একটা ফাগুন ও একটা বিষণ্ণ দুপুর।

ফাগুন এসেছে আবার
কেবল তুমি আসোনি
অনেক বেলা বয়ে যায়
শুধু তুমি ভালোবাসোনি!

বাড়ীর পাশেই শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত দীঘি। অসংখ্য স্মৃতি এই দীঘিকে ঘিরে। অনেকদিন পর আজ এখানে দীঘির ঘাটে এসে বসলাম। ফাগুনের দুপুরের কড়া রোদে আশে পাশে নিশ্চুপ। শুধু মাথার উপরে দীঘির পাড়ে কয়েকটা নারিকেল গাছ নিঃস্বার্থভাবে ছায়া দিয়ে যাচ্ছে আমাকে। চারিদিকে নিরব নিস্তব্ধ, তবু ও দীঘির জলে মনে হয় কে যেনো ঢিল ছুড়েছে। আশে পাশে থাকাই কেউ নেই, মনে হয় কেউ অজান্তে আমাকে দেখছে।
দেখুক তবে।

একটা সময় ছিলো এখানে রোজ বসতাম, ভালো লাগা, মন্দ লাগার অসংখ্য সাক্ষী এই পুকুর ঘাট। কত আড্ডা আর আনন্দে কেটেছে মুনার সাথে। শৈশবের দিনগুলোতে মুনা ছিলো আমার কাজিন, বন্ধু, কিংবা তার চেয়ে বেশি। কোন সম্পর্ক দিয়ে ওকে আটকানো যাবে না। অনেক দিন হলো মুনার সাথে এই জায়গায় বসা হয়নি, খুনসুঁটিতে মেতে উঠা হয়নি, মুনাকে হাজারটা উল্টা কথা বলে রাগানো হয়নি কতো বসন্ত।
এই পুকুরে সাঁতার কাটার প্রতিযোগিতা হতো দুজনের মধ্যে। ইচ্ছে করে ওর হাসি দেখতে আমি হেরে যাবার অভিনয় করতাম। অসংখ্য স্মৃতি আমাকে নষ্টালজিক করে দিচ্ছে।

আজ বড্ড একাকিত্বে ভুগছে এই জায়গাটা ঠিক আমার মতোই। মানুষের জীবন যেমন একটা চক্র, একটা নিয়মের মাঝেই বন্দি হয়ে আছে। এখানে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলেই নির্ঘাত পতন। মানুষ চাইলেই এই নিয়ম থেকে বাইরে গিয়ে আপন আলোয়ে, আপন মনের ইচ্ছেয় কিছুই করতে পারে না। অথচ এই নিয়মে থাকতে থাকতে কোন কোন মানুষের জীবন কাঁচের মতোই কয়েক টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আশে পাশে।
আমি জানি না মুনা কোন নিয়মের বেড়াজালে বন্দি ছিলো? কি এত কষ্ট, অভিমান ছিলো তার।

আশে পাশে কোথাও মুনা নেই। অভিমানে অনেক দূরে চলে গেছে। যদি একটিবার পেতাম তবে জিজ্ঞেস করতাম এত অভিমান কি ছিলো তার? এত কাছের প্রিয় বন্ধুকে কেন সব অভিমান কিংবা কষ্টের কথা বলে যেতে পারলো না।

তাই মুনাকে ছাড়া এতোসব নিয়মের মাঝে আমার থাকতে মন চায় না। সবকিছু ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেতে ইচ্ছে হয়। যেখানে কোন পিছুটান নেই, কোন উদ্বেগ নেই। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভিজি না, ছুঁয়ে দেখি না বৃষ্টির ফোঁটা, জোৎস্না সেতো সূদূর পরাহুত। অনেক অনেক জমানো ব্যথা আজকাল কাউকে বলতে পারি না।

ফাগুন এসেছে, বসন্তের আগমনী বার্তায় মুখরিত সব। গাছে গাছে ফুল ফুটেছে, অথচ আমি এখনো রঙ হীন। মুনাকে আজ ভীষণ মনপড়ছে | ওর স্মৃতি ভীষণ রকম একা করে দিচ্ছে দিনের পর দিন |

অনেক নির্ঘুম রাত কাটাই। রাত জেগে জেগে কাউকে বলা হয়নি কান্নার কারণ, কাউকে বলা হয়নি নিঃশব্দ বেদনায় বুকের ভেতর উথাল পাথাল করা কষ্টের কথা। বসন্ত আসে বসন্ত যায়, আমার কষ্ট আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
চুপচাপ এখনো দীঘির ঘাটে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো পুকুরের মাঝখানে সুন্দর একটা নৌকা সাজানো ফুলে ফুলে। মুনা বসে সেই আগের মতোই হাসছে। কারণ ছাড়া ও মাঝে মাঝে হাসতো, জিজ্ঞেস করলেই বলতো এমনি হাসি, ইচ্ছে হলো তাই।
মুনা আমাকে হাত ইশারায় ডাকছে।
আমি তবুও নিস্তব্ধ। বুঝে উঠার চেষ্টা করছিলাম, সে মুনা কিনা। হ্যা মুনা-ই তো।
এবার মুনার চিৎকার, আমি কি একাই বসে থাকবো। তুই আসবি না। প্লিজ আয় না।
এবার আর মন মানলো না। আসছি মুনা বলেই যেই না পুকুরে হাঁটু পানি পর্যন্ত নামলাম দেখি পেছন থেকে বড় আপা ডাকছে, এই ভর দুপুরে পানিতে কি করিস নিলয় ?

আপু মুনা এসেছে। ঐ দেখো, পুকুরের মাঝে, আমাকে ডাকছে।

কই? আমিতো দেখি না।

আমি আবার তাকাই, দেখি কেউ নেই। মুনা কিংবা নৌকা কোনটাই নেই। মনে হলো একটা ঘোরের মাঝেই ছিলাম। অবচেতন মন চলে গেছে কোথায়, নিজেই টের পাইনি।
অথচ মুনা মারা যাওয়ার কত বসন্তই চলে গেছে।
এই পুকুরে একদিন সকালে মুনার লাশ পাওয়া যায়। আমি তখন দেশের বাইরে চলে এসেছিলাম। একদিন শুনি, মুনা চলে গেছে সবাইকে কাঁদিয়ে। মুনাকে রুমে সকালে না পেয়ে অনেক সন্ধানের পর এই দীঘিতে তার লাশ পাওয়া যায়। সে আত্মহত্যা করেছে নাকি কেউ হত্যা করে ফেলে দিয়েছে তার আলামত কিংবা রহস্যের সমাধান আজ পর্যন্ত হয়নি।
তারপর থেকে ভর দুপুরে এখানে কেউ এসে বসে না। বসলে ও নানান ভৌতিক ঘটনায় অনেকে ভয় পায়। মুনার প্রেত্মাতা নাকি এখানে ঘুরে বেড়ায়।
মুখে কয়েকটা ফোঁটা দীঘির পানি ছিটিয়ে মন খারাপের দুপুর শেষ করে রুমের দিকে রওয়ানা দিলাম।

মন খারাপের বারান্দার একটু হিমেল বাতাসের স্পর্শ পাচ্ছি ফাগুনের আগমনে। মুনা থাকলে নিশ্চয় এই বসন্ত অন্যরকম সুন্দর ভাবে আসতো।

-নিলয় আহমেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.