উত্তরাধিকার (১৩ তম পর্ব)

– তুই অনক দিন স্কুল চালাইছস। অহন থাইক্কা জরা স্কুল চালাইব। তুই জাইগ্গা।

গ্রাম্য শালিসে যে লোকটি এখন কথা বলছে, সে দিন রাতের বেশির ভাগ সময় বাংলা চোলাই খেয়ে টাল হয়ে থাকে। সে বিবেক বলে বুঝে এক বোতল বাংলা মদ। যে তাকে এক বোতল মদ দেবে সে তার কেনা গোলাম। একজন সামান্য মদখোর দিয়ে সুজয়কে অপমান করিয়েছিল নুরার বাবা জরু। সেদিনের অপমানের প্রতিটা অংশ সুপয়া তার ছেলে মেয়েকে শুনিয়েছে সারাক্ষণ। এ ঘটনার সময় রিয়াদ মাত্র পৃথিবীর আলো দেখেছে।

রিয়াদ রিশার বাবা সুজয় ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী। অস্বাভাবিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সুজয় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নিজের যোগ্যতা এবং অধ্যবসায়ের কল্যাণে। চূড়ান্ত সফলতা পাবার আগেই সুজয় তার সব সঞ্চয় এবং ধার দেনা করে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। অমানবিক পরিশ্রম করে সে স্কুলকে দাঁড় করায়। সে স্কুলের প্রতি লোভ জাগে গ্রামের লাঠিয়াল সর্দার জরুর। সে অপেক্ষা করতে থাকে উপযুক্ত সময়ের। সুজয় চাকরির সুবাদে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। স্কুল চালানোর দায়িত্ব দিয়ে যায় মাস্টারদের মধ্যে থেকে একজনকে। জরু আস্তে আস্তে লোভী মাস্টারকে হাত করে নিজের মেয়েকে তার দিকে লেলিয়ে দিয়ে। মাত্র যৌবন আসা এক সুন্দরী কুমারী মেয়ের মোহে পড়ে মাস্টার হাত মেলায় জরুর সাথে।

নিজের মেয়ের ইজ্জত তার কাছে মূল্যহীন স্কুল দখলের তুলনায়। সুজয় স্কুলের কাজ করতে চাইলে বাঁধা হয়ে দাড়ায় লাঠিয়াল জরু। নানাভাবে সুজয়কে বাঁধা দিতে থাকে। সুজয় দু’মাস তিন মাস পর এসে এক/দু’দিনের বেশি থাকতে পারে। এ সুযোগটাই কাজে লাগায় জরু। সুজয় এলাকার মাতব্বরদের দ্বারে দ্বারে যায়। কেউ সহায়তা করতে রাজি হয় না। সবাই জরুর ইচ্ছের বাইরে গিয়ে সুজয়কে সহযোগিতা করতে ভয় পায়। অবশেষে সে গ্রাম্য শালিসের আয়োজন করে।

শালিস সভার দিনটি জরুর কাটে মহা ব্যস্ততায়। সুজয়ের হিসেবে পরিচিত যে কয় জন আছে একে একে প্রত্যেকের বাড়ি যায়। যাকে যতটুকু ডোজ দেবার তাকে ততটুকু দিয়ে আসে। সবাইকে রায় জানিয়ে দিয়ে আসে। আজ থেকে স্কুলে আসতে পারবে না সুজয়। ভালোমানুষ সুজয় জরুর ট্রাপে আগেই পা দিয়ে বসে আছে। স্কুল তৈরির সময় জরু উপযাজক হয়ে তাকে স্কুলের টিন এনে দিয়ে ছিল। তখন মারাত্মক অভাবে চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিল। সুজয় ভেবেছিল আস্তে আস্তে শোধ করে দেবে। কিন্তু শয়তান জরু আর সুজয়কে পাত্তা দেয় নি। যখনি টাকার কথা তুলেছে, তার সেকি অমায়িক ব্যবহার!
– মাস্টর সাব, ব্যস্ত অইলা কেন? দিয়ো আস্তে আস্তে। তোমার ভালা কামের ইট্টু শরীক অইলাম।

সুজয় শত চেষ্টা করেও তাকে আর টিনের টাকা দিতে পারে নি। বিনিময়ে সে তার পরিবারের সবাইকে বিনে পয়সায় পড়িয়েছে। জরুর সন্তান ছিল ধারাবাহিক। প্রতি বছর একটি সন্তান জন্ম দিত তার স্ত্রী। তার সংসারের ছোটখাট অনেক কাজ করে দিয়েছে সুজয়। সে কস্মিনকালেও চিন্তা করে নি জরুর মনে এমন কিছু থাকতে পারে। শালিসের দিন বিকেলে তার ছোট ঘরে বসে পুরনো দিনের কথাগুলো ভাবছিল। রাতে শালিস বসবে। সুজয়ের বাড়িতে কেউ নেই। তার পরিবার থাকে তার কর্মস্থলে।

বিকেল বেলা সুজয় বন্ধুদের কাছে যায়। সবাইকে শালিসে থাকার আমন্ত্রণ জানায়। কেউ কেউ নানা অজুহাত তোলে। তাতেও তার মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটে না। সে সন্দেহাতীত মনে সবার সব কথা মেনে নেয়। শালিশ শুরু হয় রাতের বেলা। নানা বাকবিতন্ডার পর মদখোরের কথা শুনে সুজয়ের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সে জরুকে চাচা হিসেবে সম্মোধন করে। তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– চাচা, এটা সে কি বলল?
জরুর উত্তরে সুজয় বোবা হয়ে যায়। জরু বলে,
– হেয় ত খারাপ কিছু কয় নাইক্কা। তুমি অনক দিন স্কুল চালাইছো অহন আমি চালাই। তুমি দুরুই থাহো কেমনে চালাইবা?
কথা শুনে সুজয়ের পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যায়।

স্কুলটি শুধু একটি স্কুল নয়। এটি একটি স্বপ্ন। সুজয়ের অন্তরে লালিত একটি চারাগাছ। সে এটিকে পরম যত্নে মহিরুহে রূপ দেয়ার অঙ্গিকার করেছে মনে মনে। সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হওয়ার পথে। মনের কষ্টে সে কোন প্রতিবাদ না করে শালিস থেকে বের হয়ে আসে। অনেকেই তাকে পেছন থেকে ডাকতে থাকে। সে মোহগ্রস্তের ন্যায় হাটতে থাকে বাড়ির পাণে। বাড়ি এসে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। গভীর রাতে সে চেয়ারম্যানের কাছে যায়। জরুর বিরুদ্ধে বিচার দেয় সে। চেয়ারম্যান তাকে জরুর সাথে মিলেমিশে স্কুল চালাতে বলেন। তার জানা ছিল না জরুই চেয়ারম্যানের মূল লাঠিয়াল। সকালবেলা কারো সাথে দেখা না করে নিভৃতে গ্রাম ছাড়ে সুজয়। সে গ্রামে পা রাখে নি দশটি বছর।

– কন কি ভাই ঘটনা ইমন খারাপ আছিল?
অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে রহিমউল্লা দেলুকে উদ্দেশ্য করে। রহিমউল্লা বাড়ি থেকে বের হয়েই দেলুর সাথে দেখা হয়ে যায়। দেলুকে থামিয়ে সে জানতে চায় মাস্টার চাচার কাহিনী। দেলুর কাছে শুনে সে মনে মনে ঘৃণা করতে থাকে জরুকে। তার ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেয়ায় এখন লজ্জা লাগছে। মানুষ এতোটা অমানুষ কি করে হয়? রহিমউল্লা কোনদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখে নি। অথচ এখন সে প্রচুর টাকার মালিক। কিন্তু সে সব সময় মাস্টার চাচাকে সম্মান করেছে। দেলুকে বলে,
– ভাই, হেই কুত্তার বাচ্চা মাস্টারটা কই?
– হেয় তো ভাগছে।
– হুনছি হের লেইগ্গাই আমগো সুন্দরী ভাতিজী বিষ খাইয়া মইরা গেছেগা।
– নারে ভাই, হেইডা পাপের ফল। আমি যাইগা বাজারো কাম আছে।
– আচ্ছা ভাই যান।
দেলুকে বিদায় জানিয়ে সে নিজের কাছে চলে যায়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় নুরুর কোন ব্যাপারে সে নাক গলাবে না।

চলবে———-

-বাউল সাজু

Leave a Reply

Your email address will not be published.