ডিনার ফর টু (২য় পর্ব )

হাসানের এখনো মনে আছে—যেদিন অপলা শিকাগো শহরের একটা ঘিঞ্জি এলাকার তাদের দু’বেড রুমের ছোট্ট এপার্টমেন্টটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাকে ফেলে।প্রতিদিনের মত সেদিনও কাজ থেকে একটু দেরি করেই বাসায় ফিরল হাসান। দরজা খুলে ঘরে ঢুকে সে ডাকল, ‘অপলা।’ কিন্তু কোনো সাড়া দিল না অপলা। সে বেডরুমে যেয়ে দেখল অপলা নেই। হাসান আবার ডাকল। এবারো নীরব। এবার সে সব রুম গুলো দেখল—নেই। বাথরুম, কিচেন, পেছনের বারান্দা—কোথাও নেই অপলা। হাসানের দেরি হলে অনেক সময় টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে অপলা। হাসান লিভিং রুমে এসে দেখল—এখানেও নেই। গেল কোথায় এত রাতে? সে চিন্তিত মনে সোফায় বসে পড়ল। অভ্যসবশত টেলিভিশনের রিমোট নিয়ে চালু করতে যেয়েই সে লক্ষ্য করল টেলিভিশনের পর্দার উপরে একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ টেপ দিয়ে লাগানো। হাসান উঠে গিয়ে কাগজটি নিয়ে এসে আবার বসল সোফায়। ভাঁজ খুলে সে দেখল একটা চিঠি। অপলার হাতের লেখা। গোটা গোটা অক্ষরে অপলা লিখেছে– ‘হাসান,
নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত আমি চলে যাচ্ছি। প্রতিদিন একদিন একদিন করে তোমার সাথে আমার দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আমি আর পারছিলাম না—এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে আমার মেন্টাল ব্রেকডাউন হতো। তাতে তোমার ঝামেলা আরো বাড়তো বই কমত না। না পারতে ফেলতে—না পারতে রাখতে।’ হাসান চিঠি পড়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর আবার পড়া শুরু করল— ’হাসান, একজন পুরুষ মানুষের জীবনে টাকা এবং নারী দুটোরই প্রয়োজন আছে—অন্তত তাই বলেই জানতাম। কিন্তু তুমি তার ব্যতিক্রম। তোমার দরকার শুধু টাকা। আমাকে তো তোমার প্রয়োজন নেই। আমাকে তুমি হয়ত মিস করবে না—মিস করার মতো কোনো ঘটনাই তো ঘটেনি। আমাদের সাড়ে-পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে পাঁচটা দিনও তুমি আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে দাওনি। আমরা দু’জন দু’জনকে কতটুকুই বা চিনতে পেরেছি।’ এ পর্যায়ে হাসান আবার থামল। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বাকী লেখাটুকু পড়ে শেষ করল। ‘তোমার কাছে তো আমি বেশি কিছু চাইনি হাসান। একটু সময়—আর একটা বাচ্চা। তার কোনোটিই যখন দিতে পারবে না তবে কেন আর থাকা বলো? কিসের প্রয়োজনে? আমার কিছু একটা তো চাই। যেদিন জানব তোমার জীবনে আমার প্রয়োজন আছে—আমি ফিরে আসব। তবে আমার জন্যে তোমার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ভাল থেকো। নিজের যত্ন নিও।
ইতি—তোমার অপলা।’


রান্না ঘরে চারিদিকে দুনিয়ার জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওয়ালমার্টে গিয়ে সামনে যা পেয়েছে তাই শপিং কার্টে তুলেছে হাসান। এখন সব কিছু ছড়িয়ে বসে আছে। কিচেন কাউন্টারে ছড়ানো জিনিষগুলোর দিকে বোকার মত তাকিয়ে আছে সে। বুঝতে পারছে না কী দিয়ে কী করবে? তার কপালে কিঞ্চিত ঘাম দেখা দিল। সে মনে মনে ভাবল—রান্নার আইডিয়াটা বাদ দিলে কেমন হয়। তারচেয়ে বরং কোনো একটা ফাইন ডাইনিং রেস্টুরেন্টে দুজনের জন্যে রিজার্ভেশন দিয়ে দেয়াটাই উত্তম। অপলার একটা পছন্দের রেস্টুরেন্ট আছে—ওদেরকে কল করে রিজার্ভেশনটা দিয়ে দিলেই হবে। ‘উম… নাহ, অপলার একটা পছন্দের আইটেম, এটা আমাকে করতেই হবে। ওকে বরং সারপ্রাইজ দেয়া যাবে।’ হাসান মনে মনে বলল। এতদিন পর অপলা আসছে। তাকে ইম্প্রেস করতেই হবে আর সেটা তার নিজের হাতে তৈরী অপলার ফেবারিট ডিশ। কিন্তু রেসিপিটা কিছুতেই মনে করতে পারছে না সে। অতপর রেসিপি বইটা খুলে কয়েকবার পড়ে পূর্ণ উদ্দ্যমে নেমে পড়ল কাজে। রান্না করার এপ্রোনটা গায়ে জড়িয়ে একটার পর একটা আইটেম এলুমিনিয়ামের ট্রে-তে সাজিয়ে ফেলল। প্রয়োজনীয় মশলা, সস আর চিজ ছড়িয়ে দিয়ে ফয়েল পেপার দিয়ে ঢেকে ওভেনে ঢুকিয়ে টাইমার সেট করে দিল। তারপর ফুড নেটওয়ার্ক চ্যানেলের শেফদের মত কপালের ঘাম মুছে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল, ‘যাক বাবা, শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক মতো সব কিছু দেয়া হয়েছে। এবার জিনিসটা ঠিক মতো হলেই হয়।’ হাসান খুশিমনে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে দ্রুত গোসলটা সেরে নিল। হাসান ঘড়ি দেখল। প্রায় পঁচিশ মিনিট হয়ে গেছে। সে কিচেনে ঢুকে ওভেন খুলে দেখল সবকিছু ঠিক আছে কিনা। ‘মনে তো হচ্ছে সব কিছু ঠিক মতোই হয়েছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়–আল্লাহ্‌ ভরসা।’ বলেই সে আবারো টাইমার সেট করে দিয়ে লিভিং রুমে এসে বসল। এখন শুধু অপেক্ষা।


দুপুর পেরিয়ে বিকেল ছুঁই ছুঁই করছে। অপলার প্লেন ল্যান্ড করল শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। একটা ছোট্ট ক্যারিং লাগেজ আর হ্যান্ডব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে এলো অপলা। বাদামি রঙের স্কার্টের সাথে কালো রঙের টপস পরিহিতা অপলাকে লাগছে অপ্সরীর মত। চোখে তার প্রিয় প্রাডা ব্র্যাণ্ডের সানগ্লাস। ঘাড়ের দুপাশে বাঁকা হয়ে চুল ছড়িয়ে আছে। অন্যরকম একটা ব্যক্তিত্বের দ্যুতি ছড়িয়ে আছে তার চোখে-মুখে। এদিক ওদিক তাকিয়ে সে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল আউট-বাউণ্ড প্যাসেঞ্জার তুলে নেবার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা ইয়েলো ক্যাব এসে থামল তার পাশে। ক্যাব ড্রাইভার অপলার লাগেজটি ট্রাঙ্কে তুলে দিতেই সে উঠে বসল পেছনের সীটে। তারপর ঠিকানাটা দিয়ে দিল ড্রাইভারকে। গন্তব্য হাসানের বাড়ি। এয়ারপোর্ট থেকে হাসানের বাসা একঘণ্টার ড্রাইভ। অপলা পেছনের জানালাটা খুলে দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরে। বাতাসে চুল উড়ে এসে পড়ছে তার মুখের উপর। চুল সরিয়ে দিয়ে সে আবার তাকাল বাইরে। শিকাগো ডাউনটাউন পার হয়ে যখন লেক মিশিগানের তীর ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছিল ক্যাবটি—লেকের দিকে তাকিয়ে অপলা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার তখন মনে পড়ে গেল কিছু পেছনের কথা—কিছু স্মৃতি।


অপলা সুন্দর করে সেজেছে। চুমকি দেয়া গোলাপী রঙের একটা ডিজাইনের শাড়ি। সুন্দর করে পরিপাটি চুল বাঁধা। কপালে টিপ—হাতে বালা। সে অনেকক্ষণ থেকে সামনের জানালা খুলে তাকিয়ে আছে বাইরে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেয়াল ঘড়ি দেখল—বিকেল পাঁচটা বেজে পঁচিশ মিনিট। সে আবারো তাকাল বাইরে। ঘড়ির টিক্‌ টক্‌ শব্দ! এক একটা সেকেন্ড চলে যাচ্ছে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। অপলা জানালার ধার থেকে ভেতরে এসে দেখল ঘড়িতে ৬টা বাজে। সে অসহিষ্ণু হয়ে ফোন করল—কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরল না। সে কিছুক্ষণ টিভি ছেড়ে দিয়ে রিমোট নিয়ে চ্যানেল বদলাতে থাকল। তার অস্থির লাগছে। ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বাজতেই সে আবার ফোন করল। ওপাশ থেকে এবার ফোন ধরতেই অপলা চাপা ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘তোমার কি আজকেও দেরী হবে? বছরের এই একটা বিশেষ দিনেও কী তুমি একটু আগে আসতে পারতে না? একটা দিন কী আলাদা হতে পারে না, হাসান?’ হাসান বলল, ‘অপলা, একটা ভীষণ জরুরী কাজে আটকা পড়ে গেছি। তুমি রেডি হয়ে থাকো। আমি আসছি। ‘রেডি তো আমি সেই বিকেল থেকে হয়ে বসে আছি। তোমাকে কতবার বললাম, আজকের দিনটাতে অন্তত একটু তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করো।’ হাসান কোনো উত্তর দিল না। ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি তোমার কাজ করো। কাজ শেষ হলেই ফিরো।’ বলেই অপলা ফোন কেটে দিল। ফোন কেটে দিয়ে চুপ করে বসে রইল অপলা। মুহূর্তেই তার দু’চোখ ভিজে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল—নিজেকে একবার দেখল আয়নায়। এতো সুন্দর করে সে সেজেছিল। আজকে ওদের বিয়ে বার্ষিকী। কিছু কিছু দিন মনের খাতায় লেখা হয়ে যায় আজীবনের জন্য। ঠিক তেমন একটা দিন—বিয়ের দিনটা। বিবাহিত দম্পতিদের ক্যালেন্ডারের পাতায় জ্বলজ্বল করে এই দিন। হাসান যখন কাজে যায় তখন একবার মনে করিয়ে দিল অপলা। ‘মনে আছে তো না? আজকে কিন্তু একদম দেরি করা চলবে না।’ ‘খুব মনে আছে। আমি যথা সময়েই চলে আসব—ডু নট ওরি।’ ডু নট ওরি বলেও সে ঠিকই ভুলে গেছে আজকের এই বিশেষ দিনটির কথা। হাসান বলেছিল কাজ থেকে ফিরেই তারা দু’জন ডিনার করতে যাবে। শিকাগোর বিখ্যাত জন হ্যানকক টাওয়ারের ৯৫ তলায় হাসানের প্রিয় রেস্টুরেন্ট ‘সিগ্নেচার রুম’-এ রিজার্ভেশন দিয়ে রেখেছে সে। দুপুরে একবার ফোন করে হাসানকে মনে করিয়ে দিল অপলা। হাসান তখনো বলল যে সে আজকে তাড়াতাড়িই ফিরবে—অথচ তার ফেরার কোন নাম নেই। অভিমানে জমে থাকা পানি টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে অপলার চোখ থেকে। সে একে একে খুলে ফেলল তার সব প্রসাধনী। কপালের টিপ খুলে লাগিয়ে রাখল আয়নার কাঁচে। গলার হার, হাতের চুড়ি খুলে রেখে দিল ড্রেসিং টেবিলের কাউন্টারে। তারপর চুল ছেড়ে দিয়ে মন খারাপ করে শুয়ে রইল বিছানায়।


হাসান রান্নাঘরের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ময়লাগুলো পরিষ্কার করা শুরু করল। একটা আইটেম রান্না করতে গিয়ে সে ভাল পরিমান ময়লা ছড়িয়েছে। অপলা যে কোনো সময় চলে আসতে পারে। সে দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করছে আর ঠিক তখনই ডোর বেল বেজে উঠল। হাসান একবার বাইরের দিকে তাকাল এবং অবাক হয়ে নিজের মনে প্রশ্ন করল, ‘এখন আবার কে এলো? অপলা? কিন্তু ওতো বলল বিকেলের ফ্লাইটে আসবে। এখন ক’টা বাজে?’ হাসান দ্রুত নিজেকে একটু পরিপাটি করে নিয়ে ছুটল দরজা খুলে দেবার জন্যে। সে উচ্চ কণ্ঠে বলল, ‘হোল্ড অন, আই উইল বি দেয়ার ইন অ্যা সেকেন্ড!’ হাসান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলগুলি ঠিক করে নিল। এটা অবশ্য তার একটা অভ্যাস—মাঝে মাঝেই চুলে হাত দিয়ে দেখে নেয় পরিপাটি আছে কিনা। দরজা খোলার মুহূর্তে সে একবার অনেকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি জানতাম তুমি একদিন ঠিকই ফিরে আসবে। ওয়েলকাম—ওয়েলকাম ব্যাক!’

দরজা খুলে চোখ বড় হয়ে গেল হাসানের—সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

চলবে…

-ফরহাদ হোসেন। লেখক,নির্মাতা। ডালাস,টেক্সাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published.