অনুধাবন

আমি লিমা, দু ভাইয়ের বড় কিন্তু বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে আমি। পড়াশোনা করতে আমার একদমই ভালো লাগেনা। আমার মফস্বল স্কুলের স্যার ম্যাডামরা বলে আমার নাকি মাথা ভালো, পড়লে অনেক ভালো রেজাল্ট করতে পারবো। কিন্তু আমার মাথায় ঘোরে এতো পড়ালেখা করে কি লাভ? তারচেয়ে কোনরকমে কলেজ পাশ দিয়ে বিয়ে করে ফেললেই জীবনে শান্তি আর শান্তি। পাশের বাড়ির আনুবু কি সুন্দর পরীর মতো বৌ সেজে সারাদিন ঘুরে বেড়ায় আর তার জামাই সারাদিন ওনার সাথে দুষ্ট মিষ্টি কথা বলে। আহা কি সুখের জীবন। সারাদিন সেজেগুজে থাকবো, সবাই আদর করবে, সবাই সুন্দরী বলবে তাহলেই না জীবন সার্থক। আমাদের ক্লাসের যে ফার্স্ট গার্ল তাকে তো কেউ তেমন পছন্দ করেনা। সারাদিন মাথার চুল তেলে লেপ্টে বিশ্রী হয়ে থাকে, কোন খবরই নেই তার। আছে খালি পড়াশোনা নিয়ে; কে করবে ওকে বিয়ে? থাক বাবা ওকে দেখে আমার কাজ নেই, আমার আদর্শ হচ্ছে আনু বু।

মোটে ক্লাস নাইনে পড়ি। মা তেমন সাজগোজ করতে দেয়না। কড়া ধর্মীয় অনুশাসনে বড় হওয়া পরিবারে বোরকা পরে স্কুলে না গেলে বাবা রাগ করে। আমি বাসা থেকে যেনতেনভাবে বের হয়ে আনু বু’দের বাড়ির পেছনে যেয়ে লুকিয়ে কেনা কাজল, লিপস্টিক লাগিয়ে তারপর স্কুলে যাই। মেয়েমানুষ না সাজলে কি ভালো দেখায়? এমনই একদিন সাজগোজের সময় পেছন থেকে কে একজন দেখে ফেলে। আমি ধরা পরে দৌড়ে পালিয়ে গেলেও তার নজর থেকে বের হবার সুযোগ আর মেলেনা। কয়েক মাসের মধ্যেই আনুবুর দ্বারাই তার সাথে আমার পরিচয় হয়। আনুবু’র দুঃসম্পর্কের দেবর রাসেল। তারপর একটু কথা, একটু হাসাহাসি আর একটু এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে কিভাবে কিভাবে যেন রাসেলের সাথে আমার প্রেম হয়েই যায়।

পড়াশোনা শিকেয় তোলার সুযোগ ছিল না। বাবা মা দুজনেই খেয়াল রাখতেন খুব ভালো ফলাফল না করলেও যেন পাশটুকু করে যাই। মা বোঝাতেন পড়াশোনার গুরুত্ব আর আমি ভাবতাম রাসেলের কথা। ইশ কবে যে কলেজটা পাশ হবে আর আমি রাসেলকে বিয়ে করতে পারবো।
রাসেলের সম্পর্কে তেমন কিছুই আমি জানতামনা। শুধু জানতাম ও ডিগ্রী পাস আর ওর বাবার অনেকগুলো আড়ত আছে। তিন ভাইবোনের সংসারে ও একা ছেলে কাজেই সব সম্পত্তি ওর হবে এটুকু গল্পই শুধু রাসেল করেছে। আমার বয়স আর কতই তখন? বৈষয়িক ভাবনাগুলো আবেগের ফানুসে ভেসে গিয়েছিল কোন চিন্তা ছাড়াই।

এইচএসসির রেজাল্ট হলো মোটামুটি। মা বাবা দুজনে মন খারাপ করলেও বাবা কাছেই মফস্বলের কলেজে অনার্সে ভর্তি করে দিলেন। আমার অবশ্য তাদের মন খারাপের দিকে কোন নজর নেই তখন। রাসেলের বাসা থেকে আমার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠালো। কিন্তু বাবা রাজি হলেন না। উনি চেয়েছিলেন একটা শিক্ষিত পরিবারে মেয়েকে বিয়ে দিতে। আমার বাবা মা দারুন ধর্মীয় অনুশাসন মানলেও গোড়া ছিলেন না। কিন্তু এই অবুঝ প্রেমান্ধ আমায় বোঝায় কার সাধ্য। আর তাই একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে রাসেলের হাত ধরে পালিয়ে যাই।

রাসেলের পরিবার আমাকে মেনে নিতে আপত্তি করেনি। তার কারণটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম অনেক পরে। ওদের আসলেই অনেক বড় বাড়ি, বড় উঠোনের অবস্থাপন্ন ঘর। ওর বাড়ির সবাই আমাকে আদরও করতেন ভীষণ। গয়না, কাপড়ের কোন অভাব আমার হয়নি। পড়াশোনা না করলেও ঘরকন্নার কাজ আমি ভালোই পারতাম। আসলে আমার জীবনের লক্ষ্যই যে ছিল বিয়ে করে বৌ হওয়া। প্রথম বছর রাসেলও খুব মনোযোগী থাকলেও আস্তে আস্তে তার উচাটন স্বভাব আমার নজরে পরতে থাকে। বুঝতে পারি রাসেলের ঘরে, ব্যবসায় মনোযোগী করতেই বিয়েতে তার বাবা মা আপত্তি করেনি। একটু আধটু নেশা করলে না হয় সেটা মেনে নেয়া যেত, কিন্তু তার নজর যে অন্য মেয়েদের দিকেও সে নেশা আমি কেমনে তাড়াই? কাকে বলবো আমার দুঃখের কথা? মা বাবার মুখে চুনকালী দিয়ে আসা এই আমি আর কোন মুখে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াই? মা বাবা মেনে না নেয়ার মতো করে মেনে নিয়েছিলেন আমাদের বিয়েটা। আর সেই না মেনে নেয়ার ভারে সম্পর্কের সুতোটা যেন না থাকার মতোই কোনরকমে ঝুলে ছিল।

নিত্য ঘরকন্নার কাজ, রাসেলের অমনোযোগে গয়নাশাড়িতে বৌ সেজে থাকার ভার বুঝি আর নিতে পারছিলামনা। এই আমি একাকী সময়ে যখন নিজের ভেতর নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করলাম, সেসময় বুঝতে পারলাম মা কেন বলতেন মেয়েদের জীবনে পড়াশোনা জানা থাকা জরুরী। পায়ে পায়ে একদিন শ্বশুড়ের কাছে গিয়ে জানাই আমি আবার পড়াশোনা করতে চাই। কি ভেবে উনি আমাকে ডিগ্রীতে ভর্তি করে দেন। আমার প্রতি রাসেলের অমনোযোগ যে আদতে কারো নজর এড়ায়নি। শাশুড়ী গাইগুই করলেন এই সিদ্ধান্তে। বোঝালেন একটা বাচ্চাকাচ্চা নিলে রাসেলের ঘরে হয়তো মন বসবে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার আসলে কি করা উচিত? ভাবলাম পড়াশোনাটাই আগে শুরু করি। অন্তত সময়তো কাটবে। পড়াশোনা শুরু করে আমি জীবনে এই প্রথম বুঝতে পারি আমার শিক্ষকরা কেন আমাকে বলতেন আমি পড়াশোনা করলে ভালো করবো। রাসেল বিয়ের বছর না ঘুরতেই প্রায়শই কয়েকদিন বা সপ্তাহের জন্য বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেতো। প্রথমদিকে প্রতিবার আমি খুব রাগারাগি করতাম। এই দফা ফিরে এসে ও খুব হম্বিতম্বি করে আমার পড়াশোনার ব্যাপার নিয়ে। আমি ততদিনে ওকে সামলে ফেলার কৌশল বুঝে গেছি। নিজে একেবারে চুপ থেকে ওকে সামলে নিলেও নিজের পড়াশোনা করার সিদ্ধান্তে এবার অটল রইলাম।

ডিগ্রী পরীক্ষা শুরুর কয়েকমাস আগে আমি টের পেলাম আমার বাচ্চা হবে। বাচ্চা হবার খবরেও রাসেলের কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলোনা। আমি আবারো বুঝলাম কত বড় ভুল আমি করেছি জীবনে। বাচ্চা পেটে নিয়েই যতোটা সম্ভব পড়াশোনা করলাম। ডিগ্রীতে আমার রেজাল্ট আশাতীত ভালো হলো। বাড়ির সবাই এমনকি রাসেলও চমকে গেল আমার ফলাফলে। কিন্তু বাচ্চার কারণে এবেলা আমার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা আটকে গেলো। কিন্তু মনের মধ্যে তখন মাস্টার্স করার অদম্য নেশা।

সংসার বাচ্চা সামলে ভর্তি হলাম মাস্টার্সে। শ্বাশুড়ি  এবার আর কোন বাগড়া দেননি। রাসেল সেই আগের মতোই আছে। যেন আমার সাথে তার কোনদিন কোন যোগাযোগ ছিল না। বাড়ি আসতে হয় বলে আসে। তবে একটা উন্নতি হয়েছে তা হলো ব্যবসা দেখা শুরু করেছে একটু একটু। আমার মেয়েটা বড় হতে থাকে কোনরকম বাবার আদর ছাড়াই। মাস্টার্সেও রেজাল্ট বেশ ভালো হলো। মনে স্বপ্ন আমি চাকুরী করবো। কিন্তু আবেদন পত্রে অনার্সের প্রাধান্য দেখে প্রথম প্রথম দমে গেলেও আবেদন করে গেছি একের পর এক। সত্যি বলতে কি কোথাও থেকে একটা ইন্টারভিউয়ের ডাকও পাইনি। পাবো কোথা থেকে ; ভুড়ি ভুড়ি অনার্স মাস্টার্সের ভীড়ে আমার সার্টিফিকেট যে দাঁড়াতেই পারেনা। শেষমেষ মফস্বলের একটা স্কুলে চাকুরী পাই অনেক কষ্টে আর আমার শ্বশুড়ের খানিক প্রভাবে।

সেই চাকুরী নিয়েও রাসেলের ক্ষোভের শেষ ছিলোনা। গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে। তারপরও আমি সিদ্ধান্ত পাল্টাইনি। আমাকে কোনভাবে বাগে আনতে না পেরেই বুঝি আমাকে জব্দ করতে একদিন আরেক মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ি তুলে আনে। ওর মা বাবা সবার কথা ছিল, ভুল যখন করেই ফেলেছে মেনে নিয়ে থেকে যাই যেন। কেউ কেউ আবার পরামর্শ দিয়েছে কেস করে দিতে। দুটোর কোনটাই করিনি আমি। এক হাতে নিজের মেয়েকে ধরে আরেক হাতে আমার সার্টিফিকেটগুলো নিয়ে বেরিয়ে এসেছি বাড়ি ছেড়ে। এতোদিন তাও আশা ছিল হয়তো রাসেল কখনো ভুল বুঝে ফিরে আসবে। কিন্তু আজকের পরে আর সেই আশা করাই যে দূরাশা।

ভালোবাসার যে অন্ধ মোহে বাবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম, তার করুন পরিণতিতে আবার সেই বাড়িতেই ফিরে আসি। বাবা মা এবেলা ফেলে না দিলেও নিজের আত্মসম্মানবোধের তাড়নায় বাবার ঘরের পেছনে ভাড়া দেয়া ঘরে ভাড়া নেই। বাবাকে বোঝাই আমার নিরাপত্তাটুকুর জন্য আমি তাদের কাছে ফিরে এসেছি। আমাকে দয়া না দেখিয়ে যেন একলা চলার সাহসটুকু দেয়। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন আমি কি বলতে চেয়েছি, তাই আর আমার সিদ্ধান্তে জোর করেন নি।

জীবনের এই প্রান্তে এসে নিজের অমূল্য সময় হারিয়ে আমি বুঝলাম, যে ক্ষণস্থায়ী রূপ সৌন্দর্যের মায়াজালকে আমি আমার লক্ষ্য ভেবেছিলাম ওটা আসলে এক মরীচিকা ছাড়া কিছুই নয়। লেখাপড়ার আলোয় আলোকিত না হলে জীবনটা শুধু অন্ধকারের ঘূর্নিজালেই হারিয়ে যায়, আলোর মুখ দেখেনা কখনো।

দুমাসও বাপের বাড়ি একাকী টিকতে পারিনি। রাসেল নিত্য এসে বাড়ির সামনে ধরনা দিতে শুরু করলো। তার মেয়ে এটা, একে সে এরকম বস্তির মতো বাড়িতে রাখবেনা। আশেপাশের লোকের কটু কথা কি বাসা, কি স্কুলে; আর নিত্য ফিসফিসানীতে আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। এ কোন জীবনে এসে পড়লাম। আগেতো অন্তত দুই কথা শোনানোর কেউ ছিল না। ভাবলাম একবার শহরে চলে যাই। কিন্তু কাউকে যে চিনিনা, কার কাছে থাকবো। কোন জমানো টাকাও তো নেই যে কিছুদিন কোনভাবে অন্তত চলতে পারবো। এদিকে গত দুদিন ধরে সকাল বিকাল বমি করে এতো দুর্বল লাগছে যে আমি ঘরের কোন কাজ তো দূরের কথা মেয়ের যত্নটুকুও নিতে পারছি না। আমাকে এ অবস্থায় দেখে রাসেলের মনে কি যেন কি রকম দয়া হয় কি না। জোর করে তুলে নিয়ে যায় হাসপাতালে। মেয়ে ফিরে যায় তার দাদাবাড়ি। ডাক্তার জানায় আমি আবারো মা হতে চলেছি। শরীরের বাড়াবাড়ি নামক কষ্টে আমাকে ডাক্তার বেড রেস্ট নামক শাস্তি কাগজে লিখে দেয়।

জীবন এভাবেই তার কঠিন শিকলে আবার আমাকে বেঁধে ফেলে। আমার শিক্ষা, সামান্য একটু গড়িয়ে ওঠা আত্মসম্মান নামক বস্তু আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর খানিক ইচ্ছা সব সেই শেকলের যাঁতাকলে হারিয়ে আমি ফিরে আসি সতীনের ঘর করতে। আমার নিজের গড়া সংসারে বাড়ির বড় বৌ নামে। নিজের অপরিনামদর্শিতার মূল্য আজ আমি নিজেই হাড়ে হাড়ে দিচ্ছি নিজের আত্মসম্মান আর মূল্যবোধ বিকিয়ে।

-ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.