূজনীয়া, নান্দনিক।

তীব্র বিরুদ্ধতাই নারী সাহিত্যিকদের প্রেমিকা হতে দেয় নি, বানিয়েছে বিদ্রোহিণী। নারী যেভাবে কবি, সাহিত্যিকদের যুগেযুগে ভালোবেসেছে, পুরুষ সেভাবে ভালোবাসতে পারে নি নারী সাহিত্যিকদের।

তাই নারীর সাহিত্যে প্রেম মৃত, কেবল ঘৃণার আগুন, কেবল বঞ্চনার গল্প আর সামাজিকতার প্রতি তীব্র বিরাগ।
কঠিন পথ পরিক্রমা পেরিয়ে তাই নারীর সাহিত্যে অগ্রযাত্রাও অনেকটুকু শ্লথ। পুরুষেরা কবিসাহিত্যিকদের ভালোবাসতে শিখুক, নারীর সাহিত্যেও জায়গা করে নিক প্রেম।

-জান্নাতুন নুর দিশা

Leave a Reply

Your email address will not be published.