উত্তরাধিকার (৮ম পর্ব)

ঈদের ছুটিতে রিয়াদের বাসায় আবার মেলা বসে, সুখের মেলা। পরিবারের প্রতিটি সদস্য উপভোগ করে আনন্দের নির্যাসটুকু। বাড়ি ভর্তি কাজের লোক। বাচ্চাদের সামলানোতে কোন সমস্যা নেই। দুই ভাই বোনের তুলনায় অট্টালিকা বলা যায়। তার মায়ের জন্য দোতলায় নির্ধারিত দুটো কক্ষ। একটিতে সুপয়া থাকেন, অপরটিতে রয়েছে হালকা ব্যায়ামের আসবাবসহ বেশ করেকটি বইয়ের আলমারি। বইগুলো তার জীবনের আরেকটা অংশ। এগুলো তার স্বামীর স্মৃতি। নিচতলায় তাদের বিশাল ড্রইংরুম। সেখানে জমজমাট আড্ডার আয়োজন হচ্ছে। যথারীতি আড্ডার মধ্যমনি রিয়াদের মা।

সুপয়ার একপাশে বসেছে রিশা, অন্যপাশে রিয়া। ঈদের দিন সবাই ব্যস্ত ছিল নিজের বাসায়। যেহেতু রিয়াদ ব্যতীত সবাই আমলা। তাদের ঈদের দিন অন্যরকম ব্যস্ততা থাকে। পরদিন নাস্তার টেবিলে রিশা উপস্থিত হয়। সুপয়া প্রাণভরে উপভোগ করেছেন নাতি নাতনীর সঙ্গ। রিয়া সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে রিশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– আপু, আমি নুরার একান্ত সহযোগী বদুকে আমার অফিসে তুলে এনেছিলাম।
রিয়াদ ফোড়ন কাটে।
– আপু, ক্ষমতা থাকলে মানুষ কতকিছু করে।
সুপয়া ছেলেকে ধমক দেয়,
– তুই থাম, খালি আছে মেয়েটার পেছনে লাগতে।
রিশা এবার চুপ করে থাকে না।

হ্যাঁ মা, অবলা মেয়ে তো। তোমার ছেলের খাটের নিচে খুঁজলে পুলিশের রোল টোল পাওয়া যেতে পারে।

রিয়া কপট রাগ করে উত্তর দেয়।
– মা, তুমি না থাকলে আমি এ সংসারে দুদন্ড টিকার উপায় ছিল। আপু ননদ হলে যে কি হতো!!

অত্যন্ত সিরিয়াস আলোচনা মোড় নেয় রসিকতায়। লাগাম টেনে ধরে রিশার স্বামী শোভন।
– রিয়া, বদুর কাছে থেকে কিছু পেলে?

রিয়াদ আবার ফোঁড়ন কাটে।
– আচ্ছা মতো ধোলাই দিয়েছ নাকি?
রিশা এবার ধমক দেয়,
– তুই কথা বলবি না। চুপ করে বসে থাক।
– তোমার পাশে এসে বসি।
– না না, তুই যেখানে আছিস সেখানেই থাক। রিয়া তুমি বলতে থাক।
রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুলে বলে। রিয়াদ সুযোগ ছাড়তে নারাজ।
– আপু, কি মেয়ের সাথে বিয়ে দিলে, আমাকে ফতুর করে ছাড়বে।
শোভন এবার সুযোগ নেয়,
– ব্যবসায়ী মানুষ তো হজম হতে সময় লাগবে।
রিশা সবাইকে আলোচনায় ফেরাতে চেষ্টা করে।
– কি শুরু করলে তোমরা?
রিয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– এরপর উল্টাপাল্টা কথা বললে গাধার কান টেনে লম্বা করে ফেলব।
রিয়াদ রিয়াকে ঝাকুনি দিয়ে বলে,
– অ বউ শুনেছো, তোমার স্বামীর কান টেনে লম্বা করবে। তোমার বন্দুক কই?
সুপয়া এবার শোভনকে বলে,
– বাবা, দুটোকে বের করে দাও।

শোভন রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– আচ্ছা রিয়া, জাল দলিল সম্পর্কে কিছু জানতে পারলে?
– জী না ভাইয়া। লোকটি ভয়ে দিশেহারা ছিল। আমার মনে হয় পুলিশ হেড কোয়ার্টারে এসে তার মাথা ঠিক ছিল না। আমি চিন্তা করছি নুরাকে একদিন তুলে আনলে কেমন হয়?
– মন্দ বলো নি। কিন্তু তুমি দেখা করতে পারবে না।
– তাহলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ কে করবে? কোন এসআইকে দিয়ে করাব?
– না, ওরা সবকিছু গুলবেট করে ফেলে মাঝে মাঝে। তোমার কোন ব্যাচমেটকে কাজে লাগাতে পার।
রিশা ফোঁড়ন কাটে।
– মা, তোমার জামাই আর বউমা সব আলোচনা করছে। আমরা বাইরের মানুষ। চল রিয়াদ, আমরা ছাদে যাই।
রিয়া কপট ধমক দেয়,
– তোমাদের সাহস তো কম নয়, একজন ডিসি এবং এডিশনাল এসপির কথার মাঝে বাগড়া দাও। পুলিশ ডাকব কিন্তু। বসে বসে কথা শোন।
সুপয়া এবার খুশি হয়।
– বাঁদর দুটোকে হাতকরা লাগিয়ে বসিয়ে রাখ মা, আমাকে সারাটা জীবন জ্বালিয়েছে।

রিয়াদ বলে,
– ভাইয়া আমি নুরাকে একসপ্তাহ সময় দিয়ে ছিলাম। সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এবার তাকে খবর দেই। দেখি আমার আলোচনা কতটুকু এগোয়।
শোভন সায় দেয়।
– রিয়াদ মন্দ বলে নি। লোভের জাল থেকে নুরা বেরিয়ে আসতে পারবে না। তবে তুমি তাকে এবার আমাদের চাহিদামতো জমি কিনার প্রস্তাব দাও।
– ভাইয়া, ঐটা একটা হাড়ে হারামী। তাকে ভয় দেখিয়ে আয়ত্বে না এনে নিলে, তার চাহিদা মেটানো মুশকিল হবে।
– এটা অবশ্য ঠিক বলেছ।
রিশা ফ্লোর নেয়,
– তোমরা যে যাই বলো, আব্বুর জমিতে কলেজের কোন না কোন ভবন করতেই হবে।
শোভন জবাব দেয়,
– আব্বুর জমি তো এখন নিষ্কন্টক। তুমি যা ইচ্ছে করতে পার।
– কিন্তু শয়তানটা তো এখনো ঝামেলা করার ধান্ধায় আছে।
– এখন কি তার কোন ধান্ধা কাজে লাগবে?
শোভনের প্রশ্নের জবাবে রিয়াদ বলে,
– তোমাদের সাপোর্ট নিয়ে আমি শয়তানটার সাথে ইঁদুর বিড়াল খেলতে চেয়েছি। তোমরা আমাকে মজা থেকে বঞ্চিত করতে পার না। শয়তানটা আমার বাবার সামনে দাড়িয়ে কথা বলেছিল। আমি তাকে দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করাব। ভাইয়া, কিছু মনে করো না, আমি একটু সময় নিয়ে খেলি।
রিশা বলে,
– তোকে যে কোন সময় চিনে ফেলতে পারে।
– না আপু, আমি আরো সতর্ক থাকব।
রিয়া এবার বলে,
– শয়তানটা কোন ফাঁদ পাততে পারে।
রিয়াদ জবাব দেয়,
– আমি তোমাদের সাথে সব সময় সব কিছু শেয়ার করব।
শোভন বলে,
– ঠিক আছে, রিয়াদকে একটু সুযোগ দাও। তবে তুমি আবেগের বশে উত্তেজিত হয়ে কিছু করো না।
– প্রাণপ্রিয় দুলাভাই, আপনার কথা শিরধার্য।
দুলাভাই সম্মোধন শুনে শোভন তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে।
– চলো একটু ছাদে যাই নির্মল বাতাসে শ্বাস নিয়ে আসি।

রিয়া এবার উঠে দাড়ায়।
– দুলাভাই, ঈদ সেলিব্রেশন বাকি রয়েছে এখনো। আপনি আমাদের এখনো সালামী দেন নি। রিয়াদ, তোমার প্রস্তাব পেশ করো।
– আজ আমরা সবাই মিলে বাইরে রাতের খাবার খাব। সব খরচ আমার দুলাভাই দেবে।
রিশা পক্ষ অবলম্বন করতে চেষ্টা করে।
– আমরা চাকরি করে খাই। তুই ব্যবসায়ী। ব্যয়ভার তোর উপরই থাক।
রিয়া ফোঁড়ন কাটে,
– আপু, আজকের সভার সমাপ্তি সহ সিদ্ধান্ত দেবেন আজকের সভার সভাপতি মা।
সুপয়া নড়েচড়ে বসে।
– আমাকে নিয়ে টানাটানি কেন রিয়া? তোমরা নিজেরা ঠিক করে নাও। আমি ভাই বোনদের নিয়ে বাসায় মজা করি।
– না মা, তা হবে না। তোমাকেও যেতে হবে।
রিশার দিকে তাকিয়ে রিয়া বলে,
– আপু, চলো আমার রুমে যাই। আমাকে শাড়ি পড়িয়ে দেবে।
রিয়াদ টিপ্পনী কাটে।
– তাহলে তো আগামীকাল সকালের নাস্তা করতে হবে।
শোভনও একটু সুযোগ নেয়।
– আমার ভাগ্য ভালো মনে হচ্ছে।
রিশা ফিরে তাকিয়ে বলে,
– আমি কি শাড়ি না পড়ে যাব? জী না স্যার। আপনার কপাল এতো ভালো না।
– তাহলে কি তুমি আবার বাসায় যাবে?
– ওমা, এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি ডিসিগিরি করে এলে, তোমার শ্যালক শুধু একটা রুমই আমাদের জন্য সাজিয়ে রাখে নি। আমার জন্য শাড়ি কিনে রেখেছে। চাইলে তুমিও পাঞ্জাবী পড়ে নিতে পার।
রিয়া রিশা দোতলায় চলে যায়। সুপয়া উঠে পড়ে,
– বাবা, তোমরা দুজন কথা বলো। আমি ভাই বোনদের তৈরি করি।

নুরা পাগলের মতো হয়ে বদুর খোঁজ করে। বাজারে কোথাও তাকে পাচ্ছে না। এমনকি তার ফোনটিও বন্ধ। বদুকে ছাড়া তার বুদ্ধি জট পাকিয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় বদুকে ছাড়া সে অচল। বাজারে ঘুরাঘুরি করে তহশিল অফিসের দিকে না গিয়ে পুনরায় বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয় রিক্সা নিয়ে। বাড়ি এসে বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ গোছল করে। দুপুরের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে। সে রোজা খুব একটা রাখে না। রোজার সময় বাইরে কোথাও কিছু খায় না। অনেকেই জানে সে রোজা রাখে। আজান দিলে মসজিদে হাজির হয় যথা সময়ে। টুপিটা বেশিরভাগ সময় মাথায়ই থাকে। এটা একটা বেশ। খুব সহজেই মানুষকে বিমোহিত করতে পারে। তার বিরাট বড় বংশ। তারা অনেকগুলো ভাই। সবাই তাকে যমের মতো ভয় পায়। আপন ভাই ছাড়াও তার চাচাতো ভাইয়ের সংখ্যা কম নয়। তার বউ সারাদিন থাকে রান্নাঘরে। এতোগুলো পোলাপান। ফুসরত ফেলার উপায় নেই নুরার বউয়ের।

ঘুমের মাঝে শুনতে পায়, কে যেন ডাকছে। ঘুমের রেশ কেটে আসে। গলাটা চেনা চেনা মনে হয়। বদু ডাকছে নাকি? লাফ দিয়ে উঠে বের হয়ে আসে। দরজার সামনে দেখতে পায় বদুকে। রাগটা চিড়িক দিয়ে ওঠে। অকথ্য ভাষা বেরিয়ে আসে তার মুখ দিয়ে।
– কুত্তার বাচ্চা, তর ফোন বন্ধ কেরে?
বদুর দিকে তাকিয়ে তার ভঙ্গুর চেহারা দেখে থেমে যায় নুরার রাগ। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ফুরফুরে মেজাজের বদুর দিকে। মনে হয়, আইলায় পড়ে কোন রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে বদু।

চলবে————

-বাউল সাজু

Leave a Reply

Your email address will not be published.