গোধূলিবেলায় ( ২য় পর্ব )

ভোরে রেবেকার ঘুম ভাঙ্গতেই চটজলদি করে দেয়ালে বহু পুরোনো আমলের ঘড়িটার দিকে একবার নজর বুলিয়ে সময়টা দেখে নিলো। পাশে ঘুমন্ত ছোটবোন রিমির দিকে তাকিয়ে পায়ের কাছে পড়ে থাকা কাঁথাটা টেনে এনে তার গায়ে ভালো করে ঢেকে দিতে দিতে নিজের মনেই বলে উঠলো ,
” এতো বড় হয়ে গেলো তাও ঠিকমতো গায়ে কাঁথা জড়িয়ে ঘুমোনো শিখলো না মেয়েটা! ”
রিমির শরীরটা কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিয়ে আস্তে করে মশারী উঁচু করে বিছানা থেকে উঠে আবারও মশারীটা তোষকের তলে গুঁজে দিয়ে একটা হাই তুলে বাথরুমে ঢুকে হাতমুখ ধুয়ে ওজু করে এসে ফজরের নামাজ পড়তে বসলো। নামাজ পড়া শেষ হতেই কাঠের আলমারির উপড় থেকে কোরআন শরীফটা নামিয়ে জায়নামাজের উপড় বসে কোরআন শরীফ পড়তে শুরু করলো। কিছুক্ষণ কোরআন শরীফ পড়ে আবারও তা আলমারির উপড় তুলে রেখে ঘরের বাইরে বের হয়ে এসে চারিদিকে তাকিয়ে মাকে খুঁজতে লাগলো। মাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে বাবার ঘরের দিকে গিয়ে মাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে দ্রুত বিছানার কাছে এসে মায়ের কপালে হাত রাখতেই আয়েশা বেগম আলগোছে চোখ মেলে চাইলো। মেয়ের উদগ্রীব চেহারার দিকে তাকিয়ে একটু মিষ্টি করে হেসে উঠতেই রেবেকা বলে উঠলো , ” কি হয়েছে মা ? তোমার কি শরীর খারাপ করছে? এতো বেলা অব্দি কখনও শুয়ে থাকো নাতো? বাবা কই ? এখনও মসজিদ থেকে ফিরে আসে নি? ”

” না রে মা , আমার কিছুই হয়নি। শরীরটা কেমন যেনো ম্যাজ ম্যাজ করছে। তাই নামাজটা পড়ে আবার শুয়ে পড়েছি। তোর বাবা এখনও আসেনি? এতো তো দেরী হয় না কখনও? কি হলো আবার মানুষটার? ”

” ও নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা মা, দেখবে বাবা এখনই এসে পড়বে। হয়তো নামাজ পড়ে পাড়ার লোকদের সাথে গল্প করছে! তুমি বরং শুয়ে থাকো। বিছানা থেকে উঠার দরকার নেই। আমি সব সামলে নিতে পারবো। ”

” এতোকিছু কি একহাতে সামলাতে পারবি রে মা? তোর বাবার দুপুরের ভাত দিতে আবার দেরী না হয়ে যায়? ”

” ও নিয়ে তুমি কোন চিন্তা করো না। দেখবে আমি সব ঠিকমতো করে ফেলবো। তুমি বরং চুপটি করে শুয়ে থাকো। ”
কথাটা বলেই রেবেকা কিছুক্ষণ মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আয়েশা বেগম পিছন থেকে বলে উঠলেন, ” মিট সেফে টাকি মাছ জ্বাল দিয়ে রাখা আছে। ওটা তোর বাবাকে দুপুরের টিফিনে ভর্তা করে দিস। আর মাটির শিকেয় মুরগির ডিম রাখা আছে। ওখান থেকে দুইটা ডিম নিয়ে একটা সিদ্ধ করে আলু দিয়ে রান্না করে তোর বাবার টিফিনের বাটিতে বেঁধে দিস। আর আরেকটা ডিম মামলেট করে খোকা ও রিমিকে তা ভাগ করে সকালে ভাতের সাথে খেতে দিস। নবাবজাদা দুটোর আবার ডিমের গন্ধ ছাড়া সকালের নাস্তা গলা দিয়ে নামতে চায় না। আর আমাদের সবার জন্য ডাল রান্না ও আলু ভাজি বা ভর্তা যেটা তোর মন চায় করিসরে মা। ”

মায়ের কথা শেষ হতেই রেবেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বারান্দার কোনা থেকে খিলের ঝাঁটাটা নিয়ে দ্রুত সারা বারান্দা ও উঠোনটা ঝাড় দিতে শুরু করলো। ঝাড় দেয়া শেষ হতেই মুরগির টবের মুখটা খুলে মাটির সানকিতে রাখা চালের খুদ কুঁড়ো মুরগিগুলোর দিকে এক মুঠো ছিটিয়ে দিয়ে কল তলায় গিয়ে ভালো করে হাত পা পানি দিয়ে ধুয়ে রান্না ঘরে প্রবেশ করলো। খড়ির চুলা দুইটা ধরিয়ে একটাতে চাল ধুয়ে ভাত বসিয়ে দিলো। আরেকটা চুলায় চায়ের ছোট্ট হাঁড়িটা বাবার জন্য চায়ের জল তুলে দিয়ে পিঁয়াজ রসুন কাটতে বসলো। একটু পর বাবার পায়ের আওয়াজ পেতেই রেবেকা দ্রুত বানানো চাটা একটু গরম করে কাপে ঢেলে মিট সেফ থেকে দুইটা টোস্ট বিস্কুট বের করলো। চুলায় ডাল সিদ্ধ করতে দিয়ে কাপ ও বিস্কুটের পিরিচটা হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই বারান্দায় বাবার মুখ ভার চেহারাটা তার চোখে পড়লো। রেবেকা আস্তে করে বাবা বলে ডেকে উঠতেই রশীদ সাহেব রেবেকার হাতে চায়ের কাপ দেখতে পেয়ে একটু খানি হেসে উঠলেন। তিনি হাসিমুখে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বিস্কুটে ছোট্ট একটা কামড় দিয়ে বললেন, ” তুই চা খাবি না রে মা? ”

” না বাবা, আমি এখন চা টা কিছু খাবো না। তুমি বসে চা খাও, আমি বরং ওইদিকে রান্নাটা ততক্ষণে সেরে ফেলি।”
কথাটা বলেই রেবেকা চলে যাওয়ার উদ্দ্যোগ করতেই রশীদ সাহেব খুব স্নেহ মাখা কণ্ঠে বললেন, ” আজ না হয় একটু পরেই নাস্তা খাবো। আমার পাশে এসে একটু বস না মা! অনেকদিন হলো তোর সাথে সকালবেলায় বসে চা খাওয়া হয়নি। আর তাছাড়া এতগুলো চা আমি খেতেও পারবো না। তুই বরং একটা খালি কাপ নিয়ে আয়, দুজনে মিলে ভাগ করে খাবো।”

বাবার কথার মধ্যে কি যেনো একটা কিছু ছিলো! তাই রেবেকা আর কথা না বাড়িয়ে চা ভর্তি কাপটা বাবার হাত থেকে নিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ভাতটা নামিয়ে মাটির মালসায় ভাতের হাঁড়িটা কাত করে মাড় পাশাতে দিয়ে আবারও চাটা গরম করলো। চা গরম হতেই আরেকটা খালি কাপ নিয়ে দুইটা কাপে চা ঢেলে আরেকটা হাঁড়িতে কয়েকটা আলু ও ডিম সিদ্ধ করতে দিয়ে কাপ দুটো নিয়ে বারান্দায় বাবার পাশে চেয়ারে গিয়ে বসলো। চায়ের একটা কাপ বাবার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে রেবেকা বললো, ” তোমার কি হয়েছে বাবা? মুখটা অতো শুকনো দেখাচ্ছে কেনো? ”

রশীদ সাহেব কাপে চুমুক দিয়ে একটা টোস্ট বিস্কুট মেয়ের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ” না রে মা, আমার কিছুই হয়নি। রাতে ঘুম একটু কম হয়েছে, তাই তোর ওরকম মনে হচ্ছে।”
তিনি দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞাসা করলেন, ”তোর মাকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। শরীর খারাপ করছে নাতো? ”

” মায়ের মনেহয় প্রেসারটা একটু বেড়েছে। তাই নামাজটা পড়ে আবার শুয়ে পড়েছে। ও নিয়ে তুমি আবার কোন চিন্তা করো না। আমিতো আছি। দেখি নাস্তা বানানো শেষ হলে মাকে ঘুম থেকে তুলে মাথায় আচ্ছা করে তেল দিয়ে দিবো।”

” কিরে সূর্য্য উঠতে লাগলো, খোকা আর রিমি এখনও ঘুম থেকে উঠেনি? কখন ঘুম থেকে উঠবে আর কখনই বা পড়তে বসবে? একটু পর তো নাস্তা খেয়ে স্কুলে যাবে। ”

” ওদের নিয়ে তুমি চিন্তা করো না বাবা, আমি চা খেয়েই ওদের ডেকে দিচ্ছি।”
কথাটা বলেই রেবেকা চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে তড়িঘড়ি করে খোকা ও রিমিকে ডাকতে গেলো।

রেবেকা তাড়াতাড়ি করে নাস্তা বানিয়ে সবাইকে খেতে দিয়ে বাবার জন্য টিফিনের বাটিতে খাবার সাজাতে লাগলো। টিফিন বাটিতে খাবার দিয়ে বাটির মুখটা ভালো করে আটকিয়ে ব্যাগের মধ্যে ভরে বাবার ঘরে ঢুকে পান সাজাতে লাগলো। কয়েকটা পান বানিয়ে এক খিলি পান বাবার হাতে দিতেই রশীদ সাহেব পানটা মুখে পুরে খানিকটা চিবিয়ে বিছানা ছেড়ে দাঁড়াতেই রেবেকা টিফিনের ব্যাগের ভিতরে পানগুলো একটা কাগজে মুড়ে দিয়ে ব্যাগটা বাবার হাতে ধরিয়ে দিতেই রশীদ সাহেব আয়েশা বেগমের ঘুমন্ত মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে আস্তে করে মেয়েকে বললেন, ”তাহলে আসি রে মা আর তোর মাকে দেখে রাখিস।” কথাটা বলেই আবারও বৌয়ের দিকে আরেকবার তাকিয়ে তিনি চিন্তিত মনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

( চলবে )

ফিরোজ চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published.