একজন খারাপ মানুষের গল্প

নুরুল হক সাহেবের বয়স পঁয়তাল্লিশ। স্ত্রী রাহেলা আর তিন সন্তানকে নিয়ে বেশ গুছিয়ে সংসার করেন। তার সবচেয়ে বড় গুন তিনি অত্যন্ত সৎ। অফিস শেষে বাসায় ফিরে সন্তানদের সময় দেন এবং রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন স্ত্রীর সাথে সারাদিনের ঘটনাবলি আলোচনা করে। প্রচন্ড আত্নবিশ্বাসী এই ব্যক্তিটি হঠাৎ করেই পড়লেন এক ঝামেলায়। ফেসবুকে এক অপরিচিত মহিলা তাকে বেশ কিছুদিন ধরে নক করে আসছে। তিনি এগুলো স্বযতনে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু সেদিন কিছুটা কৌতুহল বশত মহিলার একাউন্ট ঘাটাঘাটি করে বুঝলেন মহিলা যথেষ্ট সুন্দরী। রাহেলার কথা মনে এলো তার। রাহেলা একসময় সুন্দরীই ছিলো। সে অবশ্য বেশ আগের কথা। আর এখন তো মুটিয়ে এমন অবস্থা যে নুরুল হক সাহেবকেই বয়সে ছোটো মনে হয়।মহিলার সৌন্দর্য ঠিক যেন রাহেলার যুবতী ব‍য়সের মতো না। কিছুটা চকচকে ধরনের। এধরনের কোন মহিলার সাথে নুরুল হক সাহেবের পরিচয়ের প্রশ্নই ওঠেনা। যুবক বয়সে পড়ালেখা শেষ করে জীবিকা আর পরিবার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে জগতের অন্য কোন দিকে নজর দেয়ার সময় পাননি। আজ কেন জানি তার নিজের জীবনটাকে বড্ড একঘেঁয়ে মনে হতে থাকে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মহিলাকে সামনা সামনি দেখবেন। এক সপ্তাহ পর নুরুল হক সাহেব আবিষ্কার করলেন তিনি আর আগের মত নেই। মহিলার সাথে দেখা হওয়ার পর তিনি জানতে পারলেন মহিলা শুধু দেখতেই আকর্ষণীয়া নন তার আচার আচরণ আর কথাবার্তায় কিসের যেন এক অমোঘ টান আছে। সেই টান থেকে বের হয়ে আসার ক্ষমতা নুরুল হক সাহেবদের নাই। তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একদিকে একুশ বছরের সংসার আর এক দিকে সদ্য সন্ধান পাওয়া এক রহস্যময়ী নারী। বোকা মানুষেরা সাধারনত এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়। নুরুল হক সাহেব নিজেকে বোকা ভাবতে রাজি নন। তিনি বরাবরই একজন সফল ব্যবস্থাপক। ব্যক্তিজীবনেও তিনি দুই কুল ম্যানেজ করে চলার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাসায় যেন কেউ কিছু বুঝতে না পারে তাই তিনি সব ব্যাপারেই এক্সট্রা কেয়ারফুল হয়ে গেলেন। রাহেলা হঠাৎ করে খেয়াল করলো তার হাজব্যান্ড অনেক বেশি কেয়ারিং হয়ে গিয়েছে। এখন অফিস পৌঁছেই বাসায় ফোন দেন নুরুল হক সাহেব। আগে অনেকবার বলেও এই অভ্যাসটি করাতে পারেনি রাহেলা। একটা মাত্র নিউজ দেখেই রিমোট দিয়ে দেন রাহেলাকে। এভাবে তিন চার মাস চলার পর নুরুল হক সাহেব বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন যে তিনি বাস্তব জীবনেও সফল ব্যবস্থাপক হয়ে উঠেছেন। তার সুখের জীবন এখন মধুময় হয়ে উঠেছে।মনে মনে নিজের প্রশংশা করলেন। কিছুটা অহংবোধও তৈরি হলো তার ভেতর নিজের বুদ্ধিমত্তার জন্য। নিজেকে তার অপরাধীতো দুরে থাক বরং এক সফল খেলোয়াড় মনে হতে লাগলো। এদিকে রাহেলা হাজব্যান্ডের এক্সট্রা কেয়ারিং এ আপ্লুত হয়ে নিজেও হাজব্যান্ডকে এক্সট্রা কেয়ার নেয়ার জন্য মনস্থির করলেন। আজ নুরুল হক সাহেব বাসায় ফিরেই দেখলেন রাহেলা সুন্দর করে শাড়ি পরে তার জন্য বসে আছে। অনান্য দিনের মত টেবিল এ চা খেতে বসে দেখেন চা এর সাথে তার প্রিয় গাজরের হালুয়া করেছে রাহেলা। একটা নিউজ শেষ করার পর রাহেলাকে রিমোট দিতে চাইলেও সে নেয়নি। তাকে আরেকটা নিউজ দেখতে বলেছে। কেমন জানি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল নুরুল হক সাহেবের কাছে। পরদিন অফিস এ পৌঁছানোর আগেই তিনবার ফোন দিয়ে খোজ নিল রাহেলা। নুরুল হক সাহেবের মনে হল তিনি তার অন্যায় ঢাকার জন্য এক্সট্রা কেয়ারিং শুরু করেছিলেন। তবে কি রাহেলাও কারো সাথে—— না না তিনি আর ভাবতে পারছেন না। তাদের এত দিনের সংসার আর রাহেলা তার সাথে এমন করলো! এবার তিনি বুঝতে পারলেন তিনি রাহেলার সাথে কতবড় অন্যায় করছেন। অস্থির হয়ে গেলেন নুরুল হক সাহেব। তাকে বের করতে হবে কে সেই ব্যক্তি। রাতে বাড়ি ফিরতেই রাহেলা তাকে বলল সে তো বেশ মুটিয়ে গেছে। বাসায় ফিরে মোটা বউ দেখতে কার ভালো লাগে তাই সে জিম এ ভর্তি হতে চায়। দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো নুরুল হক সাহেবের। আর কোন সন্দেহ নেই রাহেলা নিশ্চয়ই কারো প্রেমে পড়েছে। কে হতে পারে ভাবতেই প্রথম মাথায় এল ছোট মেয়েটার জন্য নতুন রাখা টিচারটির কথা। একেবারেই সদ্য পাশ করা ছেলেটি। এখন নাকি যুবক ছেলেদের প্রথম পছন্দ মধ্যবয়সী নারীরা। একেবারেই যাচ্ছেতাই। কালকেই হতচ্ছারা ব্যাটাকে বিদায় করতে হবে। উহহহফ অসহ্য টেনশনে ঘুমাতে পারলেন না নুরুল হক সাহেব। সকালে অফিস এ পৌঁছে ফোন দিলেন রাহেলাকে। ফোন ওয়েটিং এ। আর সহ্য হলোনা। ইম্পর্টেন্ট মিটিং ফেলে ছুটলেন মোবাইল ফোনের কাস্টমার কেয়ার এ। বের করলেন কল লগ। নাহ সব ই তো স্বাভাবিক। সব নাম্বার ই তার পরিচিত। ৪-৫ দিন চলল গোয়েন্দাগিরি। কোন কিছুই নেই যা তার সন্দেহকে সত্য প্রমান করবে। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলেন নুরুল হক সাহেব। কিছুক্ষন পর পুরো ব্যাপারটিই তার কাছে পরিস্কার হয়ে গেল। রাহেলা যা করেছে তার সবই ছিল তার জন্য। কিন্তু তিনি নিজে যেহেতু অপরাধী তাই রাহেলার ভালো কাজগুলোও তার কাছে ভালো মনে হয়নি। তিনি আরোও বুঝে গেলেন তিনি একজন খারাপ মানুষ এ পরিনত হয়েছেন। ভালোকে উপভোগ করার ক্ষমতা তিনি হারিয়েছেন। খারাপ মানুষ ভালো কিছু উপভোগ করতে পারেনা। তার উপভোগের জন্য লাগে খারাপ কিছু।

-রুমেন আহমেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.