নারী কথন

মানলাম আপনি একজন মেয়ে। আপনি তো শিক্ষিত হয়েছেন। হ্যাঁ, আমি শিক্ষিত বাঙালি নারীদেরকেই বলছি। আপনাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই শিক্ষিত হলেও অজ্ঞদের সাথে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। একজন মেয়ে হয়ে এই কথা কেন বলছি? আসুন, আলোচনা করা যাক।
আপনাদের ফেসবুক একটিভিটি দেখলেও আপনাদের মানসিক দৈন্যতা সম্পর্কে একটা মোটামুটি আইডিয়া পাওয়া যায়। ফেসবুকে আপনাদের সারাদিনের আলোচনার বিষয়বস্তু-
১. শপিং
২. রূপচর্চা
৩. রান্না
৪. বিএফ/জামাই
কোন ক্রিম ব্যবহার করলে মুখের কালো চামড়া সাদা হবে, ব্রণ যাবে, চুল পড়া কমাতে, চুলকে আলকাতরার মত কালো করতে কোন কোন উপাদান ব্যবহার করতে হবে, কোন জামার কোন চুমকি কত টাকা দিয়ে কেনা, কোন জামার হাতা কতটুকু হলে ট্যান্ড মানা হবে,
কোন মাটি মুখে মেখে বসে থাকলে ক্যাটরিনা কাইফ হয়ে যাওয়া যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সিরিয়াসলি?! কিভাবে পারেন এসব নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকতে? এসব নিয়ে আলোচনা করা যাবে না তা বলছি না। কিন্তু চব্বিশটা ঘন্টা?
দেশ যদি রসাতলেও যায় এই আপুরা হাতে আয়না ধরে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাবেন, বাহারি ডিজাইনের হিজাব খুঁজবেন অনলাইনে, আর একে অপরের সাথে গসিপ করবেন নিজেদের বিএফ নিয়ে। বেশিরভাগ গার্ল কমিউনিটিতে এসব আলোচনাই থাকে সারা বছর।
বিশ্বের কোনো বিষয় নিয়ে এমনকি কোনো মানবিক বিপর্যয় হলেও দেখা যায় খুব কম মেয়েদেরই সেসব নিয়ে চিন্তা থাকে, মেয়েরা ঠিক উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে পড়ে থাকে।
আমি খুব কম মেয়েকেই দেখেছি যারা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে, চাকরির দুষ্প্রাপ্যতা নিয়ে দুশ্চিন্তা করে কিছু লিখছে। খুব কম মেয়েই দেশ নিয়ে, সাম্প্রতিক বিশ্ব ভূ-রাজনীতি নিয়ে ভাবে, দেশের অর্থনীতি, শিল্পসাহিত্য নিয়ে ভাবে। এমনকি ধর্মীয় বিষয়ে মেয়েদের জ্ঞানও ভীষণ সীমাবদ্ধ। কোনো মেয়েকে যদি ইসলামের ইতিহাস, হাদিস, ইসলামের যুদ্ধসমূহ, খলিফাদের শাসন এসব বিষয়ে প্রশ্ন করেন বেশিরভাগই উত্তর দিতে পারবে না। ওনারা মনে করেন মাথায় বাঁধাকপির মত ফুলিয়ে বাহারি ডিজাইনের হিজাব পরলেই ধর্মচর্চা হয়ে যায়!অথচ ইসলামও মূর্খের প্রার্থনার চেয়ে জ্ঞানীর ঘুমকে উত্তম বলে।
এবার আসা যাক মেয়েদের সামাজিক অবস্থা নিয়ে মেয়েরা কতটা সচেতন সেই বিষয়ে। কোথাও কোনো মেয়ে হ্যারেজ হলে ছেলেরা যতটা উদ্বেগ প্রকাশ করে, মেয়েরা ততটাও প্রতিবাদ করে না।
মেয়েদেরকে আমি কখনো দেখি নি কোনো হ্যারেসমেন্টের সম্মিলিত প্রতিবাদ করতে। ফেসবুকে এত এত সাধারণ মেয়েদের বিশাল প্লার্টফর্মের গার্লস কমিউনিটি, কোনো হ্যারেসমেন্টের প্রতিবাদে এইসব কমিউনিটি একটা মানববন্ধন করে না। বরং তখনো মেয়েরা সেই সাজগোজ, ফ্যাস্টিভাল নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
আজ অন্য একটা মেয়ে হ্যারেস হলে আপনি শপিং, সাজসজ্জা আর ফেস্টিভাল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কালকের মেয়েটি আপনি নয় তো?
মাঝেমাঝে এদেশের শিক্ষিত মেয়েদের বৃহৎ একটা অংশকে আমার এলিয়েন মনে হয়!
কোনো কিছু নিয়ে কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই, সস্তা আলাপে দিনরাত মজে থাকাই যেন ওনাদের কাজ!
আমি কেন এসব বলছি আজ? আমি সবসময় মেয়েদের জন্য লিখে এসেছি। মেয়েদের সামাজিক যে নড়বড়ে অবস্থান তার পেছনে সব দায় ছেলেদের নয়। শিক্ষিত মেয়েরাই যখন মেয়েদের নেতৃত্ব দেবার অযোগ্য হয়, শিক্ষিত হয়েও যখন মূর্খের ন্যায় আচরণ করে, তখন অসচেতন অংশের অগ্রযাত্রার পথ আসলেই অনেক কঠিন হয়ে যায়।
বিশাল প্লাটফর্মে একসাথে দাঁড়িয়ে এদেশের শিক্ষিত মেয়েরা “সস্তা মেয়েলি বিষয়” নামে পরিচিত বিষয়গুলো নিয়ে সারাক্ষণ মেতে না থেকে সামাজিক একতা গড়ে তুললেই কেবল নারীদের এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। নতুবা ব্যক্তিগতভাবে অনেক মেয়ে সমাজের উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠিত হলে একত্রে নারী সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়।
জান্নাতুন নুর দিশা

Leave a Reply

Your email address will not be published.