নপুংসক ( ৯ম পর্ব )


‘কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য!!’

গত দশ মিনিটে মতিন এ কথা ছয়বার বলেছে। আমি রেগে গিয়ে বললাম,

‘একই কথা আর কতবার বলবি? বিরক্ত লাগছে শুনতে।’
মতিন আমাকে প্রায় ঝাড়ি দিয়ে বলল,

‘তুই একবার ভেবে দেখেছিস, একটা ছেলেকে নেংটো করে একদল হিজড়া নাচানাচি করছে, আর রাস্তার লোকজন দল বেঁধে তা দেখছে? ছেলেটার অবস্থাটা একবার চিন্তা কর। আমি চোখের সামনে দেখছি, কি ভয়ঙ্কর…!!’

‘চুপ কর, আর একবার এই কথাটা বলেছিস কি, আমি তোকে ‘শ্যুট’ করবো’

‘শ্যুট’ তুই কি আমাকে করবি শালা? মামুন তোকে করবে। শালার হিজরাগুলারে সাবধান থাকতে বলিস’

‘শালা হিজড়া….’ বলে আমি হেসে ফেললাম। মতিন বুঝতে পেরে সেও হেসে উঠে বলল,

‘রুনুকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে ফেল,নইলে আবার কোন ঝামেলা হয়!!’

‘বিয়ে দিতে ছেলে পাব কই? তুই করবি?’ বলেই আমি চুপসে গেলাম। মতিনও হাসি থামিয়ে আনমনা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে উঠে গেল।

আমি বসে রইলাম মীরার অপেক্ষায়। ওর কলেজ থেকে ফেরার সময় হয়েছে। ছুটির দিন সকাল সকাল মতিনের বাসায় এসেছি মনে মনে ঠিক করে যে, আজ আমি ওকে কিছু কথা বলবো।

কেউ যেন একটা ঠান্ডা শীতল হাত আমার গায়ে রাখলো। আমি বুঝতে পারলেও চোখ মেলে তাকাতে পারছি না। বরং গভীর ঘুম আরও গভীর হলো। আমি স্বপ্ন দেখতে লাগলাম-

গায়ে রাখা হাতটা মীরার। আমার ওর হাতটা বড় অশুচি লাগছে। আমি পাশ ফিরে মীরার মুখোমুখি হলাম। মীরার প্রতি প্রচন্ড ঘৃণাবোধ নিয়ে বললাম,

‘জানো, জীবনের প্রয়োজনে সব মেয়ে পতিতা হতে পারে না। কিছু মেয়ে পারে,যাদের শরীরের আবেদন বেশি। এরা চলতে ফিরতে নানা অঙ্গভঙ্গী করে সে আবেদন প্রকাশ করে ছেলেদের সামনে। এখন কোন ছেলে যদি ঝাঁপিয়ে পরে বলো তার দোষ কি?’

মীরা বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো তারপর বলল,
‘তুমি এসব কি বলছো? শরীর,আবেদন… এসব কি? তুমি আমাকে এটা বলতে পারলে?’

‘হ্যা, পারলাম। তুমি বুঝতে পারছো না, আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছি না?’ মীরার স্থির হতবাক হওয়া চোখ থেকে পানি নেমে এলো।

স্বপ্নের দৃশ্য পরক্ষণেই পাল্টে গিয়ে দেখলাম মীরা আমি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে। মীরা পিছন ফিরে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এক পশলা পানি ছিটে এলো আমার শরীরে। কি ঠান্ডা পানি! আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখলাম, খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ঠান্ডা পানি আমার গায়ে পড়ছে। আমি উঠে বসলাম। ঘুমানোর আগে পড়া মায়ের ডায়েরির লেখাটুকু কি বাস্তব, কি সত্যিই না লাগছিল স্বপ্নে! বাবার কথাগুলো মা’কে কি ভয়ঙ্করভাবেই না দংশন করছিল! আহা, কি কষ্ট! কি কষ্ট!

কিন্তুু বাবা, তার কি ঘৃণা! ঘৃণার কি কঠিন শক্তি,একটা জীবনকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে শেষ করতে পারে বিনা দ্বিধায়! আমার মীরার প্রতি এতটা ঘৃণা লাগছিল যে, আমি ওকে বাঁচাতে চেষ্টা করলাম না। বরং ভাল লাগছিল। নিজেকে মুক্ত লাগছিল।

এতটাই ঘৃণা কি বাবা মাকে করতো? তাই তার উপস্থিতেই তিনি আবার বিয়ে করে এনে তার আক্রোশ প্রকাশ করেছিলেন। আর মা তার সমস্ত অপমান মাথায় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। মায়ের যাওয়াতে তাই বরং বাবা খুশি হয়েছিলেন। কিন্তুু কেন? আলতাফ চৌধুরী যতটা তার প্রতি অন্যায় করেছিল বাবা তো তার চেয়ে কম অন্যায় করেনি!! উফ্, কি অসহ্য লাগছে!! কি ভাবছি আমি?

আচমকা বিদ্যুতের আলোয় দেখলাম, মা দেয়ালের সাথে লাগানো চেয়ারটায় বসে আছেন।
‘কেন বিরক্তি হচ্ছে তোমার বাবলু? যা মনে করছো, ভাবছো সব তো সত্যি’
আমি আবছা আলোয় তার মুখ দেখলাম। কি অনুভূতিহীন নিরেট একটা মুখ। বললাম,

‘তুমি আইনী ব্যবস্থা নিলে না কেন মা?’

‘আমি চেয়েছি,খুব চেয়েছি। অস্থির অশান্ত হয়েছি। তোমার বাবা তখন আমাকে বুঝিয়েছিলেন, ঘটনাটা সবাই জানলে সে সমাজের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। আমাকে তোমাকে তাহলে ছেড়ে সে চলে যাবে।
আমার মা-বাবা পরিবারও তা চায়নি। কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। এই যে, রুনুর ব্যাপারটা জানার পর তোমরা কি করতে পেরেছিলে?’

আমি কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম, চুপ করে রইলাম। মা বললেন,

‘নিজেদের বিপদের কথা না ভেবে হিজড়াগুলো একটা দারুণ কাজ করেছে। রুনুর এখন ধুমধাম করে বিয়ে হবে। মেয়েটা অনেক সুখি হবে’।

আমি তখনও চুপ করে রইলাম।

কিছুক্ষণ চুপকরে থেকে যেন নিজের সাথে নিজে কথা বলছেন, এভাবে মা আবার বললেন,
‘তোমার বাবা স্ত্রী, কন্যা কারও জন্য উপযুক্ত না। সে হিজড়া থেকেও নগন্য, নিম্নশ্রেণীর একজন নপুংসক’।

চলবে……

-বেলা প্রধান


Leave a Reply

Your email address will not be published.