নপুংসক ( ৪র্থ পর্ব )


বিকেল বেলায় অলস শুয়ে আছি। দিন কাটছে একধরণের ঘোরের মধ্যে যেন আমি অসুস্থ। বোধশক্তিহীন মানুষ। কোন কিছু যেন আমাকে স্পর্শ করছে না। সবসময় মায়ের ডায়রি পড়ে সেই জীবনে ডুবে থাকি। যেন দৃশ্যমান মুভি চলছে সামনে আমি একা দর্শক।

বসার ঘরে তিন তলার নাজমা আন্টি ছোটমা’র সাথে গল্প করছেন। তিনি প্লেটে করে রসগোল্লা নিয়ে এসেছেন খুশির খবর দিতে। তার মেয়ের বিয়ের দিন তারিখ হয়েছে। কেমন ঘরে মেয়ে যাচ্ছে তার বিশদ বণর্ণা করছেন তিনি। কথার একফাঁকে আন্টি ছোটমাকে বললেন,

‘ছেলেকে বিয়ে করাবেন না ভাবি?’

মা উদাস গলায় বললেন,’কর্ম-ধর্ম নাই ছেলের বিয়ে করালে মেয়ে দেবে কে?’

আন্টি উচ্ছাসভরা কন্ঠে বললেন,’এমন রাজপুত্র ছেলের মেয়ের অভাব নাকি?’

‘শুধু শুধু চেহারা ধুয়ে পানি খাওয়ার জন্য তো কোন মেয়ে আসবে না, তাইনা?’

আন্টি বোধহয় একটু অবাক হলেন সে কথায়। কথা ঘুড়িয়ে তিনি রুনুর দিকে নিয়ে গেলেন।

‘বুঝলেন ভাবি,মেয়েদেরকে বিয়ে দেবার জন্য একটা উপযুক্ত বয়স থাকে। এর আগে পরে বিয়ে দেয়া যায়না। এসময় রুনুকে বিয়ে দিয়ে দরকার,তাইনা?’

এ কথায় ছোটমা আগ্রহভরা কন্ঠে বললেন,’ছেলে ভাল পেলে দেব ভাবি।’

তিনি যে আসল কথাটা বলতে এসেছেন এবার তার সুযোগ পেলেন। অবাক হবার ভান করে বললেন,

‘ছেলে তো জানি আপনাদের ঠিক করাই আছে। মাঝে মাঝে রুনুকে ছেলেটার সাথে ঘোরাফেরা করতে তো দেখা যায়।’

ছোটমা হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করলেন,’কি বলেন এসব?’

‘কি বলবো ভাবি? সেদিন নিউ মার্কেটে ছেলেটির সাথে কাপড়ের দোকানে কাপড় দেখছিল। দোকানওয়ালা রুনুকে দেখিয়ে বারবার বলছিল,’ভাবিকে ভাল মানাবে’ রুনু তো অহ্লাদে ছেলেটার হাতধরে নাচানাচি করছে।’

‘নাচানাচি করছে, আপনি নাচানাচি করতে দেখলেন ?’

‘আমি দেখিনি। মেয়ের বাবা দেখেছে। আমাকে এসে তো বলল সব।’

তাদের মধ্যে কথা আর জমলো না। আমি জানি ছোটমা রুনুর ব্যাপারে ঐ কথায় আটকে রইলেন।

রাতে রুনুকে নিয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল এ বাড়িতে। রুনুকে ছেলেটির বিষয়ে প্রশ্ন করে জানা গেল,ছেলে এলাকার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জামান সাহেবের ছেলে। সরকার পক্ষের এই ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ সমন্ধে এলাকায় খারাপ প্রভাব প্রচলিত আছে। বাবা শুনে অস্হির হয়ে গেলেন। তিনি আমাকে তার ঘরে ডেকে পাঠালেন।

‘বাবু, বলতো এখন কি করা যায়?’

আমি কিছুই খুঁজে পাচ্ছিনা বাবাকে কি বলবো!
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ছোটমা চেঁচিয়ে উঠলেন,

‘কাকে কি প্রশ্ন করো? ও কি বলবে? ও কি এ সংসারের কেউ? ওর কোন কিছুতে যায় আসে? রুনুকে ওর নিজের বোন ভেবে দেখেছে কখনও সে? পর কখনও আপন হয়?’

বাবা ছোটমার কথার তোয়াক্কা না করে প্রায় নিভিয়ে যাওয়া কন্ঠে বললেন,’তুই একবার ছেলেটার সাথে কথা বলে দেখবি বাবু?’

আমি বাবাকে শান্ত করতে বললাম,’বলবো বাবা,তুমি চিন্তা করোনা।’

বাবা হঠাৎ অসহায়ের মতো আমার হাতটা ধরলেন। তিনি অল্প অল্প কাপঁছিলেন। আমি তার হাতের মুঠোয় নিজের হাতটা দিয়ে অনুভব করছিলাম,একজন হেরে যাওয়া বাবার কষ্ট। আমার মা যখন আমাকে নিয়ে নানুবাড়ি উঠলেন,সে রাতে নানাজান এমনি করে বাবার হাতটা তার হাতে ধরে আকুতি করেছিলেন। নানাজান, সে রাতে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফেরার পর মা শেষরাতে ডায়রিতে সব লিখলেন।

ষাটোর্ধ্ব অসহায় নানাজান তার মেয়ের এমন দুরাবস্থা নিতে পারলেন না। কিছুদিন পর তিনি অসুস্থ হলেন। ভালোরকম অসুস্থ। স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে গেলেন। হাসপাতালে একমাসের মতো বেঁচে থেকে মারা গেলেন। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে মা বাবাকে ফোন করেছিলেন নানাজানকে দেখে আসার জন্য বাবা যাননি।
বাবার এমন নিষ্ঠুরতায় সেরাতে মাও নিশ্চয়ই আকুল হয়ে কেঁদেছিলেন! বাবার অস্হির চোখের দিকে তাকিয়ে সে কথা ভেবে আমার চোখেও পানি এলো। আমি নিজেকে লুকিয়ে নিতে নিজের ঘরে চলে আসলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাবার বুকে ব্যথা শুরু হলো। রাত চারটার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করালাম। জানা গেল,তার স্ট্রোক করেছে।সঙ্গে সঙ্গে তাকে অপারেশন রুমে নেয়া হলো। অস্থির ছোটমা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বারবার অসহায়ের মতো বলতে লাগলেন,

‘বাবলু,আমাদের ছেড়ে যাসনে বাবা কোথাও।’

আমি ছোটমা, রুনুকে হাসপাতালের বারান্দায় রেখে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লাম। চারদিক ঝকঝক করছে।চন্দ্র মাসের শেষের দিকে ভোর রাতের জোছনার রহস্যভরা মায়াবী আলোয় ডুবে গেলাম। প্রকৃতির এমন উদ্ভাসিত মায়ভরা আহ্বান উপেক্ষা করার ক্ষমতা কার আছে? আমি হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম, যেন কেউ কোথাও নেই।এই অনন্ত পথের একা যাত্রী আমি।

(চলবে….)

বেলা প্রধান

Leave a Reply

Your email address will not be published.