দেহ (অণুগল্প)

তার চুলগুলো অগোছালো। আলু থালু করা মাথা। চুলেরা সব শনের নুড়ি। জায়গায় জায়গায় জট বেঁধে গেছে। দু’চার গাছি যারা জট বাঁধেনি এখনও, তারাও কঠিন চিটকে চিটচিটে হয়ে গেছে। দখিনা হাওয়ার সাধ্য নাই উড়িয়ে এনে ফেলে মুখের ওপর। এসব নিয়ে তার ভাবনা নেই। ভাবনার মত মাথাও নেই!

সে চুলে রোদ হয়, বৃষ্টি হয়। গরমে ঘামে, শীতে জমে। তার কোন চিন্তা নেই। ভাবনা নেই। বসে থাকে ঠায়। আমি অফিসে যাই রোজ আর দেখি বসে আছে। কোনদিকে দৃষ্টি তার বোঝা যায় না। মেয়েটিকে আমি রোজ বসে থাকতে দেখি ওভারব্রিজের নিচে।
তাকে দেখি আর ভাবি। নানা প্রশ্ন মনে জাগে। সে প্রশ্ন করতে পারি না। রাস্তার একটা পাগলী মেয়ের সাথে কথা বলতে রুচিতে বাধে। কী কথা বলব আমি? আমি অফিসার পদের লোক। কৌতুহল থাকলেও আমার জাতে বাধে!
অথচ মেয়েটিকে দেখি রোজ চেয়ে চেয়ে। মাঝে মাঝে গা ঘিনঘিন করে। চোখ ফিরিয়ে নেই। আবার তাকাই। দেখি বুকের কাপড়টা জায়গামত নেই। কিছু একটা উঁকি দিয়ে আছে পাহারের মত। মন না চাইলেও আবার তাকাই। শণচুলো মেয়েটার ওখানটাতে যেন লাবন্যের অভাব নেই। আমি দেখি। আমার মত বহু অফিসার পদের হোমড়া চোমড়ারাও আড়চোখে দেখে।
রিক্সাওয়ালা বেলজ্জ হয়েই তাকিয়ে থাকে। সার্জেন্ট সাহেব তাকে ভালো জায়গায় গিয়ে বসতে বলার অজুহাতে বারবার তার কাছে যায়। পথচারী ছেলে ছোকড়ার দল সবাই যায় আর দেখে। ঘেন্নায় থুতু ফেলে। আবার দেখে ময়লা জট বাধা চুলের মাথার নীচে বুকের ওপর জেগে ওঠা এক লাবন্যের চূড়াজুগল।
এত কিছুর পরও মেয়েটার বিকার নেই। সে বসে থাকে। রোদে গা গরম করে। বৃষ্টিতে ভিজে অন্তর শীতল করে।
দিন আসে যায়। রাতও আসে যায়। মেয়েটি বসে থাকে আগের জায়গায়।
সেদিন অফিসে যাওয়ার সময় কী মনে করে তাকালাম মেয়েটির দিকে। চুলগুলো একই আছে। গায়ের রং হয়েছে আরো ময়লা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো তার চেহরায়, গালে মুখে অন্যরকম একটা আভা দেখলাম! যা আগে কোনদিন চোখে পরে নি। চোখ মুখ ফোলা ফোলা!
হঠাৎ কেন উঠে দাঁড়াল মেয়েটা বলতে পারি না। যা বলতে পারি তা হলো, মেয়েটির আগে দেখা শরীরটা বেশ স্ফিত হয়ে গেছে! শরীরের তুলনায় পেটটা বেঢপ আকারের বড়!
পাশে এক ভদ্র লোকের অস্পষ্ট উক্তি কানে এলো- মাগী প্যাট বান্ধায়া ফেলছে! লাইত্থায়া খেদা মার্কেটের সামনে থিকা!
মেয়েটার মাথার আগোছাল চুলগুলো আরো জট বেধেঁ গেছে। সে কি জানে তার পেটের মধ্যও জট বেঁধে যাচ্ছে ধীরে ধীরে আরেকটি প্রাণ?
আমার মত অফিসার টাইপের লোকেরা দেখি কেবল মেয়েটাকে। হয়তো ওই লোকটার মত প্রকাশ্যে বলি না। মনে মনে ঠিকই বলি- দেখছ, মাগী পেট বান্ধায় ফেলছে!
কেউ বলি না একটি বার, শুধু আঙ্গুল দিয়ে পেট বান্ধানো যায় না!

 -রবিউল করিম মৃদুল

Leave a Reply

Your email address will not be published.