স্বপ্ন সৎকার

জং ধরা টিনের ট্রাঙ্কটা চৌকির নীচ থেকে বের করে কুলসুম। কতদিন পর খোলে ট্রাঙ্কটা…. মরিচা ঝুরঝুর! কানপাশাটা রাখা এখানেই।

পরম যত্নে হাত বুলোয়… ধীরে ধীরে।
পাশাটা পরা হয়নি কতদিন। কতদিন আয়নাও দেখা হয় না। কুলসুমের এখন দিনরাত কেমন এলোমেলো।
বিজলীর আজ মাস হয়ে এলো জ্বর। বয়স ছয় বছর। জ্বরে মেয়েটা দিনদিন শুকিয়ে যাচ্ছে। বাড়ী বাড়ী কাজ করে…. মেয়েটার যত্নআত্তি করা হয় না। গ্রাম্য ডাক্তারের ওষুধ বড়িও কম খাওয়ায় নি… মরার জ্বর মরেও না!
জয়নাল এসব কিছু পাত্তাই দেয় না। আছে জুয়ার নেশায়। ভ্যান চালানোর পর আছে খরচ… তাস না পেলে লুডুই সই। পয়সার নাচনে চলে খেলা…
ঘরে ফিরতে রাত। তারপর কড়ায়গন্ডায় বুঝে নেয় জৈবিক হিসাব… কুলসুম সেখানে পুতুলনাচের মঞ্চ সাজায়। হিসেব চুকিয়ে জয়নাল ঘুমপরীদের হাত ধরে চলে যায় ঘুমের দেশে।

বিজলী জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকে। কুলসুম জলপট্টি দিতে দিতে আল্লাহর কাছে বিচার
ডাকে। সকাল হতেই আবার কাজের তাড়া….

…. কানপাশাটা নেড়েচেড়ে রেখে দেয় কুলসুম। বড় শখ ছিল… এটা বিজলীর বিয়েতে দেবে। গরীবের শখ যে মহাজনের ঘরে হাত বদল হয়… কুলসুম সেটা জানে।
শুক্রবার চৌরাস্তায় বড় ডাক্তার আসে। অনেক টাকা দরকার ডাক্তার দেখানো আর চিকিৎসার জন্য….
কাজ শেষে ফিরেই কানপাশাটা বের করে কুলসুম। শ্রাবণ মাস.. আকাশ গুমোট। ক’দিন বৃষ্টি অনবরত।
বিজলী ঘুমে। জয়নাল জুয়ার আড্ডায়। মাথায় ঘোমটাটা তুলে কানপাশাটা নিয়ে হাঁটা দেয় কুলসুম। গ্রামের পথ দিয়ে গেলে জয়নাল হয়তো জেনে যাবে….. ক্ষেতের আইল ধরে হনহনিয়ে চলে কুলসুম। মহাজন কানপাশা পেলে নগদ টাকা দেবে।
রাত হয়ে আসে। টাকা নিয়ে কুলসুম ফিরছে… কানপাশাটা বড় প্রিয় ছিল।
আকাশ জুড়ে বিজলীবাতির ঝলক। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে…. বিদ্যুৎ চমকে আলো ছড়ায়। কুলসুম পা চালিয়ে হাঁটে…. কাল শুক্রবার। বিজলীকে বড় ডাক্তার দেখাবে।

ক্ষেতের চারদিকে মানুষের জটলা। সকাল হয়ে গেছে। ঠাঁটা পড়ে তালগাছটা পুড়ে গেছে। আর একটা নারীদেহ কয়লার মত কালো……
কাঁদাপানিতে একটা স্বপ্ন সৎকার!
বিজলী বাঁশীর মত সুরে কাঁদছে…. কান্নার জন্যও যে শরীরে তাকত লাগে।
জয়নাল কুলসুমের নাকছাবিটা খুঁজে পায়…

লোবান আর কর্পূর গন্ধে….. কয়লার মত একটা জীবনের ঘ্রাণ…. নিঃশেষ হয়ে বাতাসে মেশে….

-ফারহানা নীলা

Leave a Reply

Your email address will not be published.