মাই এক্স (২য় পর্ব )

গাড়ীতে পুরো রাস্তা আপ্রাণ চেষ্টা করলাম, নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে। পারলাম না। শাহেদ আমার দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল, সামথিং ইজ রং। একবার জিজ্ঞেসও করল, ‘এনিথিং রং?’ আমি স্মিত একটা হাসি দিলাম। যার বাহ্যিক মিনিং দাঁড়ায়, ‘তেমন কিছু না’ আর সত্যিকারের মিনিং দাঁড়ায়, ‘আই অ্যাম রিয়েলি ইন ট্রাবল।’। শাহেদকে ফাঁকি দেয়া এতো সোজা না। ও ঠিকই বুঝল, প্রব্লেমে আছি, তবে এই মুহুর্তে বলতে চাইছি না। স্পেশালি ওকে। ব্যাপারটা নিয়ে শাহেদের সাথে পরে ডিল করা যাবে।
শাহেদ দু একবার অন্য প্রসঙ্গ আনবার চেষ্টা করল। ‘শেলিদের একদিন দাওয়াত দেয়া উচিত’ টাইপ টপিক ওঠানোর চেষ্টা করল। আমার তরফ থেকে তেমন কোন সাড়া না পেয়ে, বুঝে গেল, টপিক ঠিক থাকলেও সময়টা ঠিক উপযুক্ত না। ও আর কথা বাড়ায়নি। আমিও চুপচাপ থাকলাম। তবে এটাও জানি, আজকের বিহেভিয়ারের ব্যাখ্যা ওকে দিতে হবে। আমাকে সন্দেহ করছে, এমন না। ও সিওর আমি দারুণ লোন প্রব্লেমে পড়েছি, আর সেটা থেকে উদ্ধারের জন্যই ও ডিটেলস জানতে চাইবে।
বাসায় ফিরে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলাম। রুমে থাকলেই শাহেদ আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। মুখে প্রশ্ন না করলেও, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বুঝিয়ে দেব, ‘টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড’। এটাই এখন চাইছি না। শাহেদকে অ্যাভয়েড করার এখন একটাই উপায়, একটা লম্বা শাওয়ার নাওয়া। শাওয়ারে আমি অনেক সময় নিই, এটা শাহেদ জানে। তাই, ‘খুব টায়ার্ড লাগছে, একটা শাওয়র নেব ভাবছি’ বলে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।
ভয় হচ্ছিল, এই অবস্থায় ওর সামনে আর কিছুক্ষণ থাকলে ধরা পড়ে যাব। চাইলেও আমি স্বাভাবিক হতে পারব না। ঘন্টা খানেক এখানে কাটানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এখনও আমার ভয়ে হাত পা কাঁপছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। কি করব এখন? সুমন যে আমার জীবনে এভাবে ফিরে আসবে, কখনও ভাবিনি।
আজকের পুরো ঘটনা ভাবতে দিয়ে দেখলাম, নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। কেন আসলাম এই বিয়েতে? শেলির ওপরই বরং রাগ উঠছে। ও যখন জানেই, সুমন আসছে, আমাকে সেটা জানাল না কেন? ও তো জানেই আমাদের ভেতর কি হয়েছিল।
মুহুর্তটা ভাবতে এখনও গা কাঁপছে। সুমন যখন বলল
— মনে আছে? আমি সুমন, ইয়োর এক্স…
তখন এক মুহুর্তের জন্য মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। উত্তর দিতে গিয়ে দেখলাম কথা খুঁজে পাচ্ছি না। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে অবশেষে কেমন করে যেন বললাম
— কেমন আছ?
কথাটা শুনে একটা বাঁকা হাসি দিল সুমন। এরপরে বলল
— সত্যিই জানতে চাও?
বুঝতে বাকী থাকল না, সুমন স্কোর সেটল করার মুডে আছে। চোখে ঘৃণা না ক্রোধ বুঝতে পারছি না, তবে অবস্থা সুবিধার মনে হচ্ছে না। এরকম অনুষ্ঠানে, সবার সামনে হয়তো সিন ক্রিয়েট করবে না, বাট আমাকে ছেড়ে দেবে না। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছিল। কোন রকমে বললাম
— আমাকে আজকে যেতে হবে। ওর…
— ওর সকাল সকাল অফিস, আমি জানি।
সুমন ওর অবস্থান থেকে সরছে না। বেশ অকওয়ার্ড অবস্থায় আছি আমরা দুজন। একটু দূরত্ব তৈরী করা জরুরী। আমি পিছাতে পারছি না। জায়গা নেই। শেলির কাছে অন্য কেউ এসেছে, ওর পিঠ আমার পিঠের সাথে লেগে আছে। সামনে সুমন এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যে আমিও বেরোতে পারছি না। মুখে কাতর একটা ভাব নিয়ে বললাম
— প্লিজ সুমন। সবাই দেখছে।
ঠোঁট বাঁকা করে একটু হাসল সুমন। এরপরে বলল
— সরে যেতে বলছ?
দ্রুত চিন্তা করলাম। না বললে, ওর জেদ বেড়ে যাবে। হ্যাঁ বললে, ফোন নম্বর চাইবে। আর নয়তো…। সিদ্ধান্ত নিলাম, সফটলি ডিল করতে হবে। মুখে হাসি টানবার চেষ্টা করে বললাম
— এসো না একদিন বাসায়।
— সিওর?
সুমনের চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝলাম, কথাটাকে ও ফর্মালিটি হিসেবে নিচ্ছে না। ও আসবে। মাথা এখন আর কাজ করছে না। এই মুহুর্তে সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে এখান থেকে দ্রুত সরে যাওয়া। কথা বললেই কথা বাড়বে। উত্তরে তাই ‘হ্যা’ ‘না’ কিছু বলতেই সাহস পেলাম না। অন্য আলাপের তো প্রশ্নই ওঠে না। এতোদিন পরে ইউনিভার্সিটির অন্য কারো সাথে দেখা হলে এখন কোথায় আছে, কি করে, এতোদিন কোথায় ছিল, এসব প্রশ্ন করতাম। কিন্তু এখন, এসব প্রশ্ন করার কথা ভাবতেও পারছি না। স্বাভাবিক ভদ্রতা টাইপ কিছু বলার কতাহ মাথায় আসবার সুযোগও পায়নি। মুখ দিয়ে একটা কথাই বেরোল
— আসি?
বিদায় নেয়ার জন্য কিছু একটা বলা দরকার, তাই বললাম। সুমন কিছুটা সরে রাস্তা করে দিল। এরপরে আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালাম না। খুব দ্রুত না হলেও স্বাভাবিকের আপার লিমিটে গিয়ে হাঁটলাম। শাহেদকে যেখানে লাস্ট দেখেছিলাম, সোজা সেদিকে হাঁটা দিলাম।
পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারছি, সুমন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। ফিরে আসাটা দেখছে। হাঁটার তালে তালে আমার খোলা চুল উড়ছে, কোমর দুলছে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে। চোখে হয়তো কিছুটা আনন্দ। আমার ভয় পাওয়াটা ও এঞ্জয় করেছে।
ব্যাপারটা এখানেই থামবে না। কি হবে এই মুহুর্তে ভাবতে সাহস পাচ্ছি না। এখন একটাই চিন্তা, দ্রুত এখান থেকে বেরোতে হবে। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা শাহেদের কাছে এলাম। ও তখন বেশ কিছু শ্রোতা যোগাড় করে ফেলেছে। বেশ খোশগল্পে মত্ত । যথারীতি বাকীরা বেশ সমীহ ভরে শুনছে। অন্য যেকোন সময় হলে, ব্যাপারটা দেখে বেশ পুলক অনুভব করতাম। এখন ব্যাপারটা এঞ্জয় করার মত অবস্থায় আমি নেই। শুধু তাই না, এই প্রথমবারের মত ব্যাপারটাকে বিরক্তিকর লাগল। দ্রুত ওর কাছে গিয়ে বললাম
— চল অনেক রাত হয়েছে।
শাহেদ বেশ অবাক হয়ে বলল
— এখনই যাবে?
ওর হাত ধরলাম। চোখের ইশারায় বোঝালাম, ‘আই মিন ইট’। শাহেদ আমার দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল, সামথিং ইজ রং। ও আর তর্ক করল না। ফোন বের করে ড্রাইভারকে ডাকল। এরপরে আমার দিকে তাকাল। বোঝাতেই চাইল, ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে সামনে আসুক, তারপরে বেরোই। কি করব, দ্রুত একবার ভাবলাম। এখানে থাকা মানেই সুমনকে আরেকবার সুযোগ দেয়া। দেখা যাবে, এখানে এসে, নতুন কোন সিন ক্রিয়েট করছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। শাহেদের হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলাম।
এই বছর দেড়েকের বিবাহিত জীবনে এমনটা কখনও করিনি। শাহেদ যে আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে, সেটা স্পস্ট বুঝতে পারছি, তারপরও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলাম না। কিছু একটা হয়েছে, ব্যাপারটা শাহেদও বুঝল, তবে জানতে চাইল না।
বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার সেরে যখন বেরোলাম, দেখলাম শাহেদ ঘুমিয়ে গেছে। মনে মনে বোধহয় এটাই চাইছিলাম। শাহেদ একটু ঘুমকাতুরে আছে। বিছানায় শুলে, ঘুমাতে সময় লাগে না। মনে হল, বুকের ওপর থেকে একটা বোঝা নেমে গেল।
একটু সময় পেলে নিজেকে সামলে নিতে পারব। সুমনের আসাটা এতোটাই আচমকা ছিল যে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আরেকটা ভয় অবশ্য কাজ করছিল। ও কি করবে। যেমন ডেসপারেট টাইপের ক্যারেক্টার, সবার সামনে সিন ক্রিয়েট করা অসম্ভব না। আর ওর সাথে আমি যা করেছি, সেটা ভুলে যাওয়ার ছেলে ও না। আমার ধারণা ও ফিরেও এসেছে, সে কারণে।
সন্তর্পনে বিছানায় উঠলাম। শাহেদের ঘুম তেমন পাতলা না যে একটু আওয়াজে উঠে যাবে, তারপরও, আজকে কোন ঝুঁকি নিলাম না। ধীরে ধীরে ওর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। শোয়ার সময় মোবাইলটা আমি বেড সাইড টেবিলে রাখি। আজ কেন যেন বালিশের নীচে রাখলাম। মন বলছে, সুমন আমার মোবাইল নম্বর যোগাড় করে ফেলবে। ফোনও করবে।
শেষবারের মত চোখ বোলাবার জন্য মোবাইলটা চোখের সামনে ধরলাম। বাটন টিপে স্লিপ মোড থেকে বের করে আনলাম। লকড স্ক্রিনে বেশ কয়েকটা ম্যাসেজ এসে বসে আছে। কিছু আছে মোবাইল কোম্পানীর প্রমোশানাল ম্যাসেজ। নজর সরিয়ে ফেলতে যাব, এমন সময় নজরে পড়ল ম্যাসেজটা। ছোট্ট একটা একলাইনের ম্যাসেজ।
‘আগামীকাল সন্ধ্যে ছ’টায়, কফি হাউজে’

চলবে…

-রাজিয়া সুলতানা জেনি

Leave a Reply

Your email address will not be published.