একটা নাকফুলের গল্প( ৩য় পর্ব )

আমি আমার বাগদানের দিন ভোরে পালিয়ে শিমুলের মেসে চলে যাই। আমার মা বাবা আর মামা মামির ঠিক করা পাত্রের সাথে বাগদানের অনুষ্ঠান ছিল সেদিন বিকেলে। আগের রাতে মাত্র জানানো হয়েছিল আমাকে। শুনেই আমার মাথায় রাগ চেপে গিয়েছিল। কারণ শিমুলের ব্যাপারটা জানার পরও কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই এক বিলেতফেরত ইঞ্জিনিয়ারের সাথে বিয়ের কথা পাকা করে ফেলেছিল! সারারাত না ঘুমিয়ে খুব ভোরের দিকে মামার বাসা থেকে বের হয়ে এসেছিলাম আমি। এক কাপড়ে শিমুলের মেসে এসে উঠেছিলাম। আমার পরনে ছিল শাদাকালো সূতোর কাজ করা একসেট জামা আর হাতের ছোট্ট পার্সে মাত্র দুইশত আশি টাকা। শিমুল আমাকে দেখে ভয়ে অসাড় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেইসময় ওর ভয়পাওয়া চোখেমুখে আমি একটা খুশির ছায়া দেখতে পেয়েছিলাম! কেমন যেন একটা তৃপ্তিদায়ক ভয় বা ভয় মাখানো তৃপ্তি!! সেই সময়টাতে শিমুলের চোখে মুখে আমি কি যে এক অদ্ভুত একটা জিনিস দেখেছিলাম, ঠিক কিভাবে সেই জিনিসটাকে বর্ণনা করব বুঝতে পারছিনা। কিছু কিছু মুহূর্তের বর্ণনা দেবার ক্ষমতা আমাদের হাতে দেয়া হয়নি। সৃষ্টিকর্তা হয়ত মনে করেন যে, কিছু মুহূর্ত অবর্ণনীয় হবার মতই সুন্দর হওয়া জরুরী জীবনে!!

শিমুলের সাথে আমার প্রেমের বিষয়টা বাবা মা মেনে নিতে পারেনি। তাদের মতে, সে ছেলে হিসেবে ভাল হলেও পাত্র হিসেবে কোন দিক দিয়েই আমার যোগ্য না!! আমি ওর কথা বাসায় বলার পরেই মামা লোক পাঠিয়ে ওদের বাড়িঘর আর জমিজমার খোঁজ নিয়েছে। মামা, বাবা একেবারেই মেনে নিতে পারেনি আমার জন্য এমন নিন্মমধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবার। বাবা শিমুলের চাকুরীর পজিশন আর বেতনের অংক নিয়ে ভীষণ রকমের হতাশ হয়েছিল। সবাই চেয়েছিল আমি যাতে নির্ঝন্ঝাট এবং স্বচ্ছল একটা পরিবারের ছেলেকে বিয়ে করে সুখী হই! সেই হিসেবে শিমুলদের টানাটানির বিশাল সংসারটি সবাইকে হতাশই করেছিল নিঃসন্দেহে। কেউ বুঝতে বা জানতে পারেনি, আমার জন্য সবকিছুই আছে সবার চোখে সেই অর্থবিত্তহীন পরিবারে! হয়তবা কেউ ইচ্ছে করেই জানতে চায়নি!!

মামার বাসা থেকে বের হবার সময় সবাইকে উদ্দেশ্য করে আমি একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছি। চিঠিতে আমি অল্প কথায় লিখেছি, “বিধ্বস্ত পরিবার বা ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাগুলোর মনের অবস্থা কি হয় তা আমার চেয়ে কেউ বেশি কোনদিন বুঝতে পারবে বলে আমার মনে হয়না”।
আমি আরো লিখেছি, “আমি আমার তেইশ বছরের জীবনে প্রথম কাউকে পেয়েছি, যে শূন্যহাতে কিন্তু চোখভরা ভালবাসার সাগর নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে! আমার তেমনি একজন দরকার। আমার অনুভূতির আকাশ এখন ভালবাসার মেঘে পরিপূর্ণ!! অর্থবিত্ত আর দিনের পর দিন স্বচ্ছল একাকীত্বে আমি ক্লান্ত, বিপর্যস্ত! তোমরা আমাকে খুঁজে অযথা সময় নষ্ট করোনা প্লিজ। আমি তোমাদের সবাইকে দীর্ঘজীবন ধরে টানতে থাকা “অস্বস্থিকর এক ভালবাসার যন্ত্রণা” থেকে মুক্তি দিলাম। আমাকে আমার মত বাঁচতে দাও”। সেদিন একটা শাদাকালো সূতোর কাজ করা আটপৌরে জামা পরা অবস্থায় আমি শিমুলের বউ হয়েছিলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ক্ষণটি ছিল ভ্যাপসা গরম আর চিটচিটে ঘামে ভেজা মধ্য শ্রাবণের সেই দুপুরটি। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনটিতেও আমার চোখে বার বার জল এসেছিল!! সেই জলটুকুই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে দামী মুহূর্তের দামী উপহার!! শিমুলের সাথে কবুল বলার পর একটানা একঘণ্টা আমি ওর হাত ধরে রেখেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, এই হাত ছাড়বনা। এই হাত ছেড়ে দেয়াটা ঠিক হবেনা আমার। একদম না। একদমই না। কিন্তু ছাড়তে হয়েছিল। কারণ, শিমুলের হাত ব্যাথায় টনটন করছিল। সে একসময় বলে উঠল, “এবার তো ছাড়! আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি তোমাকে ছেড়ে”!! হাত ছেড়ে দেবার পর শিমুল কাঁপা কাঁপা হাতে তাঁর পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা ছোট্ট বক্স বের করেছিল। লাল টুকটুকে ছোট্ট একটা চারকোনা বক্স। আমার অবাক আর প্রশ্নে ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হতে হতে সে বলেছিল, “অনেকদিন ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে তোমার জন্য একটা সাত পাথরের নাকফুল কিনেছি প্রিতু। ছোট্ট একটা নাকফুল। এরচেয়ে বেশি কিছু দেবার মত সামর্থ্য এইমুহূর্তে আমার নাই প্রিতু। তোমার সাথে আমার বিয়ে নাহলেও আমি এটা তোমাকে উপহার হিসেবে দিতাম। হয়ত তখন তুমি পরতেনা। অন্যকারো বউ হলে নাকি স্বামীর দেয়া নাকফুলই পরতে হয়। তবুও আমি ভেবে নিতাম তোমার নাকে পাথরগুলি বসে আছে রাজ্যের আলো বুকে নিয়ে। আমার চোখে যখনি তোমার মুখটা ভাসতো, আমি কল্পনায় দেখে নিতাম, সাতটি পাথর তোমার আলোতে আলোকিত হয়ে আছে”!! আমি ঝাপসা চোখে তখন দেখছিলাম, আমার সারাজীবনের ভালবাসা ভর্তি লাল টুকটুকে ছোট্ট একটা বক্স হাতে নিয়ে আমার ভালবাসার মানুষটি আমারই সামনে দাঁড়িয়ে আছে!! ছোট্ট একটা সাত পাথরের নাকফুল। আমার কেন জানি মানতে মন চায়না, মনের সাথে সবসময় চোখের জলের সংযোগ হয়!! কখনো কখনো মন হাসলেও চোখ ভরে জল আসে!!
শিমুল যখন নিজের হাতে আমাকে সেই নাকফুলটা পড়িয়ে দিচ্ছিলো, তখন আমার মুখে হাসি থাকলেও দুই চোখ থেকে ঝরঝর করে জল ঝরছিল!

কি অদ্ভুত না! চোখের জল আর মুখের হাসিতে সেদিন শিমুলের কাঁপা হাতের নাকফুল পরে আমার জীবনের নতুন একটা গল্প শুরু হয়েছিল। আমার জীবনের নাকফুলের গল্প।

-তাসলিমা শাম্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.