অনুধাবন ( ২য় পর্ব )

আমাকে এতো জোর করে বাড়ি নিয়ে আসার কিছুদিনের মধ্যেই রাসেল আবার আগের রূপে ফিরে গেল। হয়তো নিত্য লোকের নানা কথা, নিজের বাবা মায়ের তার ওপর অসন্তোষ বা আড়ত থেকে নিজের ইচ্ছেমত পয়সাপাতি নিতে পারছিল না বলেই বুঝি আমাকে ফিরিয়ে এনে ঘরে একটা সাম্যতা আনার চেষ্টা সেটা আমি এখনো বুঝতে পারিনি। সারাদিন নিজের রুমে থাকায় বাড়ির সব খবরের জন্য ঘরের কাজ করা মেয়েটাই ভরসা। তার কাছেই শোনা নতুন বৌ অর্থাৎ আমার সতীনের ব্যাপারেও তার খুব একটা আগ্রহ নেই। যেন বিয়ে করে আমাকে জব্দ করাটাই উদ্দেশ্য ছিল।

আমার মেয়ে তিতলী অবশ্য এ বাড়িতে আসার পর থেকে বেশ আনন্দে আছে। রাসেলের দুই বোনের ঘরেই ছেলে বাচ্চা। তাই তিতলীকে নিয়ে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াতে ওর দাদা দাদী ভীষণ মুষড়ে পরে। কিন্তু ছেলের কুকীর্তির জন্য মুখ ফুঁটে বড় গলায় বলতেও পারেননি কিছু। আমি ফিরে আসাতে তাদের মুখের হাসি বলে দেয় তাদের মনের আনন্দটুকু। উঠোনের অপর পাশের ঘরে থাকা নাজমা নামক আমার প্রতিপক্ষের সাথে আমার কথা হয়নি মোটে। ওর জন্যই তো আমাকে এতো অপমানিত হতে হলো। মরে গেলেও আমি কোনদিন ওর সাথে কথা বলবো না। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে সংসারে ফিরেছি, মুখ বুজে শুধু দিন পার করে যাব এরকমভাবেই নিজেকে নিজে বুঝ দিয়ে যাই রোজ।

দুপুরে ভাত খাওয়ার পর একটু চোখ লেগে এসেছিল। চোখ খুলে দেখি তিতলী পুতুল নিয়ে খেলছে। পরিপাটি করে বাঁধা চুল আর পোশাকে মেয়েটাকে বিকেলের আলোয় এত মিষ্টি লাগছিল, অদ্ভুত ভালো লাগায় তাকিয়ে রইলাম অনেকটা সময়। হঠাৎ মনে হলো মেয়েটার নজর না লেগে যায় ভেবে নিজেই মনে মনে মেয়ের দিকে একটু থুতু ছিটিয়ে দিলাম।

– তিতলী মা, এতো সুন্দর করে কে চুল বেঁধে দিয়েছে?

– ছোট মা বেঁধে দিয়েছে মা।

ঐ ছোট মা নামক দুটো শব্দে আমার বুকের ভেতর যে কি করে উঠলো, আমার সর্বনাশের মূলহোতাকে আমার নিজের পেটের মেয়ে এতো মিষ্টি করে মা ডাকবে কেন? আমি পাগলের মতো টান দিয়ে ওর সব চুল টেনে ছিড়ে খুলে দিতে লাগলাম। মেয়ের চিৎকারে যে পুরো বাড়ি এক হয়ে গেছে সেদিকে যেন আমার কোন খেয়ালই নেই।

আমার শ্বাশুড়ী  জোর করে তিতলীকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন। আর আমি এক অক্ষম আক্রোশে, এক অজানা আশংকায় কি করবো বুঝতে না পেরে শুধু চোখের জলে বুক ভাসালাম অনেকটা সময়। না কেউ থামাতে আসেনি আমায়।তিতলীর গায়ে যে আমি হাত তুলতে পারি এটাই যেন কারো বিশ্বাস হচ্ছিলো না। আমার এমন একটা রূপের সাথে যে এ বাড়ির কারোই পরিচয় নেই। আমি নিজেই কি আমার এই রূপটুকু জানতাম?

আমি কি তাহলে পাগল হয়ে যাচ্ছি? রাসেলের অমনোযোগিতাকে তো আমি মেনেই নিয়েছিলাম, তাহলে এই বেলা কেন আমি এমন উন্মাদের মতো আচরণ করলাম? আমার প্রতি রাসেলের শুধু মোহ ছিল সেটাকে তো আর যাই হোক ভালবাসা বলা যায়না। তবে কিসের জন্য উঠোনের ওপারের মানুষটার ওপর আমার এতো রাগ? বাড়ির একটা বাড়তি মানুষ ভেবে নিলেই তো হয় তাকে। নিজের মনের সাথে একাকী কথা বলার খেলা শেষে ক্লান্ত আমি হঠাৎই বুঝতে পারলাম, আমি যা করেছি তা ঠিক না। কিন্তু ঐ যে সদ্য গজিয়ে ওঠা আত্মসম্মান নামক ঘুনপোকা মাথার ভেতর কুড়ে কুড়ে খেয়ে ওঠে আমার মগজের অনেকটা অংশ আর একঘেয়ে বিরক্তির স্বরে যেন বলে যায়, ফিরে আসা কি খুব দরকার ছিল?

কি উপায় ছিল আমার হাতে? ছেলে ছোকড়া, বুড়ো ভাম কেউই বুঝি আফসোসের সুরে গায়ের ওপর পড়তে বাকী রাখেনি একাকী থাকার দুটো মাসে। মায়ের কাছে তিতলীকে রেখে স্কুলে যেতাম ভাইয়ের বৌদের সেটা পছন্দ ছিল না। কেউ তাদের বাচ্চাদের আমার মেয়েটার সাথে খেলতে পর্যন্ত দিতোনা। অথচ এই বাড়িতে তিতলীকে সবাই মাথায় তুলে রাখতো। স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো পর্যন্ত পারলে বুঝি আমার পেছনে কথা বলতো। মফস্বল শহরে কোন খবরই যে চাপা থাকেনা। যে দোষ করলো তাকে শুধু সবাই বললো এটা ঠিক হয় নাই। আর আমি শুধু নিজের আত্মসম্মানটুকু নিয়ে বাঁচতে চাইলাম, সবাই যেন তাতেই হাজার দোষ খুঁজে পেল।

পুরোটা বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে শেষে রাত নেমে এলো। কেউ আমার ঘরে আসেনি এমনকি তিতলী ও না। রাসেল তো মনে চাইলে আসে নাহলে নাই। ও বরং না আসলেই আমি খুশী হই এখন। ওকে দেখলেই একটা অসহ্য জ্বলুনি ধরে সারা শরীরে। মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে দা এর এক কোপ বসিয়ে দেই। বাচ্চা আর নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দাঁতে দাঁতে চেপে শুধু সহ্য করি। আমার সাত পাঁচ ভাবনার মাঝে হঠাৎ মনে হলো কে যেন দরজার বাইরে দাঁড়ানো।

– কে, কে ঐখানে?

– বুবু, আমি নাজমা। ভেতরে আসলে আপনি রাগ করবেন?

কি জবাব হয় এই প্রশ্নের? চুপ করে কইলাম তাই।

– তিতলী কে আম্মা আমার কাছে আসতে দেয়না। আমি নিজেই ওকে ডেকে ওর চুল বেঁধে দিছি। আপনি রাগ করলে আমি আর ওর চুল বেঁধে দিব না। আপনি ওকে কিছু বইলেন না।

মনের এক অংশ আবারো ফুঁসে উঠেছিল, আসছে দরদ দেখাইতে। অন্য অংশ বুঝি শরীরের ক্লান্তিতে চুপ করে থাকাটাই শান্তির মনে করলো। তাই চুপ করেই রইলাম।

– আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসি? আপনি অনেকক্ষন কিছু খান নাই। শরীর খারাপ করবে বুবু।

সে কথার ও কোন জবাব আমি দেইনি। যেন আমি অন্য কোন গ্রহের কেউ। পৃথিবীর কারো ভালবাসা বা মায়ায় আমার কিছুই যায় আসেনা এমন নির্লিপ্তভাবে বাইরের অন্ধকার উঠোনে তাকিয়ে রইলাম। আমার জীবনের ভবিষ্যতের মতো, শুধুই আঁধার ছাড়া কোন আলোর রেখা নেই যেন কোথাও। শুধু আছে ক্লান্ত জীবনটাকে বোঝার মতো প্রতিদিন একটু একটু করে টেনে নেয়া।

আরো কিছুক্ষণ বসে থেকে নাজমা আস্তে করে উঠে যায়। ফিরে আসে অল্প সময় পরেই। আমার খাবার একটা ট্রে তে করে বাড়ির ঝি নিয়ে এসেছে আর ওর কোলে তিতলী। আমার বিছানায় তিতলীকে রেখে আর কোন কথা না বলে দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে যায় দুজনে।

বিকেলবেলার অহেতুক উত্তেজনায় খাবারের কথা ভুলে থাকলেও খাবারের গন্ধে হঠাৎ খিদেটা এমন চাগিয়ে উঠলো মনে হলো আমি পুরো পৃথিবী খেয়ে ফেলতে পারবো। হামলে পরলাম ভাতের গামলার ওপর। বমি করা কমে যাওয়ার পর থেকে আমার শুধু গামলা গামলা ভাত খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বেশী খেলেও আবার এতো হাঁসফাস লাগে যে চাইলেও অনেক খেতে পারিনা।

অনেকটা খাওয়ার পর বুঝি একটু থামলাম। আর কিছুতেই খেতে পারছিলাম না। খাওয়া থামিয়ে হাত ধুয়ে নিতেই দরজা খুলে ঝি মেয়েটা ঢুকলো। তাহলে কি ওরা দুজন বাইরে থেকে আমার খাওয়া দেখছিলো? যা খুশী হোক, যার যা খুশী করুক আমার কিছুতেই কিছু আর এসে যায়না। বেঁচে থাকতে হলে দুবেলা খেতে হয়, ইজ্জতের সাথে থাকার একটা জায়গা থাকতে হয়; আমার এবেলা দুটোই আছে। আমার মতো সুখী মানুষ আর কজন আছে? পাগলের মতো এসব ভাবনার ফাঁকেই উঠোনে হুটোপাটির শব্দ। বিকট শব্দে কেউ একজন বমি করে পুরো উঠোন ভাসিয়েছে। থেকে থেকে ভেতর বাড়ির অন্যদের গলার আওয়াজে বুঝলাম, এ বাড়ির গুনধর পুত্রটি মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছে। শক্ত করে আটকে দিলাম নিজের ঘরের দরজার হুড়কো। কোন মদ্যপ মাতাল এই রাতে আমার ঘরে ঢুকুক আমি কিছুতেই সেটা চাইনা।

আমার অবশ্য জানা ছিলনা রাসেল গত কয়েক রাত একা ঘরেই ঘুমায়। ছোট বৌ নাজমা রাতের খাওয়া শেষ হলেই তড়িঘড়ি দরজা আটকে দেয়। বাড়ির ঝিয়ের কাছে কথাটা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে, নাজমা নামের মেয়েটাও আমার মতো পরিস্থিতির শিকার না তো?

হায়রে মেয়ে মানুষের জীবন। বেঁচে থাকার প্রতি পরতে একটা ছেলের পরিচয়ে বাঁচতে হবে। নয়তো সমাজ নামক এক জঘন্য দানব প্রতি ক্ষণে মনে করিয়ে দেবে তুমি সমাজের বাইরের কেউ, সবাই তোমাকে নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখে।

চলবে….

-ডা.জান্নাতুল ফেরদৌস

Leave a Reply

Your email address will not be published.