বাংলাদেশের মা

দাঁড়ি টুপিওয়ালা হুজুর টাইপের লোক দেখলে আমার অসহ্য লাগত । হুজুর টাইপ মানুষগুলোর গা থেকে ভক ভক করে বের হওয়া আতরের বিকট গন্ধে আমার নাড়িভুঁড়ি উলটে বমি আসত ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস !! সেরকম একজন দাঁড়ি টুপি ওয়ালা হুজুরই আমার পুরো পৃথিবীটা দখল করে আজো বসে আছে !!

আমার তখন সতের বছর বয়স । ছোটবেলায় বাবা মা মারা গেছে , চাচাচাচির কাছে মানুষ হচ্ছি । আমার সমবয়সী সবমেয়েদের তখন বিয়ে হয়ে গেছে , কোন এক রহস্যময় কারণে আমার বিয়ে হচ্ছেনা দেখে চাচা চাচি কিছুটা বিরক্ত । কিছুটা বিরক্ত বলা যায়না ঠিক , বেশ বিরক্ত চাচা চাচি । কিন্তু মুখফুটে বলতে পারছেনা । কারণ আমার বাবার রেখে যাওয়া বেশ কিছু সম্পত্তি চাচাজান ভোগ দখল করে বসে আছে তখন।মফস্বলের বাজারে সবচেয়ে ব্যস্ত দোকানটাও বাবার , সেখান থেকেও চাচাজান বেশ ভাল অংকের ইনকাম করে যাচ্ছেন । পরে অবশ্য চাচাজান সেই দোকান নিজের নামে করে ফেলেন ।

আমার মা মারা যান কোন এক জটিল রোগে , আমি তখন বেশ ছোট । আমার বার বছর বয়সে বাবা একদিন হটাৎ করে বুকে প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভব করেন ,তারপর কাউকে কিছু বলার বা শোনার সুযোগ না দিয়ে ডাক্তার চাচা আসার আগেই মারা যান । আমি ঠিক সেই সময়টাতে বাবার পাশেই ছিলাম । অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবার মৃত্যু দেখেছি ! বাবার উপর প্রচণ্ড অভিমান হয়েছিল আমার সেদিন । আমাকে একা রেখে বাবা মা দুজনের এভাবে চলে যাওয়াটা আমার কাছে খুব কষ্টের ছিল ।

আমি ছিলাম বাবার একমাত্র সন্তান , খুবই আদরের মেয়ে । না চাইতেই সবকিছু আমার সামনে হাজির হয়ে যেত । মফস্বলের খুব ভাল একটা এলাকাতে আমাদের দোতলা একটা বাড়ি ছিল, সামনে পিছনে সুন্দর বাগান ছিল ।

বাবার হটাৎ মৃত্যুতে আমার একমাত্র চাচা বাবার ব্যবসা , জমি , বাড়ি সবকিছু দেখাশুনা করার দায়িত্ব নেন । চাচা আমাকে সাথে করে উনার বাসায় নিয়ে আসেন । চাচা চাচি আমার হটাৎ এতিম হয়ে যাওয়া নিয়ে অনেক দুঃখ করতো মানুষের সামনে । অনেক নতুন নতুন আত্নীয়স্বজন  যাদের আমি বাবা বেঁচে থাকতে কখনোই দেখিনি , আমাকে প্রায়ই দেখতে আসতেন চাচার বাসায়। চাচী উনাদের সামনে আমাকে কোলে টেনে নিয়ে আদর করতেন । কথার মাঝে মাঝে চাচী আবার উনার শাড়ির আঁচল দিয়ে নাকের পানি, চোখের পানি মুছতেন । আমাদের বাড়ির দামী দামী ফার্নিচার কিছু চাচার এই বাড়িতে নিয়ে আসেন , আর কিছু বিক্রি করে দেন। একদিন শুনি , আমাদের সেই বাড়িটা বিক্রি করে দিচ্ছেন চাচা। চাচী আমার সামনেই একজন আত্বিয়কে বলেন বাবার রেখে যাওয়া অনেক ঋণ ছিল ব্যাংকে , সেই ঋণ শোধ করার জন্যই বাড়িটা বিক্রি করা হচ্ছে ।

আমি একটা ছোট্ট রুমে একখাটেই চাচাত বোনদের সাথে ঘুমাতাম । প্রথম প্রথম কিছুদিন আমার ভালোই লাগত ,একসাথে অনেক গল্প করতাম , খেলতাম তিনজন মিলে। কাছাকাছি বয়সের ছিলাম আমরা তিনজন। ওরা আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছিল, আমাকে আপা ডাকত । আমার জামা জুতো , চুলের ফিতে যা যা বাবা শহরের সবচেয়ে দামী দোকান থেকে কিনে দিয়েছিল সেসব ওরা ভীষণ পছন্দ করত । আমি ওদের সাথে নিজের সবকিছু শেয়ার করতাম। আমি আমার গল্পের বইগুলো ওদের পড়তে দিতাম । চাচী কোথাও বেড়াতে যাবার সময়ে দামী শাড়ি গয়না পড়তেন , আত্বিয়দের বলতেন চাচা কিনে দিয়েছেন । কিন্তু আমি জানতাম এসব শাড়ি গয়না ছিল আমার মায়ের । বাবা অবশ্য মাঝেমধ্যে আমাকে গোপন লকার থেকে বের করে আমার জন্য যত্ন করে রাখা মায়ের গয়নাগুলো দেখাতেন । তবে চাচীর গায়ে মায়ের শাড়ি গয়নাগুলো দেখতে আমার ভালোই লাগত , আমি কিছুই বলতামনা ।

একটু একটু করে যখন আমি বড় হতে থাকি , ধীরে ধীরে আমাকে বিষণ্ণতা গ্রাস করতে থাকে । বড় হতে হতে মনে হতে থাকে , আমার কিছুই নাই । অনেককিছুই আছে আবার কিছুই নাই এই পৃথিবীতে আমার !! সবাই দেখে খুবই সন্তুষ্ট , বাবা মা হারা এই আমি চাচাচাচির কাছে আদরেযত্নে বড় হচ্ছি ! বন্ধুর মতন চাচাত বোনদের সাথে হেসে খেলে দিন কাটাচ্ছি !! কিন্তু আমি বালিকা থেকে কিশোরী, কিশোরী থেকে তরুণী হবার বয়সটাতে বুকের ভিতরে এক বিশাল হাহাকার নিয়ে বড় হতে থাকি। নিজের ভিতরের এক সমুদ্র হাহাকার ঢাকতে আমি বেছে নিই রাশি রাশি বই ! আমি বইয়ের সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকি । যত রকমের বই পাওয়া যেত স্কুলের লাইব্রেরিতে সব গোগ্রাসে গিলতাম । পাড়ার লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়তে লাগলাম । আমি নিজে নিজেই আমার জন্য অন্য এক আপন জগত সৃষ্টি করে ফেলি ।

ম্যাট্রিক পরীক্ষায় আমি খুব ভাল রেজাল্ট করি । স্কুলের হেডমাস্টার  নিজে আমার চাচার বাসায় মিষ্টি নিয়ে আসেন । আমাকে শহরের ভাল কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করানোর জন্য চাচাজানকে অনুরোধ করেন । কিন্তু চাচাজান বলেন, উনি আমাকে খুবই ভালবাসেন তাই চোখের আড়াল করবেন না । এলাকার কলেজেই আই এ তে আমাকে ভর্তি করিয়ে দেন চাচা।

চাচী অবশ্য আমাকে বিয়ে দেবার জন্য উঠেপড়ে লাগেন তখন। প্রায়দিনই আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আত্বিয় অনাত্বিয়রা চাচাচাচির কাছে আসতে থাকেন । আমি পাশের রুম থেকে শুনতাম , চাচী তাদের কাউকে কাউকে ইনিয়ে বিনিয়ে আবার কাউকে কাউকে স্পষ্ট ভাবেই বলত, আমার বাবা কিছুই রেখে যাননি আমার জন্য। আমি সম্পূর্ণ চাচার দয়াতেই আছি , চাচার টাকায় পড়ছি । তাতে আমার অবশ্য খারাপ লাগত না , কারণ বিয়ের চেয়েও আমার তখন পড়াশুনা করতেই বেশী ভাল লাগত। তাছাড়া আমি আত্বিয় বা বাইরের মানুষের সাথে একদমই মিশতাম না । আমার সম্পূর্ণ জগতটাই ছিল রবিঠাকুর , জীবনানন্দ , শরৎচন্দ্র আর নজরুলকে নিয়ে ।

আই এ পরীক্ষার রেজাল্ট খুবই ভাল হল আমার। ততদিনে এলাকার , আত্বিয়দের মধ্যে আমার সমবয়সী সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে । কারো কারো আবার একটা দুটো বাচ্চাও আছে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল ইউনিভার্সিটি থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিবো। এদিকে চাচী আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে প্রায়ই বলত উনার মেয়েরা বড় হয়ে গেছে তাদেরকে বিয়ে দিতে হবে , আমার বিয়ে না হলে তাদেরকে বিয়ে দিতে পারছেনা । মানুষ বলবে বড় বোনকে রেখে ছোটবোন দের বিয়ে দিয়েছে , বাবা মা হারা মেয়ে বলে আমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে !! আমার জন্য আসা বিভিন্ন প্রস্তাবও চাচা চাচির মন মত হচ্ছিল না কারণ তারা কথায় কথায় আমার বাবার রেখে যাওয়া বিস্তর সম্পত্তির কথা জানতে চায় ! সবাইকেই চাচাচাচির লোভী মনে হয় !

আমি তখন অনেককিছুই বুঝতে পারি , কিন্তু সেসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আমার একদমই ইচ্ছে করেনা । আমি কিছুই বলিনা । আমি ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিই । চাচাচাচী একদিন একজন নির্লোভ ভালমানুষ পাত্র খুঁজে পায় আমার জন্য ! যে আমার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির কথা জানতে চায় না , যৌতুক নিতে চায় না , শুধুই আমাকে পছন্দ করে বিয়ে করতে চায়। এমন একজন ভাল মানুষ পাত্র দেখে চাচাজান আর দেরী করেন না । ঘরোয়া আয়োজনে আমাকে বিয়ে পড়িয়ে দেয় পাড়ার মসজিদের মুয়াজ্জিন রহমান মিয়াঁর সাথে ।

রহমান মিয়া ছিল আমার মতোই এতিম । সে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে মা বাবা ভাইবোন হারিয়েছে ।নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি , জমি হারিয়েছে ।তারও আমার মতো এই দুনিয়াতে কেউ ছিল না । ভীষণ রকমের নম্র ভদ্র আর বিশ্বস্ত স্বভাবের জন্য এলাকার সবাই স্নেহ করত রহমান মিয়াকে। তাঁর গলার স্বরও ছিল খুবই মিষ্টি , তাই মসজিদ কমিটি তাঁকে দেড়শ টাকার বিনিময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেবার চাকুরী দেয় । মসজিদের পিছনেই দুই কামরার একটা ঘরে রহমান মিয়াঁর সাথে আমার সংসার শুরু হয় ।

আমার নিজের পছন্দ, রুচি , মনমানসিকতা থেকে যোজন যোজন দূরের একজন ভিনগ্রহের মানুষ বলে মনে হত তখন রহমান মিয়াকে । আমি চোখ নাক বুজে মেনে নেয়ার প্রানপ্রন চেষ্টা করে যেতে থাকি , হয়তবা দেখার চেষ্টা করি ঠিক কি এবং কেন আমার নিয়তিটা এমনই হল !! এছাড়া আসলে তখন আমার হাতে আর কোন উপায় ছিল না ।

রহমান মিয়া অবশ্য তখনো আমাকে যথেষ্ট সন্মানের সাথেই সময় দিতে থাকে ! বলাযায় , বিরল এক সন্মান জানিয়ে আমাকে হতবাক করে দেয় ! বিয়ের প্রথমরাতে যখন আমি দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে রহমান মিয়াঁর কাছে , নিজের নিয়তির কাছে সঁপে দিতে প্রস্তুত , ঠিক তখন সে আমাকে হেসে বলে
” আমি তোমাকে সারাজীবনের জন্যই বিয়ে করেছি । তুমি সময় নাও । আমাকে ভালবাসতে সময় নাও । আমি অপেক্ষা করব । ভালবাসা দিয়েই তোমাকে জয় করব “। অনেক অনেক দিন পর সেইরাতে অজানা , অচেনা , অপছন্দের একজন হুজুর টাইপের মানুষের সামনে হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম আমি ।

আমি রান্না করতে একদমই পারতাম না । চাচী আমাকে রান্না করতে বা কোন কাজই করতে দিত না তাই আমি ঘরের কোন কাজই পারতাম না। রহমান মিয়া চুলা জ্বালিয়ে আমাকে পাশে বসিয়ে রান্না করত । অসাধারণ স্বাদের হত সেই রান্না। আমি সারাদিন বিভিন্ন রকমের বই পড়তাম , রহমান মিয়া রান্না করত , ঘরের কাজ করত । ফাঁকে ফাঁকে আমার সাথে দেশবিদেশের নানারকম খবর নিয়ে , রাজনীতি নিয়ে গল্প করত । আমি কবিতার বই কোলে নিয়ে তাঁর হাত নেড়ে নেড়ে করা রাজনীতির গল্প শুনতাম ।

দেশে তখন কানাঘুষা শুরু হয়েছে । স্বাধীন একটা দেশের দাবি করতে শুরু করছে দেশের নিরীহ মানুষগুলো । উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হচ্ছে , রেডিওতে নিয়মিত সেসব শ্বাস রুদ্ধকর খবর প্রচার হচ্ছে । রহমান মিয়া গভীর আগ্রহ নিয়ে সেসব গল্প করে আমার সাথে । আমি দেখি তাঁর চোখ ঠিকরে কি অদ্ভুত একটা আলো বের হয়ে আসছে !! দেশপ্রেমের আলো !! মুক্তির আলো !! আমি অবাক হতে হতে মুগ্ধ হতে থাকি !!

কিছুদিন পর দেশের মানুষ সত্যি সত্যি একজোট হয়ে যায় । কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে হানাদার স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে ! আমি অবাক হয়ে একদিন দেখি, রহমান মিয়া রাতের অন্ধকারে চুলা জ্বালিয়ে বড় একটা পাতিলে খিচুড়ি বসায় , ডিম ভাঁজে !! আমি তাঁকে সাহায্য করতে গেলে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলে, মুক্তিবাহিনী আসবে !! খাবে , মসজিদে বিশ্রাম নিবে !! ওরা ফেরেশতা আসছে , দেশকে মুক্ত করার জন্য একদল ফেরেশতা নেমেছে এই দেশেরই জমিনে !! আমি রহমান মিয়াঁর সাথে সাথেই উত্তেজনায় কাঁপতে থাকি !! সত্যি সত্যি একদল দুরন্ত যোদ্ধার দল আসে আমাদের ছোট্ট ঘরে সেদিন ! পরম তৃপ্তিতে খিচুড়ি আর ডিমভাঁজা খায় , মসজিদে বিশ্রাম নেয় । আমি অবাক হয়ে সেদিন দেখি নম্রভদ্র অমায়িক সেই মুখচোরা রহমান মিয়াঁর মুক্তিবাহিনীর উদ্দেশ্যে দেয়া রক্ত গরম করা ভাষণ !! অদ্ভুত এক গনগনে আগুণের গোলা দেখি এই অমায়িক নিরীহ মানুষটার চোখে মুখে !! তারপর সে ফেরেশতা রুপী যোদ্ধাদের হাতেতুলে দেয় মসজিদের ভিতরে মহাযত্নে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র !!

সেদিন আমার মনে হতে থাকে, আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বপ্নের নায়ক !! আমি আরকিছুই ভাবার দরকার মনে করিনা সেই সময়টাতে । আমি ভালবেসে ফেলি সারা দুনিয়ার কাছে চুপচাপ থাকা এক দুর্দান্ত দেশপ্রেমিককে , একজন আগুণের মত দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে থাকা যোদ্ধাকে , একজন সত্যিকারের প্রেমিক পুরুষকে !! সেইদিনই আমাদের দুজনের কানে কানে পুরো পৃথিবীটা প্রথমবারের মত আত্নসমর্পণ করে !! আমরা একে অন্যকে পুরোটাই পেয়ে যাই !!

আমি তখন ছয়মাসের প্রেগন্যান্ট । আমরা দুজনই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি একটা স্বাধীন দেশে আমাদের সন্তানের শুভ আগমনের দিনটির জন্য !! প্রথমবারের মত মা হবার এক অদ্ভুত শিহরন তখন আমার সারাশরীরে আর মন জুড়ে ! বাবা হবার সাথে সাথে স্বাধীন দেশের অপেক্ষার উত্তেজনায় অস্থির রহমান মিয়াও ।

দিনটি ছিল মঙ্গলবার , আমাদের জীবনে বিনামেঘেই বজ্রপাত নেমে আসে । দুইজোড়া চোখের স্বপ্নগুলো সব বিকট শব্দে খান খান করে ভেঙ্গেচুরে এই মাটিতেই মিলিয়ে যায়।

এলাকার রাজাকার সাথে করে একদল পাকিস্তানি হানাদার নিয়ে আসে আমাদের ছোট্ট উঠোনে । হানাদারগুলো জিজ্ঞেস করে এখানে অস্ত্র আছে কিনা , মুক্তিবাহিনী আসে কিনা ! আবার কবে আসবে তাদের জানাতে বলে । রহমান মিয়াঁর সুরেলা কণ্ঠ থরথর করে কাঁপতে থাকে । নম্র ভদ্র রহমান মিয়া কঠিন গলায় মিথ্যাকথা বলে জীবনে প্রথমবারের মত । সে বলে সে কিছুই জানে না । হানাদারগুলা বিশ্বাস করেনা । তল্লাশি করে পুরো ঘর এবং মসজিদ । মুক্তিবাহিনীর রেখে যাওয়া কিছু অস্ত্র পায় ওরা । হায়েনাগুলো সেদিন হিংস্র হয়ে উঠে , টেনে হিঁচড়ে উঠোনে নামিয়ে মারতে থাকে রহমান মিয়াকে ! আমাকে টেনে নিতে চায় দুইজন , রহমান মিয়া বাঁধা দেয় । ওরা আমার চোখের সামনে রহমান মিয়ার বুকের উপর বন্ধুক তাক করে , আমি পাগলের মত ছুটে যাই । হায়েনাগুলো বন্ধুকের বাট দিয়ে আমার পেটে আঘাত করে , আমি প্রচণ্ড ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে মাটিতে পড়ে যাই ।

বাংলার মাটি সেইরাতে ভিজতে থাকে আমার সন্তানের রক্তে ……আমার জরায়ুর তাজা রক্তে । জন্মের আগেই আমার সন্তান শহীদ হয় এই দেশটির স্বাধীনতার জন্য !! আমি চোখে অন্ধকার নিয়ে জ্ঞান হারাতে হারাতে প্রচণ্ড শব্দের গুলির সাথে শুনি আমার স্বামীও শহীদ হয়ে যাচ্ছে এই মাটির জন্য !!

আমার পুরো পৃথিবীটাই শহীদ হয়ে এই দেশটির জন্ম দিয়ে যায় !! আমি কিছুই চাইনা । শুধু একজন মা হয়ে এই দেশটির জন্য কিছু করে যেতে চাই । এই দেশটিতে এখনো অন্ধকারে থাকা কিছু মানুষের বুকে শিক্ষার আলো জ্বালানোর কাজটি করে যাচ্ছি গত চল্লিশ বছর ধরে । আমিও যে এই দেশটির মা ! আমার জরায়ুর রক্তে ভিজেই বাংলাদেশের জন্ম !!

তাসলিমা শাম্মী


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *