খ্যাতি ( একটি মনস্তাত্ত্বিক গল্প )

এক.

আমার বউকে পুরোপুরি নগ্ন অবস্থায় অন্য পুরুষের সাথে দেখে কয়েক সেকেন্ড অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম । আমি তাকে চমকে দেওয়ার জন্য দুপুরের অসময়ে বেডরুমের ইয়েল লকটা ছুরি দিয়ে মাখন কাটার মতো নিঃশব্দে কয়েক ইঞ্চি খুলে, চমকটা হজম করে তেমনি নিঃশব্দে লাগিয়ে দিয়েছি । কারো দিকে সরাসরি তাকালে যাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভালো, তারা বুঝতে পারে । তাই নিয়ম হচ্ছে কৌতুহল হলে আড়চোখে তাকানো । ভাগ্য ভালো শিরীনের দুই চোখ বন্ধ ছিল । কেন যেন মনে হলো সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে আমি তার মায়াভেজা দৃষ্টি অনুভব করতে পেরেছি । নিষ্পাপ মুখে বিস্ময় আর অতৃপ্তির অদ্ভুত এক কেমিক্যাল রিয়্যাকশন দেখে আমি লজ্জায় মাথা নত করে নিঃশব্দে দরজার বাইরে থমকে দাঁড়িয়ে আছি । শিরীনের সঙ্গী ভদ্রলোক টের পাননি । আমাদের এলাকায় ওনার দিকে সবাই সমীহের চোখে তাকায় । শিক্ষা মানুষের কদরটাই অন্য লেভেলে পৌঁছে দেয় । সেই উচ্চমাত্রায় ভেতরে কদর্য রূপ থাকলেও, সেটা ঢাকা পড়ে গিয়ে কেবল গুণটা প্রকাশিত হয় । মানুষ আজকাল বড়বেশি সামাজিক । অসামাজিক সবকিছু ঢেকে রাখে । অনেকটা কালসাপ যেমন তার থলের ভেতর বিষ আগলে রাখে, মানুষও এখন বিষাক্ত পরিবেশে চোখ বন্ধ করে রাখে । বাইরে কাল বৈশাখীর তান্ডব থেমে গেলেও, আঁধার ভাবটা এখনো কাটেনি । চারিদিকে পবিত্র নীরবতার সাথে শীতল হাওয়া বইছে । মিনিট বিশেক স্থায়ী ছিল এই ঝড় । শহরে থাকার সময় পূর্বাভাস টের পেয়ে ভাবলাম বাসায় ফিরে শিরীনকে চমকে দেবো । তাছাড়া অনেকদিন দুপুরের আলস্যে ডুব দেওয়া হয়নি আমার । বাসা কিংবা বাড়ি যাই বলা হোক, আমি সেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলাম । আমি এখন কী করবো কোথায় যাবো কিছুই ভাবতে পারছিনা । কি না করেছি শিরীনের জন্য ? তাকে সুখী করার জন্য পারিবারিক ব্যবসা ছেড়ে ঠিকাদারি শুরু করেছি । একসময় উপজেলায় আমাদের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটা খুব চালু ছিল । মূলত ভুষিমালের দোকান । যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আব্বা ব্যবসার পরিসর বাড়ালেও বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় লাভ কম হচ্ছিল । আমি সেই দোকান বিক্রি করে দিলেও আব্বা কিছু বলেননি । আমার পক্ষে দোকানে বসা যে সম্ভব নয়, আব্বা সেটা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন । আমাদের প্রচুর জমিজমা থাকায় কখনো অভাবের মুখ দেখতে হয়নি । আলাদীনের চেরাগ কেউ না দেখে থাকলে আমার উন্নতি দেখে সেই চেরাগ দেখার শখ মেটাতে পারেন । ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করার বছর ঘোরার আগেই গাড়ি কিনলাম । চার বছরের মাথায় একতলা বাড়ির পেছনে বিশাল জায়গা নিয়ে ঢাকা থেকে আর্কিটেক্ট আনিয়ে, সুন্দর ডিজাইন করে পাঁচতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে তিনতলা পর্যন্ত কমপ্লিট করেছি । আমাদের উপজেলায় এরচেয়ে সুন্দর বাড়ি কেবল এম পি সাহেবের । শিরীন কলেজে পড়াকালীন সময়েই রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়েছিল । ছিপছিপে একহারা গড়নের মেয়েটা ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হওয়ার পরই আমার চোখে পড়েছিল । আমি রাজনীতি না করলেও কলেজের ছাত্র সংসদের সবাই আমাকে সমীহ করে চলত । স্থানীয় হওয়ায় এবং পারিবারিক আর্থিক স্বচ্ছলতার চেয়ে সাংস্কৃতিক কাজে আমার আগ্রহ থাকায় অনেকে আমায় সম্মান করতো । আমাদের উপজেলায় অনেকেই বাইক চালালেও আমার মতো প্রতি বছর বাইকের মডেল কেউ বদলায়নি । আমি আর দশটা পুতুপুতু টাইপ সাংস্কৃতিক ছেলে না । কবিতা আবৃত্তি, গল্প লেখা, বছরে দুই তিনটা সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করলেও ডাকাবুকো হিসেবে আমার যথেষ্ট পরিচিতি ছিল । আমার চারপাশে আনন্দ বিলিয়ে দিতে পছন্দ করি আমি । শিরীন প্রথম প্রথম কবিতা পাঠের আসরে এলেও রাজনীতি তাকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল । আর আমাকে আকৃষ্ট করেছিল শিরীনের স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্পোর্টিং মানসিকতা । গ্রাম যতই জেলার কাছাকাছি চলে যাক, মানুষের মানসিকতা এখনো সেই পর্যায়ে যায়নি । পরচর্চা, পরনিন্দা, ছোটখাটো বিষয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামা এখনো নৈমিত্তিক ব্যাপার । সেই তুলনায় শিরীন অনেক আধুনিক । শিরীনের ছাত্র রাজনীতি ছিল অনেকটা পুরোনো ধাঁচের । আমাদের উপজেলার আয়তন আগে থেকেই বড় ছিল । আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের মানবিকতার মান না বাড়লেও, জীবনযাত্রার মান বেড়েছে । কলেজের পরিসরের সাথে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একটু আধটু অনিয়ম ছড়িয়ে পড়েছিল । ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করে শিরীন কলেজ রাজনীতির লাইম লাইটে চলে এলো । এরপর থেকে তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি । অনার্সে পড়াকালীন জেলা সদর থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার সাথে তার পরিচয় সাফল্যের সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে । মাত্র আটাশ বছর বয়সে মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হয়ে সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ।

দুই.

বাইরের এবং ভেতরের, দুটো ঝড়ই থেমে গেছে । স্থানীয় রেস্টুরেন্টে শূন্য চায়ের কাপ নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি । আমি খেয়াল করে দেখেছি সামনে খালি চায়ের কাপ থাকলে মাছি আর স্মৃতি এসে ভীড় করে । আমাদের তিন বছরের প্রেম আর আট বছরের বিবাহিত জীবন এক নিমিষে যেন এক দুঃস্বপ্নে পরিনত হলো । কলেজে পড়াকালীন সময়ে শিরীনকে বাইকের পেছনে বসিয়ে যেদিন প্রথম বেড়াতে নিয়ে গেলাম, সেই খবর চাউর হতে বেশি সময় লাগেনি । পরদিন কলেজে মেয়েদের মুখে বিটলামি হাসি আর ছেলেদের চোখে মৃদু ঈর্ষা টের পেয়ে মনেমনে হেসেছি আমি । ডিজার্ভ আর ডিমান্ডের মাঝে তফাত আছে । আমার কেন যেন মনে হতো, ভালো একটা জীবনের সাথে শিরীনের মতো চমৎকার একটা মেয়ের ভালোবাসা আমি ডিজার্ভ করি । রেস্টুরেন্টে বসে আজ মনে হচ্ছে সমস্ত চাওয়া পাওয়া, অনুমান, আশা, স্বপ্ন, এক নিমিষে মিথ্যে হয়ে গেল । আমি আনন্দপ্রিয় মানুষ হলেও দিনশেষে সেই সাধারণের কাতারেই পড়ি । তাই চাওয়া পাওয়ার পরিধিটা ছোট্ট ছিল । শিরীন উচ্চাভিলাষী হলেও তার অনৈতিক কোনকিছু আমার নজরে কিংবা কানে আসেনি । কিংবা আমাকে হয়তো অন্ধ এবং বধির বলা যায় । আমাদের ছেলেমেয়ে হয়নি । বছর তিনেক পরও শিরীনের অনাগ্রহ দেখে প্রথম প্রথম রাগ হতো । আমি সংস্কৃতিমনা হলেও মনের গহীনে কোথায় যেন এক রক্ষণশীলতা ছিল । বাঙালি পুরুষ মাত্রই কি রক্ষণশীল ? আমি অনেক পুরুষকে অন্যের বউ বোনের দিকে বাঁকা নজরে তাকাতে দেখলেও নিজের পরিবারের বেলা পুরো ভদ্রলোক হতে দেখেছি । রাতে বাড়ি ফিরে এলাম । আমাদের বিশাল বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে । আব্বা আম্মা ছোট ভাইয়ের সাথে ইংল্যান্ডে থাকেন । মনে মনে ভাবলাম ভালোই হয়েছে । শিরীনের সাথে সাথে সম্ভাব্য একটা ঝগড়া এবং সেটার পটভূমি তাঁদের জানা হলো না । ওনারা বাড়িতে থাকলেও কী কুকীর্তি বন্ধ থাকতো ? বৃষ্টির দিনে ভুনা খিচুড়ির সাথে মাংস ভুনা আমার খুব প্রিয় । আজ শিরীন নিজের হাতে রান্না করেছে । রোজকার কাজের মেয়েটা দুদিনের ছুটি নিয়ে ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে গেছে । কাজের মানুষের ছুটির আদিখ্যেতা আমার পছন্দ না হলেও শিরীনের জন্য সেই অপছন্দ জোর করে প্রকাশ করতে পারিনা । আজ এই ছুটির পেছনের কারণটা প্রকাশিত হলো । খিচুড়ির ঘ্রাণ পেয়েই বুঝতে পারছি ভালো হয়েছে । অথচ আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা । শিরীন অনেক কথা বলছে । আমি মাথা নিচু করে খিচুড়ি অনেকটা বাধ্য হয়ে গলধকরণের চেষ্টা করছি । ” উপজেলা চেয়ারম্যান পদে তোমার নমিনেশন পাওয়ার জন্য আমি সেন্ট্রালে চেষ্টা করে যাচ্ছি । টাকা পয়সা একটু খরচ হলেও মনে হচ্ছে কাজ হয়ে যাবে । ” সহ্যের একটা সীমা থাকে । আমি মাথা না তুলেই বল্লাম “আমি নমিনেশন দিয়ে কী করবো ? আমাকেও কি তোমাদের মতো একটা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মানুষের সাথে মিশতে হবে ? ” শিরীন ম্লান হেসে বলে “একটা বুড়ো হাবড়া গত চার টার্ম ধরে চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে কাজটা কী করেছে ?” আমি বিরক্ত হয়ে বললাম “এলাকার উন্নয়নের জন্য এম পি সাহেব নিজেই যথেষ্ট ।” শিরীন একটু আহত স্বরে বললো “তোমাকে জানিয়েইতো ক্যাম্পেইন শুরু করেছি । এখন মাঝপথে থেমে গেলে আমার নিজেরই পাশ করা সমস্যা হয়ে যাবে । ” একটু ঠোঁট বাঁকিয়ে বললাম “তোমার আবার সমস্যা কী ?”
“এবার মহিলা ক্যান্ডিডেট চারজন । ঝুমা মেয়েটার ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে আর এম পি সাহেবের সাথে লবিং ভালো । ” কিছু না বলে কোনরকম খাওয়া শেষ করলাম । রাতের খাবারের পর চা খাওয়া আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস । শিরীন চা বানিয়ে এনেছে । আমি হিসাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সে আর বিরক্ত করেনি ।

তিন.

আমার ঠিকাদারি ব্যবসা বাড়ছে । পল্লী বিদ্যুৎ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি রোডস এন্ড হাইওয়েজের কাজে হাত দিয়েছি । এখন টাকার চেয়ে ব্যস্ততা বেশি দরকার । শিরীনও তার উন্নয়ন কাজ আর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত । ইলেকশনের এখনো বাকি আছে । কিন্তু শিরীন খুব হিসেবী মেয়ে । শিরীনের এজমার সমস্যাটা দীর্ঘদিনের । কয়েকবার শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে । গত দুই তিনমাস ধরে তার চোখের নিচে কালো দাগ দেখে আমার মায়া হলো । রাতে খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম ” তোমার শরীরটা মনে হয় বেশ খারাপ ? ” এই বিষয়ে কথা বলতে শিরীন কখনো স্বাচ্ছন্দ বোধ করেনা । আজ প্রথম ম্লান হেসে বললো “যাক, তোমার নজরে পড়েছে শেষ পর্যন্ত ?” আমার ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে সেদিনের ঘটনাটা জানিয়ে দিই । আমরা কি ক্রমশ রোবটে পরিনত হয়ে যাচ্ছি ? ওই ঘটনার পর বিগত দুইমাসে আমরা তিনবার ঘনিষ্ঠ হয়েছি । সবকিছুর পরও আমি শিরীনকে উপেক্ষা করতে পারিনি । বড় বিচিত্র মানুষের স্বভাব । তারচেয়েও বিচিত্র বোধহয় ইন্দ্রিয় আসক্তি । এই আসক্তির কাছে পারষ্পরিক মান অভিমান, অপমান ঘৃণা বাণের জলে খুড় খুটো ভেসে যাওয়ার মতো প্রতিশোধ স্পৃহা কিংবা অবদমন ভেসে যায় । একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম “একবার ইন্ডিয়া থেকে ট্রিটমেন্ট করিয়ে দেখি । দুইদিন পর মাঝরাতে হঠাৎ তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেল । ইনহেলার শেষ হয়ে যাওয়ায় শিরীন পাগলের মতো আচরণ শুরু করেছে । হিক হিক শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেলাম আমি । উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডাক্তার ভদ্রলোককেও ফোন করলাম । গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল । রাতে ডিজেল ভরতে গিয়ে ভুলে গেছি । কারটা গ্যাসে চলে কিন্তু দু’দিন আগে মেকানিকের কাছে দিয়েছি । ইঞ্জিনে কাজ করতে হবে । ভাগ্য ভালো উপজেলার এম্বুলেন্স পেয়ে গেলাম । শিরীন কিছুটা সুস্থ বোধ করায় এই ফাঁকে এককাপ চা খেয়ে নিয়েছি । শিরীনকেও দিয়েছি ।
চা খেলে যদি একটু আরাম হয় । রাত দুটোর দিকে শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম । ডাক্তার নিজে আসতে চেয়েছিলেন । কিন্তু এর আগেও ভদ্রলোককে কয়েকবার কষ্ট দিয়েছি । নেবুলাইজ করার পরও ওনার ভাঁজ করা ভ্রু দেখে আমার একটু ভয় হলো । প্রয়োজনে অক্সিজেন দেওয়া দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি । এসব ছোটখাটো বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার ।
বাইরে তুমুল বৃষ্টি । ড্রাইভার বাধ্য হয়ে ধীরে চালাচ্ছে । ওয়াইপার ঠিকমতো কাজ করছেনা । আমি শিরীনের হাত ধরে বসে আছি । সে চোখের ইশারায় আমাকে কাছে ডাকলো । আমি অভয় দিয়ে হেসে মাথাটা এগিয়ে দিলাম ।

শিরীন ফিসফিস করে বললো “বাঁধের কাজে ইনভেস্টিগেশন নিয়ে কোন চিন্তা করোনা, আমাকে অনেক নিচে নামতে হয়েছে তবু আমি ম্যানেজ করে ফেলেছি । তোমার পাশ করাটা জরুরি । আমাদের অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে । ” এটুকু বলেই সে হাঁপিয়ে উঠেছে । আরো কিছু বলতে গেলে আমি হেসে বললাম “এখন এসব নিয়ে ভাবনার দরকার নেই । আগে তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো । ” বাঁধের কাজে এবার একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে । পাউবোর কাজে এই এক সুবিধা । কাজটা পানির নিচে বিধায় কারো চোখে পড়ে না । কিন্তু এবার আগাম বৈশাখী ঝড়ে বেশ এলোমেলো হয়ে গেছে । পত্রপত্রিকা একটু বেশি বাড়াবাড়ি করায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে খবরটা চলে গেছে । দুই একবার বোরো ধান ডুবে গেলে এমনকি আসে যায় ? দুই তিনশো কোটি টাকার ক্ষতিকে পত্রিকা বাড়িয়ে হাজার কোটি টাকা লিখেছে । অফিসে অবশ্য বেশ কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়ে গেছে । আমার বিল পাওনা ছিল । এবার আগাম তুলে নিয়েছি । এসব নতুন কিছুনা । যখন হাসপাতালে পৌঁছলাম, ততোক্ষণে দেরি হয়ে গেছে । শিরীনের নিস্তেজ চোখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়নি আমার । অক্সিজেন সাপ্লাইটা আবার চালু করে দিয়েছি । বাঁধের কাজের ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার খবরটা আরো আগে জানালেও বোধহয় তার ভাগ্যের হেরফের হতো না । প্রবল বৃষ্টিতে তার মাথার নিচের নরম বালিশটা যখন নাকের উপর সামান্য সময়ের জন্য চেপে ধরেছিলাম, শিরীন বিস্ময়ের সাথে হা করে তাকিয়ে থাকায় সুবিধাই হয়েছে । হাত দিয়ে ঠেকাতে চেয়েছে, তার দুর্বল ফুসফুসের সেই শক্তি অবশিষ্ট ছিলনা । তার শরীরের উপর উপুড় হয়ে থাকায় পা নাড়তে পারেনি । উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেবুলাইজ করার সময় অক্সিজেন দিতে ভুল করে ফেলেছিল নার্স মেয়েটা । ডাক্তারের ভ্রু কুচকে ওঠায় কার্ডিয়াক এরেস্টের লক্ষণ টের পেয়েছিলাম আমি । তখন শিরীনের নেবুলাইজেশনের বদলে অক্সিজেনের প্রয়োজন ছিল । বালিশটা মিনিট দুয়েকের বেশি সময় নেয়নি । মৃত্যুর আতংকের চেয়ে বিস্ময়ের ধাক্কা বেশি প্রয়োজন ছিল তার । আমি সেটা ভালোই দিতে পেরেছি । ড্রাইভার টের পায়নি । ঘন ঘন উননশিল্ড মোছার ব্যস্ততায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছি । বাড়ির ইনহেলার আগেই খালি করে রেখেছিলাম । দামি গাড়িটার ডিজেল শেষ হয়ে গেলেও ফিলিং স্টেশনে দেরি হবে বলে ড্রাইভারকে পরদিন ডিজেল কিনতে বলেছিলাম । সেই সুযোগে ড্রাইভার ছুটি চাইলে বিরক্ত হলেও নিষেধ করিনি । নিখুঁত প্ল্যান ছিল । এছাড়া আর কী করতে পারতাম আমি ? যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি, পর পুরুষের সাথে তাকে দেখার পর মনমানসিকতা ঠিক থাকার কথা না আমার । আর ঠিকাদারি লাইনে দুই নাম্বারি শুরু থেকেই করে এসেছি । শিরীন না জানলেও সবাই জানে এসব শিরীনের ইশারাতেই হচ্ছে । রাতারাতি বড়লোক হলেও আমার ভেতর প্রেমিকের অহং ছিল । শিরীনেরও সেটা থাকা উচিৎ ছিল । বাঁধের কাজে গাফিলতির জন্য নাহয় আমার লাইসেন্স বাতিল হতো । এরচেয়ে বেশি আজ পর্যন্ত কারো কিছু হয়নি । কিন্তু শিরীন বাংলা ফিল্মের নায়িকার মতো ছেলেমানুষী করায় আমার মাথা খারাপ করে দিয়েছিল । যদিও নিজের বেলা এসবে আমার জন্য তেমন অরুচি হয়নি । আলো এবং অন্ধকারে অনেক দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য অলিগলি থাকে । সেই অলিগলি পেরিয়ে খ্যাতির শিখরে উঠতে হয় ।

চার.

ক্লিনিকের ডাক্তার নার্স অনেক চেষ্টা করেছে । একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে তাঁরা কল দিয়েছিল । ভদ্রলোক পালস আর চোখ দেখে দু’দিকে মাথা নাড়লেন । শ্বাসকষ্ট নয়, ম্যাসিভ হার্ট এটাক ছিল । আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে যথাসম্ভব মৃদু কন্ঠে বললেন ; আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন । পেশেন্ট কামব্যাক করলেও প্যারালাইজড হয়ে থাকতে হতো । লাঙসেও বোধহয় পানি ছিল । ক্লিনিক থেকে সমস্ত ফর্মালিটিস সেরে প্রায় ভোরের দিকে ফিরে এলাম । বাড়িতে ভোরের বেলায় এতো মানুষের ভিড় দেখে শিরীনের জনপ্রিয়তায় একটু অবাক হলাম । শিরীনের চেহলামে জেলা পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত হয়েছেন । কেন্দ্র থেকে তরুণ এক নেতা উপস্থিত হওয়ায় এলাকার মানুষ শিরীনকে নতুন করে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি দোয়া করলো । গ্রামের কেউ বাদ পড়েননি । আমার বেশ কিছু টাকা বেরিয়ে গেলেও সেদিকে কার্পণ্য করিনি । প্রিয় মানুষতো একবারই মরে । তরুণ ছেলেদের নিষেধ করা সত্বেও তারা কেন্দ্রীয় এবং জেলা নেতৃত্বের কাছে আমার নমিনেশনের প্রসঙ্গ তোলায় কয়েকটাকে বের করে দিয়েছি । নেতারাই তাদের স্নেহের সুরে আবার ডেকে এনে ধমক দিয়ে আমাকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করলেন । ছেলেগুলো প্রচুর খাটুনির সাথে বেশ টাকা পেয়েছে বলে আমার রাগ ধরে রাখা সম্ভব হলোনা । তারউপর আমার ভালোবাসার স্ত্রীর চেহলাম বলে কথা । সবকিছু ভালোয় ভালোয় শেষ হওয়ার পর সহসা নিজেকে একটু একা মনে হলো । তবে আমার সামনে অনেক কাজ পড়ে থাকায় মন খারাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা । আমার আপত্তি স্বত্তেও এলাকাবাসীর দাবির মুখে আমাকে উপজেলা চেয়ারম্যানের নমিনেশন জমা দিতে হয়েছিল । শিরীনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বাকি তিনজন নমিনেশন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় আমি বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে শপথ নিয়েছি । আমাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিরীনের স্মৃতিচারণ করায় অনেকের চোখ ভিজে এলো । উপজেলার বিশিষ্ট ভদ্রলোক নিজেও বিশুদ্ধ ভাষায় শিরীনের অসম্পূর্ণ কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ওনার সকল সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন । আমি বুঝতে পারছিলাম না উনি আমাকে কীভাবে সহযোগিতা করবেন ? সেদিন দরজাটা লাগানোর সময় মৃদু শব্দে শিরীন তাদের কাজটা অসমাপ্ত রেখে দ্রুত নিজেকে আড়াল করতে চেয়েছিল । আমি বেশি ধীরস্থিরে দরজা লাগাতে গিয়ে বেচারিকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিলেও দরজার আড়ালে যে আমি ছিলাম, শিরীন বোধহয় টের পায়নি । ভদ্রলোকের বক্তৃতার ফাঁকে ঝুমার দিকে তাকালাম । ভাইসচেয়ারম্যান পদে মেয়েটা মোটামুটি লড়াই করে জিতে এসেছে । সম্ভবত আমার দৃষ্টি টের পেয়ে সেও তাকাল । সুন্দর মেয়েটার চোখেমুখে মুগ্ধতার সাথে একটু আধটু জড়তা । তার পাশ করার পেছনে আমার অবদান সে জানে । আমি চোখ অল্প বন্ধ করে মাথা ঝাঁকিয়ে আশ্বস্ত করলাম । কি যে বুঝলো সে কে জানে ? সুন্দর মুখটা অকারণ লজ্জায় একটু রাঙা হলো । সহসা টের পেলাম আমাকে আগামীতে অনেক বিষয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে । খ্যাতি আর অর্থের মোহে আমি অনেক আগেই আচ্ছন্ন ছিলাম । ঠিকাদার হিসেবে সফল হয়েছি, এবার উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে আমি নূর হোসেন নতুন জীবনটা উপভোগ করার কল্পনা করে পুলকিত বোধ করছি ।

-কামরান চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published.