গোধূলিবেলায় ( ৪র্থ পর্ব )


বাসায় ফিরতে ফিরতে রেবেকা বার বার রিমিকে সাবধান করলো , সে যেনো ঘুণাক্ষরেও এসব কিছু মাকে না জানায়। এভাবে কয়েকবার একই কথা শুনতে শুনতে শেষে রিমি অসহ্য হয়ে বলে উঠলো,
” তুমি আজ বিকেলে নদীর পাড়ে যাবে না? উনি যে পিছন থেকে বললেন , বিকাল পাঁচটায় ওইখানে থাকবেন। আমার মনেহয় বুবু , তোমার যাওয়া উচিৎ। মানুষটা কিন্তু খুব ভালো বুবু! দেখলে না কি সুন্দর করে কথা বলে। আমি হলে অবশ্যই যেতাম। ” কথাটা বলেই রিমি হি হি করে হাসতে লাগলো।

রেবেকা রিমিকে মারার জন্য একটা হাত তুলে বললো, ” যা বললাম তাই করবি। খবরদার যদি দেখি কথাটা কাউকে বলেছিস তাহলে কিন্তু তোর খবর আছে। ”

রিমি হাঁটতে হাঁটতে এবার বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠলো, ” তুমি বিয়ে করবে না বুবু! ইশ তোমার যদি বিয়ে হয় তাহলে তোমার বিয়েতে অনেক মজা করবো বুবু! আমার একটা দুলাভাই হবে। তার কাছে কত কি আবদার করবো। আমার খুব আফসোস জানো বুবু যে আমার কোন বড় ভাই নেই! বড় ভাই থাকলে কত কি আবদার করতাম। আমাকে সাথে করে কত যায়গায় ঘুরে বেড়াতো। যাক বড়ভাই নাই তো কি হয়েছে! দুলাভাইকেই ভাই মনে করবো! ”
রিমি একটু দম নিয়ে আবারও বলে উঠলো, ” তুমি খুব ভালো বু! তোমার মতো মানুষ হয় না। বাড়ি থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশী সবাই তোমাকে খুব পছন্দ করে। সবার মতো আমিও চাই তোমার ভালো একটা বিয়ে হোক। ” কথাগুলো বলতে বলতে শেষের দিকে রিমির গলাটা ধরে আসলো। রিমির মানসিক অবস্থাটা টের পেতেই রেবেকা তাকে গভীর আবেশে বুকে জড়িয়ে ধরে থাকলো। রেবেকা তাকে জড়িয়ে ধরতেই রিমি আর নিজেকে সামলাতে পারলো না, রেবেকাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলো। একটু পর রিমি নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে রেবেকার বুক থেকে মুখটা তুলে চোখদুটো মুছে বললো,
” আমাকে কথা দাও বুবু , তুমি ওই ভাইয়ার সাথে আজ দেখা করতে যাবে। আমি মাকে যদি বলি তাহলে মা সব বুঝতে পারবে। ”

রেবেকা তার মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে নেড়ে এলোমেলো করে একটু হেসে বলে উঠলো, ” চল বাড়ি চল, মা ভাত বেড়ে অপেক্ষা করছে।”
রিমি আবারও হি হি করে হেসে উঠে ইয়া হু বলে একটা লাফ দিয়ে বাড়ির দিকে দৌঁড় দিলো। রেবেকা হাসতে হাসতে তার পিছু পিছু আসতে লাগলো।

দুপুরে খেতে বসে আজ কিছুতেই রেবেকার গলা দিয়ে ভাত নামতে চাইলো না। থালায় অল্প একটু ভাত নিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করতে লাগলো। তাই লক্ষ্য করে আয়েশা বেগম তাকে জিজ্ঞাসা করলো, ” কি রে মা , কি হয়েছে তোর? তখন থেকেই দেখছি , ভাত মুখে না তুলে শুধু নাড়াচাড়া করছিস? আবার নতুন করে কোন অসুখ বিসুখ বাঁধালী নাতো? শরীর খারাপ করছে রে মা? ”
আয়েশা বেগমের কথা শুনে রিমি ভাত খেতে খেতে রেবেকার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলো।
রিমির হাসি লক্ষ্য করে আয়েশা বেগম আরও খানিকটা আশ্চর্য হয়েই প্রশ্ন করলো, ” তুই আবার ওর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছিস কেন? ”

রেবেকা তাড়াতাড়ি করে উত্তর দিলো, ” খেতে ইচ্ছে করছে না মা! একেবারেই খিদে নেই। ” কথাটা বলেই রেবেকা ভাতের থালাটা হাতে নিয়ে বারান্দায় বিছানো পাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে থালার ভাত গুলো উঠানে চড়ে বেড়ানো মোরগ মুরগির দিকে ছিটিয়ে দিয়ে কল তলায় চলে গেলো। কল তলা থেকে হাত ধুয়ে নিজের ঘরে এসে গামছাটাতে হাত মুছতে যেতেই দেয়ালে ঝোলানো আয়নার দিকে নিজের চেহারার প্রতিবিম্ব পড়তেই সেদিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। গামছাটা আলনার উপর রেখে ভালোমতো করে আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগলো। আলতো করে সামনের চুলগুলো পিছনে সরিয়ে নিজের চেহারায় কি যেনো খুঁজতে লাগলো! একবার ডান , আরেকবার বামদিকে কয়েকবার করে মুখটা ঘুরিয়ে দেখেই যেতে লাগলো। আস্তে করে আয়নার নিচে রাখা ছোট্ট টেবিলটার উপর থেকে কতদিন আগে কেনা গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক খানা তুলে ঠোঁটে হালকা করে ছুঁইয়ে দিয়ে আবারও ভালো করে নিজেকে দেখতে লাগলো। গত রোজার ঈদে বাবা জোর করে তাকে বাজারে নিয়ে গিয়ে এইসব প্রসাধনসামগ্রী গুলো কিনে দিয়েছিলো। টেবিলের উপর থেকে পাউডারের পাফটা তুলে আলতো করে মুখে মেখে আবারও শাড়ির আঁচল দিয়ে পাউডারটা সারা মুখে হালকা করে ছড়িয়ে দিলো। আবারও বারবার নিজের মুখখানি এদিক সেদিক ঘুরিয়ে শেষে এক জোড়া কানের দুল কানের কাছে তুলে ধরতেই আয়নায় নিজেকে খুব সুন্দর লাগলো। হঠাৎ করে ফয়সালের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই লজ্জায় একেবারে রাঙা হয়ে উঠলো। নিজের মনে যেনো নিজেই জিজ্ঞাসা করে উঠলো,
” কি দেখছো ওমন করে ? ”
হঠাৎ বাইরে কার যেনো পায়ের শব্দ পেতেই চটজলদি করে দ্রুত গামছা দিয়ে ভালো করে ঠোঁট ও মুখটা ঘষে ঘষে লিপিস্টিক ও পাউডারের প্রলেপ তুলে ফেলে বিছানায় বুক পারা দিয়ে শুয়ে হাঁপাতে লাগলো। কিসের যেনো এক অস্থিরতা তার ভিতরে এসে ভর করেছে। কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। নিজের অজান্তেই বারবার চোখদুটো দেয়াল ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। একটু পর খোকা ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে বললো, ” মা তোমাকে ডাকছে বুবু। ”

রেবেকা বালিশে গুঁজে রাখা মুখটা তুলে বললো,
” তুই যা আমি আসছি। ” কথাটা বলেই রেবেকা আবারও বালিশে মুখ খানা গুঁজে মনে মনে ভাবলো, নিশ্চয়ই রিমি মাকে সব বলে দিয়েছে। এই কারণে আজ সে ভাত খেয়ে এখনও এই ঘরে শুতে আসেনি। অন্যান্য দিন ভাত খেয়ে ঘরে এসে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ে। আর আজ কিনা ? কথাটা ভাবতেই তার ভীষণ লজ্জা পেলো। এখন সে কেমন করে মায়ের সামনে দাঁড়াবে ? নাহ , এখন সে কিছুতেই মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। এইসব ভাবতে না ভাবতেই বাড়ির উঠোন থেকে রিমি জোরে ডেকে উঠলো , ” বুবু , মা তোমাকে ডাকছে , জলদি এসো। ”

রিমির ডাক কানে যাওয়া মাত্রই আবারও একগাদা লজ্জা এসে ভর করলো তার মনে। মনের সাথে খানিক যুদ্ধ করে সে বিছানা থেকে উঠে আবার ভালো করে মুখটা দেখে নিলো মুখে কোন প্রসাধনী লেগে আছে কিনা। তাড়াতাড়ি করে আঁচল দিয়ে আবারও মুখটা ভালো করে মুছে মায়ের ঘরের দিকে যেতে লাগলো।
(চলবে)

-ফিরোজ চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published.