ভাষা

এটা গল্পের একটা ভূমিকা। নারীদের কাছে বাসা একটি বড় ব্যাপার। পাখিদের মধ্যেও এরকম ব্যাপার আছে। পুরুষ অয়েভার পাখি তার সঙ্গিনীকে খুশি করার জন্যে একবার না চারবার বাসা বাঁধে। বাসা পছন্দ না হলে সঙ্গিনী তাকে ছেড়ে চলে যায়। আমার বেলায় অবশ্য এরকম হয়নি।

আজকের আসল গল্পটি ভাষা নিয়ে। গল্পটি কুড়ি বছর ধরে মাথায় ঘুরছে। তো কি হলো – বাসার চাবি হাতে পাবার পর রেনোভেশনের কাজ ধরাবো, কনট্রাকটর ডাকা হল। প্রথম জনের কোটেশন দেখে চোখ ছানাবড়া, ফিফটি থাউজেন্ড ডলার। ২৫ হাজার ডলার শুধু কিচেন কেবিনেটেই লাগবে। দ্বিতীয় জন এলো ৪০ হাজার ডলারের ফর্দ নিয়ে।

তৃতীয় জন আমাদের ভাড়া বাসায় পা দিয়েই আমাকে জড়িয়ে ধরল। একজন অচেনা পুরুষ আরেকজন পুরুষকে জড়িয়ে ধরছে ২০ বছর আগে এ রকম ব্যাপার খুবই অস্বাভাবিক ছিল। এখন অবশ্য গে ম্যারেজ-টেরেজ দেখে আমাদের চোখ কিছুটা সয়ে এসেছে। আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

কি ব্যাপার! ডু আই নো ইউ? কনট্রাকটর বলল,
-নো ইউ ডোন্ট নো মি। বাট আই নো ট্যাগর। আমি যখন তোমার বাসায় ঢুকে দেয়ালে ট্যগোরের ছবি দেখলাম আই আণ্ডাস্টুড ইউ আর বেঙ্গলি। ডু ইউ নো আই এম এ বেঙ্গলি টু। মাই নেম ইস আনোয়ার হোসেন।

-তাই নাকি! তুমি বাঙালি? যাক ভালই হলো তাহলে…

-বাট আই কান্ট স্পিক বাংলা, আই ফরগট অল দ্যা ওয়ার্ডস। শুধু – কেমন আছ – ভাল আছি, দ্যাটস আই রিমেমবার। এন্ড রিমেমবার ট্যাগর। বাবার কাছ থেকে পাওয়া এই একটা জিনিসই আমার কাছে আছে। মাই ফাদার…

বাবার কথা মনে করেই লোকটা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। আমি তাকে হাত ধরে সোফাতে বসাই। কণা তাকে জুস এনে দেয়। লোকটা ধাতস্থ হবার পর যে কাহিনী বলল সেটা অনেকটা এরকম… আনোয়ার হোসেনের বাবা সোহরাব হোসেন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু মারা যাবার পর সোহরাব হোসেন সিঙ্গাপুরে চলে আসেন। তখন এখানে বাঙালি তেমন কেউ ছিল না। তারপর সোহরাব হোসেন এক মালে রমণীকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে এখানকার মালে সোসাইটির সাথে মার্জ হয়ে যান। ছোটবেলায় বাবা তাকে বাংলাদেশের গল্প বলতেন, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতেন আর রবীন্দ্রসংগীত শোনাতেন। বাবার স্মৃতি বলতে – রবীন্দ্রনাথের একটা ছবি এখনো নাকি আনোয়ার হোসেনের বাসায় আছে।

-তুমি কখনো বাংলাদেশে যাওনি?
-টু টাইমস আই ওয়েন্ট দেয়ার?
-কোথায়, হোয়ার ইন বাংলাদেশ?
-এবাউট টেন কিলোমিটার ফ্রম দ্যা এয়ারপোর্ট। আই রিমেমবার দ্যা নেম… যা ত্রা বা ড়ি…
-ও আচ্ছা। যাত্রাবাড়ী আমাদের বাসা থেকে খুব কাছে।
-আই হেড এ লট অফ অ্যান্টিস…দে লাভ মি সো মাচ…আফটার মাই ফাদার’স ডেথ আই লস্ট কন্টাক উইথ দেম। ইউ নো দ্যাট প্লেস?
-ইয়েস নিয়ার টু আওয়ার প্লেস
-রিয়েলি?
-হু
-কেন আই কল ইউ মাই ব্রাদার?
আমি হেসে বলি সিউর, অবশ্যই পারো।
-‘ইউ আর মাই ব্রাদার… ইন বেঙ্গলি হোয়াড ডু ইউ সে?
-বাংলায় বলতে হয় – তুমি আমার ভাই। আনোয়ার বাংলায় বলার চেষ্টা করে তু……মি আ মা ড় ভা…ই
-আমাড় না ‘আমার’ – তুমি আমার ভাই।
-তুমি আমার ভাই … ইউ আর মাই ব্রাদার…আই রিমেমবার, মাই ফাদার ওয়াস সিংগিং এ সং আই স্টিল রিমেমবার দ্যাট সং। কেন আই সিং দ্যাট সং?
-সিউর..
-আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায়, হায় রে— ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি॥
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো— কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে। মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো, মরি হায়, হায় রে— মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি॥

গান শেষ হলো, আনোয়ার সত্যি সত্যিই নয়ন জলে ভাসছে। এত বড় গান সে কি করে মনে রাখল সেটাও এক বিস্ময়। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-হাউ ইউ রিমেমবার দ্যা সং?
-মাই ফাদার এভরিডে সিং দিস সং, আই সিং এলং ইউথ হিম। প্রতি বছর বাবার ডেথ এনিভারসারিতে আমি বাবাকে স্মরণ করি আর এই গানটি গাই। ইউ সি মাই আই ডি কার্ড, মাই রেস ইস ‘বেঙ্গলি’।

আমি হাতে নিয়ে দেখি আনোয়ার হোসেনের আইডি কার্ডে রেস লেখা আছে Bengali।বাংলা ভাষা আর নিজেকে বাঙালি পরিচয় দিতে এতটা উচ্ছ্বসিত হতে আমি আর কাউকে দেখিনি। ভাষা না থাকলে মানুষ আনোয়ারের মতোই হারিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.