একটি নাকফুলের গল্প ( ২য় পর্ব )

আমার মামামামি আমাকে খুব আদরযত্ন করত। বাবা আর মা সবসময় খোঁজ খবর নিত। আপাত দৃষ্টিতে আমার জীবনে কোনকিছুরই অভাব ছিলনা। বেশ পরিপাটি জামাকাপড় আর আমার শান্ত স্নিগ্ধতার পিছনে যত্ন করে রাখা এক আকাশ শূন্যতা যে ছিল, সেটা কেউ বুঝতে পারতোনা হয়তোবা বুঝতে চাইতোনা!! স্কুলের বান্ধবীদের মুখে প্রতিদিন মায়ের বকুনি, বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে টাকা চুরি বা ভাইবোনদের খুনসুঁটি যন্ত্রণার গল্প যখন শুনতাম, তখন আমার চোখের সামনে সেই দৃশ্যগুলি সিনেমার মত ঘটতে দেখতে পেতাম! আমার ইচ্ছে করত, তাদের গল্পের ভিতরে টুপ করে লাফ দিয়ে ঢুকে পড়ি। আমার ইচ্ছে করত, আমার এই পরিপাটি বেশভূষা এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে সেই গল্পের একজন চরিত্র হয়ে যাই।

আমার খুব সাধারণ হতে ইচ্ছে করত খুবই সাধারণ একজন মেয়ে, যার ঘরভরা ভাইবোনদের খুনসুঁটি, হৈচৈ থাকবে, বাবার আদর ভরা শাসন আর মায়ের নিত্য বকাঝকা থাকবে। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে হেঁটে বা রিকশার হুট ফেলে এখানে সেখানে ছুটে বেড়াতে ইচ্ছে করত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবার সাথে স্ট্রিটফুড খেতে ইচ্ছে করত। বন্ধুদের সাথে রাত জেগে প্লান করে সেন্টমার্টিন বা সিলেটের চা বাগান দেখতে যেতে ইচ্ছে করত। কিন্তু আমি পারতামনা। আমি আমার ইচ্ছেমত অনেক কিছুই করতে পারতামনা। কোনএক অদৃশ্য শিকল দিয়ে আমার হাতপা বাঁধা ছিল। কারণ সবাই আমাকে খুব বেশিই ভালবাসত। সবাই আমার নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন থাকত!! এত বেশি ভালবাসত যে, আমার দম বন্ধ হয়ে আসত।

নিজের ইচ্ছেমত শুধু একটা কাজই করতে পারতাম আমি। মামিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাসার কাছাকাছি থাকা রুমিদের বাসায় চলে যেতাম হুটহাট। রুমির মা যখন আমার জন্য পিঠা বানানোর আয়োজনে মাটির চুলোয় ফু দিয়ে আগুন তুলতে তুলতে ধোঁয়ার সমুদ্রে ডুবে যেত, আমি উনার পাশে পিঁড়ি পেতে বসে সেই ধোঁয়ার ভিতর থেকে শ্বাসটেনে অদ্ভুত এক মায়ার গন্ধ নিতাম বুক ভরে। তৃপ্তি করে ধোঁয়ার গন্ধ মাখানো সেই পিঠা খেতে খেতে মুগ্ধ চোখে রুমির ভাইবোনদের খুনসুটি দেখতাম, কারণে অকারণে রুমির বাবার রেগে যাওয়া দেখতাম।ওদের পারিবারিক গল্পের সাথে সাথে নিজেকে এক করতে ভীষণ রকমের লোভ লাগত আমার! রুমিকে ভীষণ ভীষণ রকমের হিংসে হত আমার। শুধু রুমিকেই নয়, ওদের টিনের চালের ফুটো দিয়ে অনুমতি না নিয়ে ঝুপ করে ঢুকে যাওয়া তির্যক আলোর রেখাটাকে, বেড়ার দেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে অনবরত ফিনফিন করে আসতে থাকা মৃদুমন্দ বাতাসটাকেও হিংসে হত আমার। মামামামি আর পালা করে দায়িত্ব পালন করতে আসা বাবা মা আমার যাতে কোন কিছুর অপূর্ণতা না থাকে সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখত। বলতে পারার মত কোন অপূর্ণতাই আমার ছিলনা, কিন্তু অসীম এক শূন্যতা আমাকে কুড়ে কুড়ে খেত দিনরাত। একটা পারিবারিক বন্ধনের জন্য আমার মনের আকাশে বিশাল এক শূন্যতা ছিল।

শিমুল ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বড়ছেলে। লেখাপড়ার পাশাপাশি কয়েকটা টিউশন পড়াত সে। খুব চেষ্টা করত, গ্রামে থাকা তাঁর পরিবারের প্রতি দ্বায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করতে। আমি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে তাঁর পরিবারের কথা শুনতে চাইতাম বলে আমাকে সব খোলাখুলিভাবে বলত। তাঁর প্রায়ই দেখতাম, শিমুল চিন্তিত মুখে দাদির বাতের ব্যথা বেড়ে যাবার কথা বলছে, ছোটভাইটা নাকি সারাদিন টই টই করে ঘুরে সেসব বলছে, ছোটবোনটার লেখাপড়ায় তেমন মন নাই সেটা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করছে, মা সারাদিন ঘরের কাজ করে বিশ্রাম নেয়না বলে আক্ষেপ করছে, রিটায়ার্ড হবার পর থেকে বাবা কেমন যেন খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছে তা বলত। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতে শুনতে একটা আটপৌড়ে পরিবারের সাধারণ সব দিনকালের অসাধারণ সব গল্পের সাথে একাত্ব হয়ে যেতাম কল্পনায়।

আমি মনে মনে নিজেকে বলতাম,
“সত্যিতো! ভালবাসার মেঘটুকু ভেসেই বেড়ায় আমাদের নিয়তির আকাশে! কোন এক সুযোগের অপেক্ষায় ভেসে বেড়ায়! কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে টুপ করে নেমে আসার অপেক্ষায়”!!

-তাসলিমা শাম্মী
চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published.