একজন বিনোদ

“মাইয়াডার দোষ। এত বড় হইছে তাও ঢ্যাং ঢ্যাং করে চলবি কেন? এই নে এবার মজা বুঝ!” গ্রামের বৃদ্ধ মহিলা তার পাশের মহিলাকে কথাগুলো বলছিলো। পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো শুনে গা জ্বলে গেলো বিনোদের। কিছুদিন পর পর এক একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আর এই মহিলাগুলো মেয়েগুলোর উপর দোষ চাপিয়ে দেয়। হন হন করে পার হয়ে গেলো সে।

চৌরাস্তার মোড়টা পেড়িয়ে বাড়ির গলিটাতে ঢুকলো। ল্যাম্পপোস্টের লাইটটা নষ্ট থাকায় ঘুট ঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। দূর থেকে কিছু দেখা যাচ্ছেনা। একটু এগিয়ে যেতেই পাশে সিগারেটের লাল একটি আভা দেখলো। বুকটা কেঁপে উঠলা তার। আরেকটু সামনে যেতেই মনে হলে পেছন থেকে কেউ তাকে ফলো করছে। একটু থেমে পেছনে ফিরে দেখলো কেউ নেই। সামনের দিকে ঘুরে হাঁটা দিতে যাবে এই সময় খপ করে হাত ধরে ফেললো কে যেনো। মুখ দিয়ে শব্দ করতে যাবে এই সময়ে মুখের মধ্যে কে যেন রুমাল চেপে ধরেছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই সে অজ্ঞান হয়ে গেলো।

চোখ খুলে যখন সে তাকাতে পারলো তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করলো একটি অন্ধকার ঘরে। পাঁচজন যুবক মিলে তার শরীরটাকে ভোগ করছে। অসহ্য ব্যথা করছে সারা শরীরে। একফোঁটা শক্তিও নেই তার। কিছুক্ষণ এভাবে চলতে থাকার পর সে তাদের কথা শুনতে পেলো।

এবার কি করবি?

বাকীদের সাথে যা করেছি।

মেরে ফেলবি?

বাঁচিয়ে রাখলে আমরাই বিপদে পড়বো।

ছুরিটা নিয়ে আয়।

ভয়ে মুখ নীলবর্ণ হয়ে গেলো বিনোদের। এটিই তাহলে তার শেষ রাত! গায়ের সমস্ত শক্তি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলো।

বিনোদঃ এই যে শুনুন!

মাগীটা জেগে উঠেছে তাহলে।

শুনুন আমার কথা।

বল?

একটু পানি হবে?

দে পানি দে।

(পানি খেয়ে) আমাকে মারবেন না।

তোরে না মেরে কি আমরা মরবো।

আমি কাউকে কিচ্ছু বলবোনা।

সবাই বলে তারপর ঠিকই বলে দেয়!

না না সত্যি। আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। আপনাদের যখন ইচ্ছা আমাকে ডাকবেন। আমি চলে আসবো।

কি বলে মাগী।

আরে এটাই তো জীবন। অন্যরা বুঝেনা এই আনন্দ। অযথাই এরকম করে।

সবাই যদি বুঝতো তোর মতো। আমাদের আর রেইপ করা লাগতোনা।

আপনার নাম্বারটা দিবেন? আমার ইচ্ছা হলে ফোন দিবো। আপনারাও দিয়েন যখন মন চায়। নতুন কাউকে লাগলে সেই ব্যবস্থা করে দিবো।

আরে এ তো বেশ চালু মাল। যা তোরে ছেড়ে দিলাম। এই নে নাম্বার। কল দে একটা আমার নাম্বারে।

ছেঁড়া কাপড় পড়ে বাসায় ফিরে এলো বিনোদ। বাসার সবার বুঝতে বাকী নেই কি হয়েছে। পাড়াপড়শিরাও জেনে গেছে। কেউ কেউ বলছে, এভাবে ফিরে আসার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। মেয়েটার মনে কোন দুঃখ নেই দেখে কেউ কেউ বলছে ইচ্ছে করেই করেছে। করেই ভালো করেছে। দেখোস না কি দেমাগ। কোন দুঃখবোধই নাই। মনে হয় নিজেই চেয়েছিলো।

বিনোদের বাবা মা কান্নাকাটি করছে। বিনোদকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেনা। বাবা-মা সবাই হতভম্ব। মেয়ের সাথে এমন হলো তবু মেয়ের একটুও লজ্জা নাই। বিনোদ কারো কথা কানে না তুলে কল দিলো ধর্ষকের নাম্বারে।

হ্যালো।

কি একবার মজা নিয়েই, ভুলে গেলেন। আমি যে আর সইতে পারছিনা।

না ভুলিনি। তোর এখনও ইচ্ছা আছে।

থাকবেনা কেন! যে রাস্তা দেখালেন।

কাল আয়। ঠিকানা নে।

পরদিন সন্ধ্যায় খুব সেজেগুঁজে বের হলো বিনোদ। সবাই ছিঃ ছিঃ করছে। এ কেমন নষ্টা মেয়ে! এরকম হওয়ার পরও কোন লজ্জা নেই তার। বিনোদ চুপচাপ বেরিয়ে গেলো। চলে গেলো নির্দিষ্ট ঠিকানয়।

বাব্বাহ, এসে গেছিস!

হ্যাঁ আর সহ্য হচ্ছিলোনা।

নে শুরু কর!

আপনি একা? আর নাই?

আরো লাগবে?

সবাইকে ডাকেন। এই পাঁচজন-ছ’জনে কি হয় নাকি। আমার আরো লাগবে।

আস্তে আস্তে ১২ জন এলো। আজ আর কারো তাড়াহুড়া নেই। একজন একজন করে সবাই যার ইচ্ছামতো করে করতে লাগলো। তিনঘন্টা ধরে তীব্র ব্যথার সময় পার করে বেরিয়ে এলো বিনোদ। হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে এলো।

বাসার কেউ বিনোদের সাথে কথা বলছেনা। মায়ের মুখে একটাই কথা এমন নষ্টা মেয়ে পেটে ধরেছিলাম! বিনোদ দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লো।

সকালে বিনোদের ঘুম ভাঙলো দরজা নকের শব্দ শুনে। বিনোদ দরজা খুলে দিলো। বাবা-মা সবাই আতঙ্কিত। বিনোদ চুপচাপ বেরিয়ে এসে পুলিশের গাড়িতে উঠে গেলো। কেউ বুঝলোনা কি হয়েছে। একটু পর টিভি অন করে দেখলো গলির কাছাকাছি পরিত্যাক্ত এক বাড়িতে ১২ জন যুবকের লাশ পাওয়া গেছে। লাশের পাশে একটা ছোট্ট চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুটে লেখাঃ

“ ধর্ষকদের বিচার এ দেশে কেউ করেনা। ধর্ষিতাদেরই ভুগতে হয় শেষমেষ। আমি বিনোদ, আগের সকল ধর্ষিতা মেয়েদের হয়ে এই ১২ টি জানোয়ারের বিচার করে গেলাম।

ঠিকানাঃ….”

ফিরে আসার সময় ডাকবক্সে একটি চিঠি ফেলে গিয়েছিলো বিনোদ। এরপরের দিন বিনোদের হত্যাকান্ডের পাশাপাশি চিঠিটা প্রকাশিত হয় পত্রিকায়।

“নারীর সম্মান কখনো তার লজ্জাস্থানে থাকেনা, থাকেনা তার শরীরে। সম্মান থাকে কর্মে। নারী-পুরুষ আলাদাভাবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখলে এই সত্যটা উপলব্ধি করা যায়। মানুষের জৈবিক চাহিদা যৌনতা। সব মানুষের থাকে। তবে পুরুষকে এ বিষয়ে শিক্ষা না দেওয়া হলেও নারীকে এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। বলা হয় সত্বীটাকে একজনের জন্য তুলে রাখতে। জীবনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মানুষের সাথে মিশতে হয়। সেক্ষেত্রে যৌন চিন্তা আসলেই জোর করে চাপিয়ে রাখতে হয়। এই জোর করে কোনকিছু করার থেকে মনের প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত। মন কি চায় সেদিকে ভাবা উচিত।

যতদিন এ সমাজে যৌনতাকে নিষিদ্ধ ও অশ্লীল বস্তু হিসেবে চেপে রাখা হবে, ততদিন এ সমাজে ধর্ষণ হতেই থাকবে। পর্যাপ্ত যৌনশিক্ষার পাশাপাশি, নারীকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দিলে, তার চাহিদা সম্পর্কে জানতে দিলে- অনেক ভুলভ্রান্তি দূর হবে। পাশাপাশি আপনার মেয়ে সন্তানকে ধর্ষণ থেকে বাঁচার জন্য হাজার উপায় না শিখিয়ে আপনার ছেলে সন্তানটিকে শেখান ধর্ষণ করতে হয়না। জোরপূর্বক কারো সাথে কোন কিছু করা ঠিক না। তার বিবেককে যথাযথ শিক্ষা দেন; তবেই মুক্তিটা এসে যাবে।

ধর্ষিতা হলে মেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে, এসব অপবাদ দিয়ে একজন নারীকে বন্দী করে রাখবেন না। নারী ধর্ষিত হয়েছেন বলেই আত্নহত্যা করতে হবে, এমন কিছুও না। আপনার সম্মান এতো দূর্বল না যে সেটা একজন পরুষের ইচ্ছাতেই নষ্ট হয়ে যাবে। নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবুন, দোষীকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করুন, নিজেকে দোষী বানাবেন না।

আমাকে এ সমাজ মেনে নিতোনা। আমি আত্নহত্যা করতে পারতাম। কিন্তু তাতে কোন ফল হতোনা। আমি আত্নহত্যা না করে ধর্ষকদের বিচার করে জেলে যাচ্ছি। আমার এতে কোন আফসোস নেই। অন্তত আমার এই চিঠিটা পড়ে হলেও কোন একজন নারী তার নিজের সম্পর্কে সচেতন হতে তো পারবে- এটাই আমার জীবনের সার্থকতা।

ইতি
বিনোদ”

-জিসান রাহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published.