একটি নাকফুলের গল্প ( ১ম পর্ব )

একটা নাকফুলের জন্য আমি আমার সংসার ছেড়ে চলে এসেছিলাম।হুম। কয়েক হাজার টাকা দামের একটা সাতপাথরের নাকফুল। নাকফুলটা এখনো আমার নাকে বসে আছে। আমার পুরোটা অস্থিত্ব জুড়ে বসে আছে। ২৩ বছর বয়সে শিমুলের প্রেমে পড়েছিলাম আমি। ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে শান্ত এবং ভদ্র ছেলেদের মধ্যে একজন ছিল শিমুল। ভীষণ ভাল গানের গলা ছিল ওর। একটা প্রোগ্রামে ওর গান শুনে ভালবেসে ফেলেছিলাম আমি। মুগ্ধতার রেশ নিয়েই গানের পর পরই শিমুলের সামনে গিয়ে সরাসরি বলেছিলাম, “কি অদ্ভুত সুন্দর গেয়েছেন আপনি!! আমি সত্যি মুগ্ধ”! আমার বালিকাসুলভ প্রশংসা শুনে হেসেছিল শিমুল। হেসে হেসে আমাকে বলেছিল, “এটা মান্নাদের গান। আমি শুধু চেষ্টা করেছি”!
আমি আবারো সেদিন ওর হাসিতে মুগ্ধ হয়েছিলাম!

তারপরেগো প্রতিটা দিন, প্রতিটা ক্ষণ ছিল আমার মুগ্ধ হবার!!
এরপর দুজনের ধীরে ধীরে কাছে আসার গল্প, ভালবাসার গল্প, মুগ্ধতার গল্প জমতে থাকে। শিমুল আমার হাতটা ওর হাতের মুঠোয় নিয়ে যখন গাইতো,
“যদি গঙ্গা-ভলগা-হোয়াংহো
নিজেদের শুকিয়েও রাখে
যদি ভিসুভিয়াস-ফুজিয়ামা
একদিন জ্বলতে জ্বলতে জ্বলেও যায়
তবুও তুমি আমার”।
আমি তখন চোখে জলভরা স্বপ্ন নিয়ে মনে মনে বলতাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তোমার। শুধুই তোমার”।

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার পর পর বাবা মা আর মামামামি আমার বিয়ের জন্য তোরজোড় শুরু করে দেয়। মাস্টার্সের পরে শিমুল তখন নতুন চাকুরীতে জয়েন করেছে মাত্র। আমার জন্য পাত্র হিসেবে খুব বেশি যোগ্য নয় সে আমার পরিবারের চোখে। তাঁর বেতনের অংকে একদম খুশি নয় আমার পরিবার, আর তাঁর পরিবারও বিয়ের ব্যাপারে তখনি কিছু ভাবছেনা!! কিন্তু আমি ছিলাম ভালবাসার কাঙ্গাল!! শিমুলের ভালবাসারতো বটেই তাঁর একান্নবর্তী পরিবারের গল্পগুলো আমাকে ভীষণ ভাবে টানত। মা বাবা, ভাই বোন, বৃদ্ধ দাদিকে আমি না দেখেই ভালবেসে ফেলেছি শিমুলের মুখে শুনে শুনে।

ভাগ্যের অদ্ভুত এক যাঁতাকলে পড়ে আমি মামা মামির কাছে মানুষ হচ্ছি তখন। না না, আমার মা বাবা দুজনেই বেঁচে ছিলেন। আমার যখন তিন বছর বয়স, তখন আমার বাবা মা র বিচ্ছেদ হয়ে যায়। বিচ্ছেদ কেন হয়েছিল জানিনা, হয়ত ভালবাসা কমে গিয়েছিল! ভালবাসাটুকু কমে গেলে নাকি একসাথে থাকা আর সম্ভব নয়, সেই ছোটবেলা থেকেই আমি শুনে আসছি। সেই সাথে এটাও শুনে আসছি, ভালবাসা একেবারেই হারিয়ে যায়না কিন্তু। কোথাও না কোথাও আমাদের জন্য থেকেই যায় অদৃশ্য এক টুকরো মেঘ হয়ে। অনুভূতির বিশাল আকাশে! সুযোগমত কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে টুপ করে বৃষ্টির মত নেমে আসে আমাদের জীবনে। যাইহোক, মা এবং বাবা অন্যকোন আকাশে তাদের নিজ নিজ মেঘ নিয়ে ভেসে গিয়েছিল। আমার নিরাপদ আশ্রয় হয়েছিল, মামামামির সংসারে!! বাবার সংসারে নতুন মা তখন, মায়ের সংসারে নতুন বাবা। আমিই মনেহয় ছিলাম তাদের মাঝখানে এক “অস্বস্থিকর এক ভালবাসার যন্ত্রণা”!! “অস্বস্থিকর এক ভালবাসার যন্ত্রণা” বলছি কারণ হচ্ছে, বাবা মা দুজনেই আমাকে অসম্ভব ভালবাসতেন। এতোটাই ভালবাসতেন যে, দুজনের কেউ চাননি আমি সৎ বাবা বা সৎ মায়ের কাছে বড় হই। বাবা মা আর মামামামি চাননি আমার মনের উপর কোন ধরনের চাপ আসুক, আমি কোন ধরনের মানসিক জটিলতা নিয়ে দিন কাটাই, আমি শূন্য বুকের বাষ্প জমিয়ে রাতের আধারে বালিশ ভিজাই…!!

তাই সবার মিলিত সিদ্ধান্তে আমার নিরাপদ শান্তিময় আশ্রয় হয় আমার একমাত্র মামা আর মামির সংসারে। মামার একমাত্র ছেলের সাথে সাথে আমিও বড় হতে থাকি বেশ যত্নের সাথে। বাবা এবং মা প্রতি সপ্তাহের ভিন্ন ভিন্ন দিনে পালা করে আমাকে দেখতে আসেন। বেশ মোটা অংকের টাকা এবং নানান রকমের উপহার নিয়ে আসেন। ভাল স্কুল কলেজ আর ইউনিভার্সিটি টপকাতে টপকাতে আমি একসময় বড় হয়ে যাই।

ইউনিভার্সিটিতে শিমুলের সাথে আমার দেখা হয়। আমার দেখা হয় আমার ভালবাসার সাথে!! শুরু হয় একটা নাকফুলের গল্প!!
চলবে….

-তাসলিমা শাম্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.