চোখ

ছেলেটি আমার পাশে বসল। হাতে ছড়ি, চোখে রোদচশমা, মুখে হাসি। আমি একটি বিয়ের নিমন্ত্রিত অতিথি। খাওয়ার টেবিলে ভিড়। বাইরে পেতে দেওয়া চেয়ারে বসে আছি। ভিড় কমুক।

আমার দিকে ফিরল সে। মুখে হাসি। তাকানোর ভঙ্গিতে আড়ষ্টতা। বুঝে নিতে কষ্ট হলো না, ছেলেটি অন্ধ। বছর পঁচিশেক হবে, বয়স। মার্জিত চেহারা। খুব যত্নে সিঁথি করে আঁচড়ানো চুল। ঘিয়ে রঙের ফতুয়ায় সম্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে তাকে।

বুকে সূক্ষ্ম একরকম ব্যথা অনুভব করলাম। মানুষ কত যে অসহায়!

“আমি কি একটু কথা বলতে পারি জনাব?”- লাজুক হাসিটা একটু বিস্তৃত হলো ছেলেটির, এ-কথাগুলো উচ্চারণের সময়।

আমি ঝুঁকলাম অল্প। “জি? প্লিজ! বলুন প্লিজ?”- বয়সে আমার বড়ো সন্তানের বয়সি, তবু ‘আপনি’ বলতে বাঁধল না। কিছু কিছু মানুষের প্রতি অবচেতনেই সম্ভ্রম চলে আসে।
“হা হা! আমি নিশ্চিত ছিলাম না জনাব, আপনি ভদ্রমহিলা নাকি ভদ্রলোক। তবু সঠিকই ধরেছি। অন্ধের ইনট্যুইশন সাধারণত ভ্রান্ত হয় না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে।”- এটুকু বলে, হয়তো বাহুল্য কিছু বলে ফেলেছে ভেবে, একটু সংকুচিত হলো, মনে হলো।

অল্পক্ষণের বিরতি শেষে, পুনরায় আরম্ভ করল বলা—”আমি আজ এখানে নিমন্ত্রিত নই; আমার বাবা নিমন্ত্রিত ছিলেন। উনি গত দুদিন ধরে অসুস্থ খুবই। বিছানায়, টানা। আমাকে তো তেমন কোথাও পাঠানো হয় না, তাই একটু অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছি। ভীতও, জনাব।”
আমি সহানুভূতিশীল হলাম। বাবার অসুস্থতা, কিংবা ছেলের ভীতির সরল স্বীকারোক্তির প্রতিক্রিয়ায়। অবচেতনে এমন ভাবনাও টোকা দেয়নি তা নয়, যে, ছেলেটি কী এমন আকুলিবিকুলি করে মূলত টাকাপয়সা সাহায্য চাওয়ার দিকে এগুচ্ছে এরকম আর দশজন ভিখিরির মতো? কান খাড়া রাখলাম, মনোযোগও।

“আসতেই হয়েছে। বিকেলে উঠেছি গাড়িতে। হাতড়ে-হাতড়ে চলেই এলাম। আমরা জনাব, বটেশ্বরতলায় থাকি। চেনেন তো? ওই যে! এ-শহর থেকে মাইল তিরিশের দূরত্ব, ওই দক্ষিণে।”- ছেলেটি ঠিকই ঘাড় ফেরালো, দক্ষিণ দিকে। অন্ধ মানুষের ইনট্যুইশন ভালো, ভুল বলেনি সে।

“এত দূর এলেন! নিশ্চয়ই একাধিক গাড়ি পালটাতে হয়েছে! কোনো সমস্যা হয়নি তো?”- অকৃত্রিম উদ্‌বেগে জানতে চাইলাম।

“উঁহুঁ। হয়নি তো! এ-জগতে অন্ধকে সাহায্য করে তো মানুষ! হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দেয়, এক আঁজলা জল তুলে দেয় মুখে, কানের পাশে মুখ এনে ধরা গলায় জানতে চায়- ‘ক্ষুধা লাগছে ভাই? ভাত খাইবা?’, গাড়িতে তুলে দেয়, নামতে সাহায্য করে, নিজের সিটেই বসতে দেয় অনেকেই। আমার বাবাও যদি অন্ধ হতেন!”- একটু কি শ্লেষ ছিল শেষের বাক্যটায়? আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললাম ছেলেটির মুখের ওপর। মানুষের চোখ ঢাকা থাকলে, কোনো অভিব্যক্তিই সত্যিকার অর্থে বোঝা যায় না। তবু, অশ্রুর গন্ধ পেলাম কি আমি!

“আম্মা এখনও, এইযে অ্যাত্তো বড়ো হলাম, চোখের আড়াল হতে দেন না একবারও। আজ বাধ্য হলেন। জানি তো, বোকা মা’টা কাঁদছেন ফুঁপিয়ে, ঘরে। আমার প্রায়ই মনে হয়, পৃথিবীর মায়েদের আঁচলে ঘুমোবে বলেই অশ্রুরা জন্মায়। জনাব, একটু সাহায্য করতেন যদি?”

আমি নড়েচড়ে উঠলাম! চোখের কোণে জল জমেছিল আমারও। কিন্তু, সাহায্যের কথাটা শুনেই, কেমন যেন বিরক্তি জমা হলো বুকে। এ-ও তবে ধড়িবাজ? আবেগ বিকিয়ে পেট চালায়? ছিঃ!

“যদি সাহায্যটা করতেন, রাত গভীর না-হতেই বাড়ি ফেরা হতো। কাঁদছে মা’টা। অ্যাত্তো বড়ো ছেলে হারায় নাকি কোথাও! বলুন তো জনাব? মায়েরা কী যে বোকা হয়! আমি জনাব এবার স্নাতকোত্তর দেবো। তবু রোজ জামা পরিয়ে দিতে হবে! নখ কেটে দিতে হবে যখনতখন! চুল বাড়ুক না-বাড়ুক, কেটে দিতে হবেই তাঁকে! এই যে সিঁথিটা! তেল দিয়ে অমন যত্ন করে অ্যাত্তো বড়ো ছেলের সিঁথি করে দেয় কেউ! হা হা! আম্মা করেন, এসব। হা হা!”

হঠাৎ থেমে গেল! মনোযোগ সরেনি আমার এখনও। তাই, শুনেই যাচ্ছিলাম। যেভাবে থেমেছিল, সেভাবেই, হঠাৎই, আবার বলে উঠল- “মানুষেরা জন্মায় কেন জানি না। জানি না, মায়েরা, বাবারা, কোন সে মরণসুখে জন্ম দেন সন্তানের জীবন! একটি কুকুরছানা, তার মাকে ছেড়ে যায় না কখনও! একটি পাখির ছানা, রাত নেই, দিন নেই, মায়ের বুকের নিচে ঘেঁষে-ঘেঁষে থাকে! আমি জানি, একটি বৃক্ষ তার বুড়ো শেকড়ের পাশে সদ্য মাথা তোলা চারাটিকে অপার মায়ায় ঢেকে রাখে রোদঝড়বৃষ্টির বেদনা থেকে, যে চারা মায়ের বুক ফুড়ে উঠে যাবে না আকাশের দিকে। আমি জানি, দিনের পর দিন, মুখে ডিম্বকোষের ভেতরের সন্তান নিয়ে অভুক্ত কাটিয়ে দেয় কত্তো মৎস্যপ্রজাতি, যে প্রস্ফুটিত মৎস্যছানা মাকে খাবে না কোনোদিন! আমি জানি না, মানুষ কেনো জীবনের সমস্তটুকু নিংড়ে দিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করে একজন সন্তানের জন্মের আকাঙ্ক্ষায়! একজন অকৃতজ্ঞ জন্ম দিতে!”

থুতনি পেরিয়ে, অশ্রুর ফোঁটাটি গড়িয়ে পড়ল তার হাঁটুর উপর। আমি তাকিয়ে আছি; একফোঁটা অশ্রু কী অবলীলায় মানুষের সমস্ত বেদনা বুকে জড়িয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, দেখলাম আমি। আমি বুঝতে পারছি না, কী চায় মূলত এই ছেলে!

“বাবা এই চিঠিটা দিয়েছেন। উনি তো লিখতে জানেন না, চাষা। লিখে দিয়েছি আমি। আর, চাষার বউটা, আমার মা’টা, বোকা, দিয়েছেন এই হারখানা। তাঁদের বিবাহের একমাত্র স্মৃতি। ভালোবেসে, আমার মাকে গড়ে দেওয়া আমার বাবার একমাত্র বিলাসী উপহার। সোনার এ-হার। আমি জনাব, চাষাপুত্র।”

পকেট থেকে ছোট্ট পুঁটলিটা বের করে, আমার দিকে এগিয়ে ধরল সে। সোনার হার। এ-ছেলে কি জানে না, পৃথিবীতে একমাত্র অমর ব্যক্তিটির নাম- লোভ! ছেলেটা কি শোনেনি, এরকম একটি সোনার হার আমার মতো আটপৌরে অগণ্য মানুষ এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে হাওয়া হয়ে যেতে পারে মানব-বাজারে! ছেলেটা কি চূড়ান্ত নির্বোধ নয়? নাকি, অপারগ? বাধ্য? পুঁটলিটার পাশে একটা চারকোনা কাগজ, ভাঁজ করা।

কাগজটা, আলগোছে তুলে, আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল ছেলে- “চিঠিতে লেখা- ‘তোমার জন্মের সময় তোমার মা মৃত্যুপথযাত্রী ছিলেন। টানা মাস হাসপাতালে পড়ে ছিলেন উনি, চেতন-অচেতন; অথচ, সদ্যোজাত তোমাকে তাঁর পাশে শুইয়ে রাখতে হয়েছিলো বাঁ হাতের বেড়ে। তুমি ছাড়া থাকবেন না তিনি জীবনমরণ ওই চিকিৎসালয়ে। নারীরা নির্বোধ নন, কোনোকালে, মায়েরা নির্বোধ ঠিক! তুমি বাড়ি নেই আজ দেড় দশক। তিনি কি বেঁচে নেই? আছেন। চাষাপুত্রের ছাপ তোমাকে অমর্যাদা দিচ্ছিল। প্রিয় পুত্র, তুমি সুখী হও। তোমার মায়ের দোয়াটুকু সাথে রইল, অনন্তকাল। আজ, নতুন জীবনের শুরুতে তাঁর এ-ই প্রার্থনা- তুমি সুখী হও।’

জনাব, হাতজোড়ে অনুরোধ করি যদি, এই চিঠি, আর এই পুঁটলিটা, মঞ্চে বসা বরের হাতে দিবেন প্লিজ? বড়ো দয়া হয় তবে! এ-অমূল্য দান, একজন চাষাপুত্র হয়ে, ও-ভদ্রলোকের হাতে দিতে, বড়ো লজ্জা করে।”

মানুষ ঢুকছে, মানুষ বেরুচ্ছে, খাবারের টেবিলমুখী, খাবারের টেবিল ছেড়ে ঢেঁকুরে। আমি বসে আছি। হাতে একটি পুঁটলি; বড়ো মায়ায় জড়ানো পুঁটলি। একজন অন্ধ বেরিয়ে যাচ্ছে, ধীরপায়ে। আমি জানি না, আমার চোখ দুটো কেন অমন জ্বালা করে!

সালাহ্ উদ্দিন আহমেদ জুয়েল

Leave a Reply

Your email address will not be published.