উত্তরাধিকার (১১ তম পর্ব)

মাহফুজ একজন হারতে হারতে জিতে যাওয়া মানুষের নাম। মাহফুজ একজন জীবন সংগ্রামে সাহসী যোদ্ধার নাম। সব অনুপ্রেরণার আঁধার ছিল তার স্ত্রী। গল্পের শুরু হয়েছিল অনেকদিন আগে। যখন শিক্ষার প্রসার ছিল না। কুসংস্কারে ছেয়ে ছিল সমাজটাকে আষ্টেপৃষ্টে। এমনি সময়ে মাহফুজ পতিব্রতা এক স্ত্রীকে নিয়ে সন্তানের কামনায় হা হুতাশ করেছেন পল্লীর আনাচে কানাচে। পীর ফকিরের দরবার মুখরিত হতো তাদের নিয়মিত পদভারে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য মানব চরিত্রের অনুধাবনযোগ্য নয়। মাহফুজ শেষ বয়সে একটি জীবিত পুত্র সন্তানের মুখ দেখে পরম নিশ্চিন্তে পরলোকে গমণ করেন।

রিয়াদ সেই মাহফুজ সাহেবের তৃতীয় প্রজন্ম। সে তার দাদীকে খুব বেশিদিন পায় নি, তবে তাদের ভাগ্যাকাশে সোনালী সূর্যের আলো ফেলা দেখে গিয়েছেন। সেই ভালো মানুষ দাদুকে যারা বিভিন্নভাবে হেনস্থা করতে চেষ্টা করেছিল, তার বাবার মহৎ স্বপ্ন পূরণে যারা কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর প্রত্যয় আছে তার মনে। সেই প্রত্যয় এবং আপু দুলাভাইয়ের দ্বিধাহীন সাপোর্ট, রিয়ার মতো স্ত্রীর অনুপ্রেরণা তাকে দাঁড় করিয়েছে নুরার মতো কিটের মুখোমুখি। সে তাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করবেই।

রিয়াদের বাবা ছিল দাদার একমাত্র সন্তান। দাদীর শাসন ভালোবাসায় তিনি শিক্ষা জীবন শেষ করে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী। তার নিজ এলাকায় শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রেখেছিলেন সক্রিয়ভাবে। শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখতে গিয়ে তার বিরোধ শুরু হয় সমাজের নরাধম নেতাদের সাথে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি চেষ্টা করেছেন। একা হওয়ার কারণে অনেক সময় নীরবে সরে আসতে হয়েছে অনেক কর্মকান্ড থেকে। সরে আসার সময় নিজের মনে শপথ নিয়েছেন দেখবেন একদিন এদের এবং দেখাবেন। তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিনিয়ে নেয় গল্পের নুরার বাপ। শুধু গায়ের জোরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বনে গিয়েছিল নুরার বাপ।

একজন সরকারী চাকরিজীবী হয়েও রিয়াদের বাবার এলাকায় পরিচয় ছিল মাস্টার হিসেবে। ইতিহাসের সব জানা আছে নুরার। সে রিয়াদের বাবাকে খুব ভালোভাবে চেনে। একই গ্রামে তাদের বাড়ি। নুরা তাকে দেখলে বেশ সম্মান করতো। সামনে কেউ কখনো রিয়াদের বাবাকে অসম্মান করে নি। কিন্তু নুরা এখনো নিশ্চিত হতে পারে নি রিয়াদের পরিচয় সম্পর্কে। সে এখনো রয়ে গিয়েছে সেই তিমিরে। সে অনেক সাহস সঞ্চয় করেও পারে নি রিয়াদের পরিচয় জিজ্ঞেস করতে।

নুরা বাড়ি এসে ভাবনায় পড়ে যায়। যে তালিকা সাহেব তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে সেসব তার মুখস্থ। সে চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে কোথায় কার বাড়ি। কার জমিতে কার বাস সব তার নখদর্পনে। সবগুলো নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। তার মাথা ব্যথার কারণ হলো শ্বশুরালয়। তার শ্বশুরবাড়িটা রিয়াদের পৈত্রিক জমিতে। এতোদিন পর এটা নিয়ে কেউ কথা বলবে নুরা স্বপ্নেও কল্পনা করে নি। তার শ্বশুর এখন এলাকার নেতা। তার বাপ ছিল কুটনীতিতে হাফেজ। দেখেশুনে আপন চাচাতো ভাইয়ের মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিয়েছে। এলাকা প্রভাব ধরে রাখাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।

নুরা অনেক চিন্তা ভাবনা করে তার শ্বশুরের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাতে সে হাজির হয় শ্বশুরালয়ে। শ্বশুরের সামনে এসে বলে,
– কাহা, আপনের লগে আমার ইট্টু কথা আছিল।
– কি জইন্য?
সে তার শ্বশুরকে সব কিছু খুলে বলে। জমি কেনার কথা বলে তাকে ডেকে নেয়া থেকে শুরু করে সবকিছু। সব শুনে তার শ্বশুর থম মেরে থাকে।
– তরে যে ডাইক্কা নিছে তার বয়স কেমন?
– সাহেব সাইজ্জা থাহে, তয় বয়স বেশি না। আমারতে অনেক কম অইব।
– তরে কই ডাইক্কা নিছিল কইলি?
– গুলশানে এক আলিশান বাসায়।
– আমগো এলাকার কেউ গুলশান থাহে হুনি নাই তো।
– কাহা, আমগো মাস্টর দাদার পোলা কই থাহে জানেন?
– কেন? তারে কি দরহার?
– আমার মনে কয় হেয় এগুলার লগে আছে।
– আইচ্ছা আমি তারে ফোন দিমুনে।
– আফনের তে তার নম্বর আছে?
– থাকব না কেরে? আমরা কি পর নি? তয় হেরা বাইত খুব একটা আইয়ে না, দেহা সাইক্ষাত অয় না এই আর কি।
– কাহা, হেরে একটা ফোন দেন না।

মেয়ে বিয়ে দিলেও নুরাকে দু’চোখে দেখতে পারে না রহিমউল্লা। বড় ভাইয়ের কথা ফেলতে পারে নি বলে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিল। এখন সে ক্ষমতাসীন দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা। উপজেলা পর্যায়ে তার বেশ প্রভাব। মোটামুটি স্বচ্ছধারার রাজনীতি করার কারণে তার প্রভাব বেশ ভালো। রহিমউল্লা বেশ পয়সার মালিক। দলের প্রয়োজনে উদারহস্তে খরচ করে। মাস্টার চাচার স্কুল দখল করে নেয়াটা সে পছন্দ করে নি। কিন্তু ভাইয়ের বিরোধিতা করার ক্ষমতা তখন ছিল না। এ বিষয়টা নিয়ে তার ভাইয়ের পরিবারের সাথে মাস্টার চাচার পরিবারের দূরত্ব কমেনি বরং দিনে দিনে বেড়েছে। মাস্টার চাচা এলাকার সবাইকে সহযোগিতা করতেন। এমনকি তার ভাইয়ের পরিবারও তার সহযোগিতা পেয়েছে কখনো কখনো।

এসব বিষয় তার ভাবনায় চলে আসে মুহূর্তে। রহিমউল্লা নুরার সামনে মাস্টার চাচার ছেলেকে ফোন করতে চায় নি। কিন্ত এটাও জানে তার জামাই ফোন না করলে উঠবে না এখান থেকে। সে কল দেয় রিয়াদকে। ওপাশে রিং হতে থাকে। কিন্তু কেউ কল রিসিভ করে না। নুরার চাপাচাপিতে আবার কল দেয়। এবার দুবার রিং হবার পর রিসিভ করে রিয়াদ।
– হ্যালো,
– হেলো, কিমন আছো ভাইয়া, আমি তোমার ভাই রহিমউল্লা।
– হ্যাঁ ভাই বলেন, কি মনে করে?
– না এমনেই মোনে অইলো তোমগো কতা। তুমি তো গ্রামে আসা বাদ দিছ।
রিয়াদ ছাচাছোলা উত্তর দেয়,
– আপনারাই তো চান না, আমি গ্রামে আসি।
– কেমনে ভাই? তোমার এই ভাইডা যদ্দিন বাইচ্চা আছে তদ্দিন আইস। আমি আছি তোমার লগে।
– ব্যবসায় খুব ব্যস্ত থাকি আসা হয় না, তবে খুব অল্পদিনের মধ্যে আসব।
– চাচি কিমন আছে? চাচিরে আমার সালাম দিও।
– আম্মা ভালো আছে আল্লাহর রহমতে।
– দিনের বেলা চাচিরে ফোন দিমুনে। ভালা থাইক। বেড়াইতে আইস।
– আচ্ছা ভাই ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।

ফোন রেখে নুরার দিকে তাকায় রহিমউল্লা। নুরা একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
– কাহা, কুনো কিছু জিগাইলেন নাত
– কি জিগামু?
– জায়গা জমির কতা, আমার কতা।
– তরে যে হেয় ডাকছে তুই জানছ?
– না, তয় মনে অয় হেয় জড়িত।
– কেমনে বুঝলি?
– মাস্টর দাদার বাবার নাম কইছিল আমারে।
– তুই ত আমারে এইগুলান কছ নাই।
– আমার মুনো আছিল না।
– আইচ্ছা তুই আমারে সব খুইল্লা ক।
নুরা এবার সবকিছু খুলে বলার চেষ্টা করে তার শ্বশুরকে।

চলবে———–

-বাউল সাজু

Leave a Reply

Your email address will not be published.