মাই এক্স (৫ম পর্ব)

পিডিএফ ফাইলটা দেখে বুঝে গেলাম, সুমন কিভাবে ওর প্রতিশোধ নেবে। অযথাই ভাবছিলাম ছবি টবি নিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং করার প্ল্যান করছে। এমন সস্তা প্ল্যান কখনই ওর মাথায় ছিল না। ছবিগুলো ও রেখেছে কি না, তা ও সন্দেহ আছে। ওর প্ল্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার সংসারে ভাঙ্গন ওর উদ্দেশ্য না, ওর উদ্দেশ্য অন্য কিছু।

দ্রুত ভাবলাম। ছ’টা বাজতে এখনও ঘন্টা চারেক দেরী আছে। যাব কি না এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মন সায় দিচ্ছে না। মন বলছে, একবার ওকে ব্ল্যাকমেইলিং করতে দিলে, ও পেয়ে বসবে। দাবীর শেষ থাকবে না। আবার এটাও ভাবছি, একবার গিয়েই দেখি না, কি বলে। বাজে কিছু বললে, তখন না হয়…।
নাহ, এতো টেনশান করার চেয়ে, শাহেদকে সব কিছু জানিয়ে দেয়া অনেক ভাল। ও রিয়াক্ট করবে, আবার পাশেও দাঁড়াবে। সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা হয়তো আসবে, তবে সময়ের সাথে সাথে সেটা সরেও যাবে। কিছুটা যদি থেকেও যায়, সেটা সামলানো খুব সমস্যা হবে না।
শাহেদকে ফোন করলাম। রিং বাজছে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। দুপুর দু’টা। অফিসের ক্যান্টিনে খায়। এখন হয়তো খাওয়া দাওয়া করছে। সবার সামনে ফোন নাও ধরতে পারে। কোন কারণে আমার ফোন ধরতে না পারলে, ফ্রি হওয়ার পরে শাহেদ রিং ব্যাক করে। তাই শাহেদকে সাধারণত একবারের বেশি ফোন করিনা। বাট সমস্যাটাও জটিল। ওকে জানান দরকার। আজকে তাই নিয়ম ভাঙ্গলাম। আবার রিং করলাম। এবারও ধরল না। মনের ভেতরে জমে থাকা ভয়টা ছলকে উঠল। ঘটনাটা কি তাহলে ঘটে গেছে?
স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আমার বিট্রে টা ও ভুলেনি। ঘটনাটা যখন ঘটে, আমি তখন থার্ড ইয়ারে। সুমনের সাথে প্রেমের তখন দেড় বছর হয়ে গেছে। ইনিশিয়াল উচ্ছলতা তখন থিতিয়ে এসেছে। বিয়ের প্ল্যানিং শুরু করে দিয়েছি। সুমন মাস্টার্স দিয়েছে। ছাত্র ভাল ছিল, রেজাল্ট ভাল হবে সবাই আশা করছে। আর সেটা হলেই, ইউনিভার্সিটিতে টিচার হিসেবে ঢুকে যাবে। একটা স্কলারশিপের কথাও চলছে। জাপানে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করেই স্কলারশিপ নিয়ে জাপানে যাবে। এরমধ্যে আমারও ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যাবে। এরপরে কোন একফাঁকে দেশে ফিরে এলে আমাদের বিয়ে হবে, এমনটাই প্ল্যান ছিল।
এমন সময় দুর্ঘটনাটা ঘটল। ছাত্র রাজনীতি করার সুবাদে, অনেক শত্রু তৈরি করেছিল। শত্রু নিজের দলের সাবগ্রুপেও যেমন ছিল, অন্য দলেও ছিল। সরকারে তখন ওর প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল। ওরা বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাদের টার্গেট শুরু করল। ছাত্র গ্রুপটা আন্দোলনে গেল। সুমনও মিছিল মিটিং শুরু করে। একদিন সরকার অ্যাকশানে গেল। ওকে একটা আর্মস কেসে ফাঁসানো হল। শত্রু নিজ ঘরেই ছিল, তাই শক্ত কেস তৈরি করতে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। কোর্ট কেস শুরু হল। পুলিশ রিমান্ড চাইল। পেয়ে গেল। সেখানে সম্ভবতঃ বেশ ভালোই টর্চার করে। শর্ত দেয়, দোষ স্বীকার করতে হবে। শুরু হল ওর জেল জীবন।
আমার তখন পর্যুদস্ত অবস্থা। কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। ওর দলের যে দুএকজন নেতার সাথে কিছুটা পরিচয় ছিল, তাদের সাথে দেখা করে সুমনের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলাম। উনারা জানালেন, তেমন হোপ নেই। অন্তত এই সরকারের আমলে তো কিছু করার স্কোপ নেইই।
এদিকে আমার একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আসছে। আর আমি পরীক্ষার কথা বলে বলে এড়িয়ে যাচ্ছি। বাবা মা ঠিকই বুঝছেন, সুমনের জন্য এমনটা করছি। প্রথম প্রথম কেউই সেভাবে কিছু বললেন না। স্পেশালি বাবা আমার পক্ষে ছিলেন, মেয়ে যা চায়, তাই হবে। মা বিরক্ত ফিল করলেও মুখে কিছু বলতেন না। এরপরে একদিন বুঝতে পারলাম বাবাও বিরক্ত হতে শুরু করেছেন।
সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছিল, আমিও তত দ্বিধাগ্রস্থ হতে থাকি। ঠিক করে উঠতে পারি না, কি করব? সুমনের জন্য অপেক্ষা করব? করলে কতদিন? পরের ইলেকশান আসতে এখনও তিন বছর বাকী। এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে, ওকে বেরোতে দেবে না, এটা ততদিনে বুঝে গেছি। ওর দল থেকে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। ওরাও বুঝে গেছে, লাভ নেই। একটা না একটা কেসে ফাঁসিয়ে দেবেই। জেলে একবার সুমনের সাথে দেখা করতেও গিয়েছিলাম। সুমনই বলল, এখানে আর এসো না।
ফাইনালের তখনও মাস ছয়েক দেরী। ঠিক এমন সময়ে শাহেদের বিয়ের প্রস্তাবটা আসে। এদিকে বান্ধবীরা যারা ব্যাপারটা জানত, প্রায় সবাই একবাক্যেই বলল, সুমনের আর কোন ভবিষ্যৎ নেই। ওর জন্য অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না।
বাসায়ও অবস্থা পরিবর্তন হতে লাগল। সুমনের ব্যাপারটা শুরুতে আপত্তি না থাকলেও এখন ঘোর আপত্তি শুরু হয়ে গেছে। রাজনীতি করা ছেলে, কোন ভবিষ্যৎ নেই। আর জেল থেকে বের হওয়ার তেমন কোন লক্ষণ না দেখে, বিরোধিতা চরমে উঠল। বাবা মা অবশ্য সরাসরি কিছু বললেন না। বিয়ের জন্য ইমোশানাল প্রেসার দেয়া শুরু করলেন।
ব্যাপারটা হয়তো পরীক্ষার কথা বলে আরও কিছুদিন ঝুলিয়ে রাখা যেত। বাধ সাধল শাহেদ। আমাকে দারুণ পছন্দ। বিয়ের প্রস্তাবের উত্তরে যখন জানানো হল, সামনে পরীক্ষা তখন ও জানাল সে প্রয়োজনে ফাইনাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।
এরপরে ওর বাসা থেকে অফার আসল, আপাতত এনগেজমেন্ট করে রাখতে চায়। ব্যাপারটা বাবারও পছন্দ হল। বাঁধা দেয়ার তেমন কোন কারণ দেখাতে পারলাম না। আসলে তখন বোধহয় মন মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, জীবন আবার নতুন করে শুরু করব।
এদিকে মা প্রায় প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করেন, ‘কি ঠিক করলি’। বুঝলাম, এই পাত্র কেউই হাতছাড়া করতে চাইছে না। ভাল ছেলে, দারুণ প্রসপেক্ট। এমবিএ করা। ভাল একটা কোম্পানীতে ম্যানেজার। অচিরেই সিনিয়র ম্যানেজার হবে। মামা খবর নিয়ে এসে জানালেন, ফ্যামিলিও ভাল।
এমন সময় একদিন নিউমার্কেটে শাহেদের সাথে দেখা। রিয়েলি হ্যান্ডসাম। আলাপ হল। খারাপ লাগল না। জানতে চাইল, মাঝে মাঝে ফোন করলে বিরক্ত হব কি না। ‘জানি না’ বলে বুঝিয়ে দিলাম, অমত নেই। এরপরে মাঝে মাঝে মোবাইলে ফোন করত। একসময় ফিল করলাম, শাহেদকে পছন্দ করতে শুরু করেছি। শাহেদের সাথে যে আলাপ পরিচয় হয়েছে, ব্যাপারটা সম্ভবত শাহেদ ওর বাসায় জানায়। সেই সুবাদে দেখা গেল আমাদের বাসায়ও সবাই জানে। মা প্রায় প্রতিদিনই জানতে আসে, বলে, ‘আলাপ পরিচয় তো হয়েছেই, এখন আর অমত করছিস কেন?’
একসময় বুঝতে পারলাম, আমার নিজের ভেতরও প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ছে। আগের মত আর কড়া করে প্রতিবাদ করতে পারছি না। একদিন যখন মা জানাল, ‘ওরা আসতে চাচ্ছে, কি বলব?’ তখন আর প্রতিবাদ করলাম না। এনগেজমেন্টে মত দিয়ে দিলাম।
রাজনীতি করত বলে, সুমনের সাথে প্রেমের ব্যাপারটা খুব ক্লোজ কয়েকজন ছাড়া কেউই জানত না। প্রেমের ব্যাপারটা জানাজানি হলে ছাত্র সংসদ ভোটে মেয়েদের ভোট কমে যাবে, তাই প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। অনেকে সন্দেহ করলেও ডেফিনিটভাবে কেউই জানত না। লেডিস হোস্টেলে আসত, তবে মাঝে মাঝে। প্রেমটা আবছা রাখার জন্য অনেক মেয়ের সাথেই ও আলাপ করত। একসাথে খুব কম দিনই গাছের নিচে দাড়িয়ে গল্প করেছি।
সময় এগিয়ে গেল। একসময় ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হল। ততোদিনে আমি অনেকটাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। বিয়ের ব্যাপারে আর তেমন আপত্তি করিনি। বিয়ে যখন হয়, তখনও সুমন জেলে। একবার ভেবেছিলাম, ওর সাথে দেখা করে আমার পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে আসি। কিন্তু সাহসে কুলায়নি। ও যদি ব্যাপারটা মেনে না নেয়? যদি অপেক্ষা করতে বলে? তখন কি করব? সুমনের সাথে তাই আর দেখা করিনি।
কাজটা ঠিক করেছিলাম কিনা জানি না, তবে আজ, এতোদিন পরে শুরু হতে যাচ্ছে সেই ঘটনার কনসিকোয়েন্স। পুরো প্ল্যান করেই সুমন মাঠে নেমেছে। ও এমনই। ঠান্ডা মাথার খুনী। রাগের মাথায় ও কিছু করে না। প্ল্যান কষে, এরপরে সুযোগমত নিজের প্ল্যান এক্সিকিউট করে। মনে আছে, যে ছেলেটা আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে হুমকি দিয়েছিল, নিজের দলের হওয়া সত্ত্বেও সে ছেলেটাকে ও একটা আর্ম কেসে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল। পার্টিতে যেই ওর রাইভাল হয়ে উঠত, তাকেই ও কোন না কোন ভাবে ফাঁদে ফেলে সরিয়ে দিত। যেটা কখনও ভাবিনি, তা হচ্ছে, কোন একদিন আমিও হতে পারি ওর প্রতিশোধের টার্গেট।
কি করব? দেখা করতে যাব ছ’টার সময়? দেখা করে কি বলব? পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললে কি ও বুঝবে? কিংবা যদি অনুরোধ করি, যা হওয়ার হয়েছে, প্লিজ সব ভুলে আবার নতুন করে শুরু কর, শুনবে?
এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। আমার ফোনটা। শাহেদ রিং করেছে। ফোনটার দিকে তাকালাম। বুক ধকধক করছে। কি খবর দেবে শাহেদ? কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন আওয়াজ শোনা গেল
— কি ব্যাপার? এনিথিং রং?
এক মুহুর্তের জন্য মনে হল, বোধহয় ঘটেনি ঘটনাটা। আমিই ওভার রিয়াক্ট করছি। গলা যতটা সংযত করা সম্ভব, করে বললাম
— কেন? ফোন করতে পারি না?
— দুবার করেছিলে, তাই জানতে চাইছি, এনি ইমার্জেন্সি?
কি বলব? ব্যাপারটা জানতে চাইব? জানতে চাইলেই জিজ্ঞেস করবে, আমি কিভাবে জানলাম। কিন্তু সেটা ফোনে বলতে চাইছি না। সুমনের ব্যাপারটা ওকে আজই বলব। তবে সেটা ফোনে বলার মত বিষয় না। এটা নিয়ে ওর সাথে সামনাসামনি আলাপ করতে চাই। কিন্তু ব্যাপারটাও জানা দরকার। কি বলব ভাবছি এমন সময় শাহেদই আবার বলল
— আজ কি রান্না করেছ?
— চিংড়ি।
— গুড। আমি আসছি।
হঠাৎ বুকে ধক করে উঠল। এক মুহুর্তের জন্য মনে হল, ঘটনাটা বোধহয় ঘটে গেছে। ভয়ে ভয়ে কথাটা জানতে চাইলাম।
— অফিস?
— আজকে ছুটি নিচ্ছে। চিংড়ি ছুটি।
অর্থাৎ বলবে না। জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। উদ্ভট কোন এক্সকিউজ দেবে। তাই উত্তরে বললাম
— ঠিক আছে। এসো।
কথা আর না বাড়িয়ে ফোন রাখলাম। শাহেদকে যতটা চিনেছি, ঘটনাটা ঘটে থাকলেও, ব্যাপারটা ও আমাকে জানাবে না। অন্তত এখন না। জানাবে, তবে এমন সময় জানাবে, যখন ব্যাপারটার জন্য আমি টেনশান করব না।
এমন সময় সুমনের পাঠানো ফোনটায় ম্যাসেজ আসল। সেদিকে তাকালাম না। সুমনের রেভেঞ্জের আউটলাইন আমি ধরে ফেলেছি।
আই নিউ ইট ফর সিওর, ঐ মোবাইলে এক লাইনের একটা ম্যাসেজ এসেছে। লেখা আছে
‘হি হ্যাজ বিন স্যাকড।’

চলবে….

-রাজিয়া সুলতানা জেনি

Leave a Reply

Your email address will not be published.