গন্তব্য (১ম পর্ব)

  • দিশা আজ সাত বছর পর অরণ্যের সাথে আবার দেখা করতে যাচ্ছে।
    সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে,জানালার পর্দাটা টেনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল এখন সাড়ে এগারোটা বাজে।
    দিশা প্রত্যাশা করছে ২টার আগেই বৃষ্টি থেমে যাবে।
    সকালের হালকা নাস্তা খেয়ে সে বাথরুমে ঢুকে চুলে শ্যাম্পু করে কন্ডিশনিং করে নেয়।
    কন্ডিশনার দেয়া চুলের ঘ্রাণ নিতে অরণ্য দিশার পিছন পিছন ছুটত, দিশাও দুষ্টামি করে অরণ্যকে কাছে ঘেঁষতে দিত না,দৌড়াদৌড়ি শুরু করতো।
    সেজন্যই দিশা যখন ওই তালপুকুরের পাশে অরণ্যের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বসত তখন অরণ্য প্রাণভরে দিশার চুলের ঘ্রাণ নিত।নাহলে যে দুষ্ট মেয়েটা কিছুতেই তার চুলে অরণ্যকে নাক ডুবাতে দিত না।
    দিশার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি রেখা ফুঁটে উঠে। পুরনো দিনগুলো যখনই তার মনে উঁকি দিয়ে যায় তখন এমন করেই সে মুচকি হাসে।
    হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকাতে শুকাতে দিশা ড্রেসিং টেবিলের গ্লাসে একটা টিপ দেখতে পায়,বড্ড ইচ্ছে হয় টিপটা কপালে পড়তে। অরণ্যের সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর থেকে দিশা কোনদিন কপালে টিপ পড়েনি।
    আজ সে আবার টিপ পড়বে কপালে,অরণ্যের মনের মত করে সাজবে সে।
    ময়ূরকণ্ঠী রং এর শাড়ি আর কাঁচাহলুদ ব্লাউজ এর কম্বিনেশনটা অরণ্যের ভীষণ পছন্দের। সম্পর্ক চলাকালে দিশাকে অরণ্য এ শাড়িটা উপহার দিয়েছিল।
    ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসেই বেজে গেল দেড়টা,এরই মাঝে দিশার ভাবী ভেতরের রুমে এসে দিশাকে খেতে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে গেলেন।
    খেতে ইচ্ছে করছেনা বলে দিশা তার ভাবীকে ম্যানেজ করে নেয়,দিশার ভাবী মনিরা রহমান, প্রাইভেট ব্যাংকে জব করেন। ভাবীই দিশাকে উদ্বুদ্ধ করেছে অরণ্যের সাথে আজ দেখা করতে যেতে।
    সবশেষে কপালে টিপটা পড়ে দিশা তার সাজ কমপ্লিট করেছে।এরই মাঝে অরণ্যের ফোন! সম্পর্ক ছিঁড়ে দুজন দুদিকে চলে যাবার পর এটা অরণ্যের প্রথম কল দিশাকে।
    একমাত্র দিশার ভাবীই তাদের মাঝে সেতুবন্ধনকারী হিসেবে কাজ করছেন।চাকরি পাল্টে অরণ্য এখন প্রাইভেট ব্যাংকে আছে,এবং সে মনিরা ভাবীর কলিগ। ভাবীই চান দিশা আর অরন্যের ভাঙা সম্পর্কটা আবার জোড়া লাগুক। ভাবীর আপ্রাণ চেষ্টার ফল হিসেবে আজ তারা দুজন দেখা করতে যাচ্ছে। ভাবীর ধারণা দুজন দুজনের মুখোমুখি হলে পুরনো সম্পর্কটা আবার জোড়া লাগবে,প্রাণহীন দুটি দেহে আবার প্রাণের প্রতিষ্ঠা হবে।
    ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে দিশা,অরণ্যের কন্ঠস্বরটা তার কানে পৌঁছুতেই দিশার পৃথিবীটা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। আজও দিশা প্রাণভরে ভালবাসে অরণ্যকে তবুও মাঝে কেটে গেছে দুঃস্বপ্নের সাতটি বছর।
    এ সাতটি বছরই অরণ্য আর দিশার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে,এলোমেলো করে দিয়েছে তাদের সাজানো জগৎগুলো।
    ওপাশ থেকে অরণ্য হ্যালো হ্যালো করেই চলেছে,স্তম্ভিত ফিরে পেয়ে কাঁপা ঠোঁটে দিশা উত্তর দেয়,
    — হ্যাঁ….লো
    — দিশু বলছো?
    অরণ্যর মুখে দিশু ডাকটা শোনে দিশার ভেতরটা কেঁপে উঠলো! অরণ্য সেই হাইস্কুল থেকেই দিশাকে দিশু বলে ডাকতো, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
    — হ্যাঁ দিশা বলছি।
    — কোথায় আসছো?
    — চয়েজ ইজ ইয়োরস্
    — ওকে,তাহলে স্টেশনের বাহিরে যে বেঞ্চটা আছে সেখানে বসো,আমি আসছি।
    দিশা ভাবে অরণ্য কোন রেস্টুরেন্ট বা অন্য কোন জায়গার কথা না বলে হঠাৎ স্টেশনের বাহিরে বেঞ্চে বসতে বললো কেন? ও আবার বাইক নিয়ে আসবে না তো! ধুম করে অরণ্যর বাইকে চড়ে ঘোরার ইচ্ছাটা দিশার এখন আর নেই।
    একটা সময় ছিল অরণ্য বাইক কেনার পর থেকে প্রতিদিনই নিয়ম করে একবার দিশাকে নিয়ে কোথাও চক্কর দিয়ে আসতো।
    দিশারও বাইকে চড়ার বড্ড শখ হত।
    — তুমি বাইক নিয়ে আসবে না তো!
    — নিয়ে আসবো?
    — মনে হয় না আনাটাই বেস্ট হবে।
    — ইটস ওকে,দেন বাই নাউ।মিটিং ইউ এট স্টেশন
    — অল রাইট
    হাতে দশমিনিট সময় আছে। দিশা বাসার গেইটে বেরিয়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছে। বাসার সামনে সেই ফুলের দোকানটার দিকে তার চোখ যায়,একটা সময় ছিল এ দোকান থেকে প্রতিদিন একটা করো গোলাপ কিনতো, অরণ্যর হাতে গোলাপটি দিয়ে খিলখিল করে হাসতো সে
    অরণ্যও বাচ্চাছেলের মত ফুলটা বারবার নাকের কাছে নিয়ে তার ঘ্রাণ নিত। দোকানটা এখনো এখানে আছে। সাত বছর পর দিশা এবার ঈদ করতে এখানে এসেছে,এসেই ভাবীর কেরামতিতে পা দিতে চলেছে।
    “অরণ্যর জন্য কি ফুল নিয়ে যাব? ফুল নেয়াটা কি ভাল দেখাবে? “ভাবতে ভাবতে একটা রিক্সা সামনে এসে গেল,রিক্সাতে চেপে বসেও দিশার মন দুটানাতে টানছে, “ভাই দাঁড়ান একটু।” হুট করে রিক্সা থেকে নেমে গিয়ে দিশা এক গুচ্ছ গোলাপের একটা তোড়া কিনে নেয়।
    স্টেশনের বাহিরে একটা বিশাল বড় রেইনট্রি গাছ, সে গাছের শীতল ছায়ায় একটাই বেঞ্চ! বেঞ্চটা স্টেশন কর্তৃপক্ষের অর্থাৎ সরকারী সম্পত্তি। প্রতিদিন দিশাকে নিয়ে বাইক জার্নির এক পর্যায়ে তারা দুজন এ বেঞ্চে এসে বসতো। দূরে একটা চায়ের দোকান থেকে পিচ্চি ছেলে মন্টু এসে তাদের দুজনকে চা দিয়ে যেত।
    অরণ্য দিশাকে আজও সে জায়গায় এসে বসতে বলেছে তবে জায়গাটা এখন আগের মত নির্জন নয়। গাছের ছায়ায় গড়ে উঠেছে কয়েকটা ছোট ছোট চায়ের স্টল। সে সুবাদে এখানে লোকজনের আনাগোনাও আছে বেশ।
    “অরণ্য এমন জায়গায় আমাকে অপেক্ষা করতে বললো! “ভাবছে দিশা।
    বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি,৫মিনিট হয়নি এখনো, এর মাঝেই অরন্য এসে গেছে।দিশার সামনে এসে রিক্সা থেকে নেমে ওয়ালেট বের করে ভাড়া মিটিয়ে অরন্য সোজা দিশার পাশে এসে বসে।
    দিশার হাতে গোলাপগুচ্ছ দেখে অবাক হয় সে,দিশা কি তাহলে আজও সেই আগের মতই ভালবাসে তাকে!
    দিশা অরণ্যকে অবলোকন করে এক নজরে। আগের থেকে অনেকটা মুটিয়ে গেছে অরণ্য, অবশ্য ব্যাংকের জব মানে সারাক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করা তাই মুটিয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক মনে হল দিশার কাছে।
    —কেমন আছো দিশু?
    — যেমন স্রষ্টা রেখেছেন! তুমি?
    — আমি? আমি আর স্রষ্টার ইচ্ছার বাহিরে কি করে যাই বলো? উনার ইচ্ছেমতই আছি। চা খাবে দিশু?
    দিশার উত্তরের আগেই দুকাপ চায়ের অর্ডার দেয় অরণ্য।
    মন্টুর স্থলে দোকানে এখন অন্য ছেলে এসেছে। অরণ্য ছেলেটাকে বলে “আশিক দুইটা সিগারেট দিয়ে যাইস তো!”
    দিশা অরণ্যর মুখপানে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়! “সিগারেট ধরেছো আবার? ”
    চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে, “যখন চাকরি আর প্রেমিকা দুটোই ছেড়ে চলে যায় তখন সিগারেট ছাড়া আর কি পাশে থাকে বলো? ”
    —- চলে কি শুধু আমি একা গিয়েছিলাম? তুমি যাওনি অরণ্য? তুমি পেরেছিলে তোমার সিদ্ধান্ত থেকে নড়তে?
    আমাকে একা দোষারোপ করছো,তোমারও দোষ কি কিছুটা কম ছিল?”
    —দিশু, অভিযোগ করবো বলেই কি আজ এখানে এসেছি?
    দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিশা,”এখনো এখানে আসো বুঝি? ”
    — “আগের মত প্রতিদিন আসতে পারিনা ব্যস্ততার জন্য তবে যখনই সময় পাই চলে আসি।
    এখানটায় বসে তুমি যে ওই দূরের গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মেঠো পথ ধরে হাঁটার স্বপ্ন দেখতে, তুমি চলে যাওয়ার পর আমিও অসংখ্যবার ভেবেছি একদিন ওই পথ ধরে তার শেষ গন্তব্য দেখে অাসবো। কিন্তু সাহস হয়নি,একাকীত্ব আমাকে গ্রাস করেছে বারবার মনে করিয়েছে তোমার ইচ্ছের কথা।
    আজ দুজনের সে ইচ্ছেটাকে পূর্ণ করবো বলে তোমাকে এখানে ডেকেছি। ”
    দিশা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকায় দূরের সেই অজানা গ্রামের পথটির দিকে,দুএকজন মানুষ পায়ে হেঁটে আসছে সেটা এখান থেকে কিছুটা বোঝা যায়। দিশার বড্ড ইচ্ছে ছিল ওই মেঠো পথ ধরে দুজন পাশাপাশি হাঁটার। সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই তারা দুজন দুপথে পা বাড়ায়।

চলবে…..

-অরুন্ধতী অরু

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.