গোধূলিবেলায় ( ৫ম পর্ব)

রেবেকা মায়ের রুমে যেতেই আয়েশা বেগম একটু স্মিত হেসে স্নেহ ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো, ” আয় মা এদিকে আয়, আমার কাছে বোস। ”
রেবেকা মায়ের পাশে বসতেই তিনি রেবেকার পিঠে একটা হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞাসা করলেন, ” হ্যা রে, রিমির মুখে শুনলাম ওই ছেলেটা ফয়সাল না কি যেনো নাম, ওই বলে আজ দুপুরবেলায় তোর সাথে কথা বলার জন্য রিমির স্কুলের গেটে অপেক্ষা করছিলো ? ”
রেবেকা মুখে কোন কথা না বলে শুধু মাথাটা উপর নিচে দুলালো।

” আজ নাকি বিকেলবেলায় তোর সঙ্গে কথা বলবে বলে তোকে নদীর পাড়ে যেতে বলেছে ? ”
এবারও রেবেকা কিছু না বলে মাথাটা ঝুঁকিয়ে নিচের দিকে চেয়ে রইলো।
আয়েশা বেগম তার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে তাকে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, ” তুই এতো লজ্জা পাচ্ছিস কেনো বুঝলাম না ? শোন, মেয়ে যখন বড় হয়ে যায় তখন মা ও মেয়ে দুজনে বান্ধবী হয়ে যায় বুঝলি। তাই আমাকে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কাঠের আলমারিটা খুলে সবার উপরের তাকে একটা রঙিন শাড়ি আছে, ওইটা নিয়ে আয় তো মা। ”
রেবেকা আস্তে করে উঠে আলমারিটা খুলে শাড়িটা এনে মায়ের হাতে দিলো।

আয়েশা বেগম শাড়িটাতে পরম মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো, ” আমার বিয়ের পর পরই তোর বাবা খুব শখ করে এই শাড়িটা আমাকে কিনে দিয়েছিলো। আমি বেশিদিন পরিনি, মাত্র কয়েকবার পড়েছি। আসলে তোর বাবার এতো শখ করে কেনা শাড়ি যেনো নষ্ট হয়ে না যায় তাই কিছুদিন পরে তুলে রেখেছিলাম। আজ বিকেলে এটা পরে যাবি। এখন আয় দেখি তোর চুলটা ভালো করে আঁচড়ে একটা খোঁপা করে দিই। দেখবি এই শাড়ি পরলে তোকে খুব সুন্দর লাগবে। ”
একটু পর চুল বাঁধা শেষ হতেই আয়েশা বেগম রেবেকার থুতনিটা একবার নেড়ে বললেন, ” বাহ খোঁপা করলে তো তোকে খুব সুন্দর দেখায়। এখন যা শাড়িটা পরে আয় তো মা , দেখি তোকে কেমন
মানায় ? ”
রেবেকা কিছু না বলে শাড়িটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

নিজের ঘরে এসে শাড়িটা পরে চোখে হালকা করে কাজল দিয়ে এক জোড়া দুল কানে দিয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই মনটা খুশি হয়ে উঠলো। বারবার মুখখানি এদিক ওদিক করে আয়নায় দেখতে লাগলো। দেখা শেষ হতেই ঠোঁটে হালকা করে লিপিস্টিক বুলিয়ে আবারও আয়নায় নিজেকে দেখলো। আজ অনেকদিন পর বাইরে কোথাও যাওয়ার আগে এভাবে সাজতে বসলো। শুধু তাকে যেদিন কোন পাত্র পক্ষ দেখতে আসতো সেদিন পাশের বাড়ির কুলসুম ভাবী এসে সাজিয়ে দিতো। অবশ্য শেষের দিকে আর সাজতে মন চাইতো না। যানে সেজে কোন লাভ নেই। তাই দিনে দিনে সাজগোজের প্রতি তার এক ধরণের অনীহা জন্মায়। শুধু গায়ের রঙ কালো বলেই সে কোথাও কোন অনুষ্ঠানে যেতে চায় না। বাবা মা অনেক জোরাজুরি করা সত্বেও সে তাদের সাথে কোথাও যেতে চায় না। ঘরের ভিতরেই চুপটি করে বসে থাকে। আত্নীয় স্বজন কারও সাথে দেখা হলেই দুই এক কথার পর পরই তার গায়ের রঙ নিয়ে তাকে বা মাকে খোঁচা মারতে ছাড়ে না। আস্তে আস্তে তাই সে পৃথিবীর সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। কলেজে পড়ার সময় থেকেই সে লক্ষ্য করেছে তার সুন্দরী বা ফর্সা গায়ের রঙের মেয়েদের সাথে ছেলেরা কথা বলতে ভীষণ আগ্রহী ছিলো। অনেক ছেলেই কয়েকবার তার কাছে আগ্রহ সহকারে কথা বলতে এসেছিলো, অবশ্য তার ব্যাপারে নয়, তার কোন সুন্দরী বান্ধবীদের কাছে তাদের ভালবাসার কথা জানানোর জন্য বা তাদের কে চিঠি পৌঁছে দেয়ার জন্য। তারই বা কি আর করার আছে? মুখ বুজে তাদের সেগুলো পালন করতো। কেউ কখনও কাছে ডেকে মিষ্টি করে কোন কথা বলেনি। কি সব যা তা চিন্তা করছে সে। আয়নার সামনে থেকে জোর করে নিজেকে সরিয়ে বাম দিকে তাকাতেই রিমিকে দেখতে পেলো। রিমি এতক্ষণ অবাক হয়ে তাকে দেখছিলো। রেবেকা তাকাতেই সে বিস্ময়ে বলে উঠলো ,
” বুবু তোমাকে যে কি সুন্দর লাগছে তা তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না ! ”

রেবেকা কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলে উঠলো , ” যা ভাগ এখান থেকে। যা কাপড় পরে রেডি হ ! ”
” যাচ্ছি! ” বলেই হি হি করে হেসে উঠলো। রেবেকা তার দিকে কপট রাগ দেখিয়ে বললো , ” আমি মায়ের ঘরে গেলাম ! তুই তাড়াতাড়ি করে কাপড় পরে সেখানে আয় ! ” কথাটা বলেই রেবেকা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

মায়ের কাছে এসে বসতেই আয়েশা বেগম রেবেকার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তিনি কিছুক্ষণ মনে মনে দোয়া পড়ে রেবেকার গায়ে ফুঁ দিয়ে বলে উঠলেন , ” ছেলে যা বলবে তা মন দিয়ে শুনবি , আর কোন প্রশ্ন করলে সেই মোতাবেক উত্তর দিবি বুঝলি! ” কথাটা বলতে বলতে আয়েশা বেগম শাড়ির আঁচলের গিঁট খুলে যা টাকা ছিলো তা বের করে রেবেকার হাতে দিয়ে বললো, ” রিক্সায় করে যাবি , আসবি বুঝলি , কিপ্টেমি করবি না! এখন তাহলে তোরা আয়। ”
মায়ের কথা শেষ হতেই রেবেকা বিছানা থেকে উঠে দরজার কাছে দাঁড়ানো রিমিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো।

(চলবে)

-ফিরোজ চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published.