উত্তরাধিকার (৫ম পর্ব)

রিয়াদের পারিবারিক মিটিং এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রিয়া তার সোর্সকে কাজে লাগায়। পুলিশ হেডকোয়ার্টারে চাকরি করার সুবাদে তার তথ্য সংগ্রহ করা খুব সহজ। পাঠকবর্গ শুরুতে জেনেছেন নুরা পুলিশকে ভয় পায়। ঠিক তেমনি সে উপভোগ করে তোষামোদি। যদি তাকে কেউ তোষামোদ করে, তাহলে নুরার দৃষ্টিতে তার সাত খুন মাফ।

তেমনি একজন মানুষ বদু। সে সারাক্ষণ চিনে জোকের ন্যায় লেগে আছে নুরার সাথে। নুরার প্রতিটি অপকর্মের নীরব সাক্ষি সে। কখনো কখনো নুরা তাকে ব্যতীত অনেক কাজ করতে সাহস পায় না। এ ব্যাপারে বদুর কিঞ্চিৎ অহমিকা সৃষ্টি হয়েছে। সে যেখানে সেখানে বড়াই করে প্রচার করে বেড়ায়। কখনো কখনো সেটা সীমা ছাড়িয়ে যায়। বাজারের চায়ের দোকানে বসলে বদুর মুখ দিয়ে খৈ ফুটতে শুরু করে।

তেমনি একদিন বদুর বাজারের চায়ের দোকানে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে গিয়ে সীমা ছাড়িয়ে যায়। গর্বের সাথে সে বলে,
– তোরা জানিস না, ভাই ঘর থেকে বের হবার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করে পা ফেলে, আমি ডান পা ফেলতে বললে তিনি ডান পা ফেলে।
সেখানে বসে থাকা নিরীহ এক লোক হঠাৎ মুখ ফঁসকে বলে ফেলে,
– তাহলে কি তোর কথায় ভাইয়ে মাস্টরের স্কুলের দখল নিছিল?
প্রশ্ন শুনে বদুর মুখে আষাঢ়ের আঁধার নামে।
বলে,
– দুর ব্যাটা, মাষ্টরতো আছিল বোকা আবার একলা, হেই সুযোগ কি ভাই ছাড়ত? তার বাপইত কামডা সাবাড় করছে।
– হ, এইডা একখান খাডি কতা কইছত। যোগ্গ বাহের যোগ্গ পোলা।
-ওই বেডা তরফাইস না, ভাই হুনলে কিন্তুক খবর আছে!

সে চায়ের দোকানে সাদা পোষাকে নিরীহ এক লোক বসা ছিল। তাকে দোকানের কেউ চিনে না। বেশ জমজমাট বাজার। পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে আন্তঃজেলা সড়ক। কত লোক আসে যায়। কেউ তার খবর রাখে না। সে সিআইডির একজন সাব-ইন্সপেক্টর। রিয়া তাকে এখানে বিশেষ এক এসাইনমেন্ট দিয়ে পাঠিয়েছে। দুদিন যাবৎ সে বিভিন্ন চায়ের দোকানে নীরবে কতক্ষণ বসে থাকে। গাড়ি থেকে নেমে চায়ের দোকানে বসে। রসিয়ে রসিয়ে এককাপ চা পান করে। কান দুটো খাড়া থাকে খরগোশের ন্যায়। কোন কিছু তার কানকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ডিপার্টমেন্টে তার বেশ সুনাম। সাব-ইন্সপেক্টর রায়হানকে ম্যাডাম রিয়া বেশ পছন্দ করে। তাই তাকে এখানে পাঠিয়েছে।

দ্বিতীয় দিনেই ক্লু পেয়ে যাবে রায়হান স্বপ্নেও কল্পনা করে নি। নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হয়। এক সময় বদু গ্রাম্য নিরীহ লোকটির উপর রাগ করে চায়ের স্টল ছেড়ে বিদায় নেয়। কিছুক্ষণ পর সেই নিরীহ লোকটিও উঠে পড়ে। রায়হান অতি সন্তর্পণে  পিছু নেয় লোকটির। লোকজন খুব কম এমন জায়গায় লোকটির পাশে হাঁটতে হাঁটতে হালকা কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলে। লোকটি নিঃসঙ্কোচে রায়হানের সাথে কথা বলে। খুব সতর্কতার সাথে বদুর বাড়ির লোকেশন নিয়ে বিদায় নেয়।

এবার রায়হান গোবেচারা চেহারা টাইপের একজনকে বদুর পেছনে নিয়োগ করে। এসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর কামরুল বদুকে দুইদিন ওয়াচ করে। নুরার আইকিউ অনেক হাই। তার চোখকে দুদিনের বেশি ফাঁকি দেয়া সম্ভব নয়। দুই দিনেই তাকে তুলে নেয় রায়হান। কীমরুলের কাছে রিপোর্ট চায় রায়হান।
– বলো কামরুল, কি কি জানতে পারলে?
কামরুল মনে মনে গুছিয়ে নেয়। শুরু করে তার কিচ্ছা।
– নুরা লোকটি বদের বদ।
কামরুল তাকে থামিয়ে দেয়।
– তোমাকে তো নুরা সম্পর্কে কিছু বলতে বলা হয় নি, তোমাকে বলেছি বদুর উপর লক্ষ্য রাখতে।
– স্যার, বদু তো সারাক্ষণ নুরার সাথেই থাকে।
– বদু সম্পর্কে কি জানলে বলো।
– এটা একটা গভীর জলের মাছ। এটা দুমুখো সাপ। সে তো যে কোন সময় নুরাকে ছোঁবল মারবে।
– আচ্ছা তুমি যাও। সহজে যেন নুরা তোমাকে না দেখে। সাবধানে থাকবে। তোমার ডিউটি শেষ।

সেদিন রাতে রায়হান রিয়া ম্যাডামের সাথে কথা বলে। এ কয়দিনের অগ্রগতির রিপোর্ট দেয়। রিয়া খুব অল্প কথায় তাকে কিছু পরামর্শ দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। রিয়া কথা শেষ করে রিয়াদের দিকে তাকায়। রিয়াদ অত্যন্ত মনোযোগের সাথে একটি ভ্রমণকাহিনী পড়ছিল। রিয়া তাকে বলে,
– তোমার নুরা তো সমানে তড়পাচ্ছে। কোন কূল কিনারা পাচ্ছে না। সে তার সাগরেদকে নিয়ে গোপনে শলাপরামর্শ করছে।
রিয়াদ হাতের বইটি রেখে পূর্ণ দৃষ্টিতে রিয়ার দিকে তাকায়। বলে,
– একেই বলে কপাল। বাবার কতো আশা ছিল। আমি পুলিশ হবো, অথচ হলাম পুলিশের স্বামী। আমি হলেও মনে হয় আমার বাবার স্বপ্ন পূরণে এতো উদগ্রীব হতাম না। অথচ তুমি মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছ।
– রাখ তোমার গ্যাস দেয়া, কোথায় একটু আদর করবে, তা না তিনি আমাকে গ্যাস দিচ্ছেন।
রিয়াদ রিয়াকে টেনে নেয় বুকে। রিয়া পরম নির্ভরতায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়।
– জানো, সারাদিন ক্রাইম নিয়ে কাজ করি। সারাক্ষণ আমার এ ঘরটাকে মিস করি। মায়ের আদর, তোমার সোহাগ, আমাকে জড়িয়ে থাক।
– জী না ম্যাডাম, আমার ছেলেটাকে ভুললে তো চলবে না।
– তোমার ছেলে কি আমার কাছে থাকে? সারাক্ষণ দিদা আর বাপ। আমি সারাদিন খেটেখুটে বাসায় আসি। এসেও দেখি মায়ের কোলে বসে গল্পে মশগুল।
– তুমি ডেকে নিলেই পার।
– মার আনন্দ আমার সুখের চেয়ে অনেক বড়।
– আসলেই তোমার তুলনা হয় না। I love you so much.
রিয়াদ মুখ নামিয়ে আনে রিয়ার লোভনীয় ঠোটে। মাঝপথে বাঁধা পায় সে।
– তোমার নুরার কাহিনী শুনবে না?
– তোমার পুলিশি রিপোর্ট আপুকে দিও। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। আমার নগদ লাভ দরকার।
– তোমার ছেলে চলে আসবে।
– জ্বী না, মহারাণী। এখন মা সুদীপ্তকে আসতে দেবে না, কারণ তার ছেলে এখন ছেলের বৌকে আদর করবে।

এমনি সময়ে রিয়াদের ফোন বেজে ওঠে। রিয়া ভেংচি কেটে সরে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলায়। বলে উঠে,
– যুগে যুগে ননদেরা ভাইয়ের বউদের পেছনে লেগেছিল। যতদিন বহমান থাকবে স্রোতধারা চলবে অত্যাচার ননদের।
– কেটে কেটে দাও, ওর ফোন পরে ধরলেও চলবে।
– না তুমি, আপুর ধরো।
রিয়া ফোন কল রিসিভ করে,
– আসসালামু আলাইকুম আপু, কেমন আছ?
– তুমি এখন বাসায়? স্যরি তোমাদের ডিস্টার্ব করলাম।
– ডিস্টার্ব তো করেই ফেলেছ। তোমার আদরের ভাইটার কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। তোমার ফোনকল তার হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানিতে ছাই ছিটিয়ে দিয়েছে।
– তোমার কাজ কতদূর এগোলো?
রিয়া বিস্তারিত রিপোর্ট দেয় রিশাকে। রিশা সব শুনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। রিয়াকে ধন্যবাদ দেয়।
– তুমি তো কামাল করে দিয়েছ। তুমি তো আমাকে পথে বসিয়ে দিয়েছ।
– কিভাবে আপু?
– তোমার পেয়ারের স্বামী আমাকে তো এখন আর পাত্তা দেবে না।
– আপু, আমি তোমার সাথে আছি না।
– তুমিই তো ভরসা আমার।
আরো কিছুক্ষণ চলে তাদের কুশল বিনিময়। অবশেষে ফোন আসে রিয়াদের হাতে।
– আমাকে আবার কি দরকার?
– গাধার কন্ঠে কোন পরিবর্তন আসছে কিনা সেটা জানার জন্য।
চলে ভাইবোনের খুনসুটি। এরমাঝেই ওরা সেরে নেয় তাদের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

নুরার মনে এক মুহূর্তের জন্য শান্তি নেই। সে কোন কূল কিনাড়া পাচ্ছে না। সে মনে মনে তার গ্রামসহ আশে পাশের কয়েক গ্রামের লোকের খোঁজ নেয়া শুরু করেছে। কিন্তু শাহরিয়ার নামের কারো খোঁজ পায় নি, যার বাড়ি গুলশানে। তার মনে একটা খটকা লেগে আছে। শাহরিয়ার সাহেবের জমি কেনার খবর তাকে দিয়েছে তার অনুগত সাগরেদ বদু। কিন্তু বদু যার কাছ থেকে শুনেছে সেই লোকটিকে চিনে না সে। এ নিয়ে বদুর উপর মহা ক্ষেপে আছে নুরা।
– —- মারানির পোলা, যার কাছেত্তে খবর পাইলি হের পরিচয় বিত্তান্ত জিগাইলি না কেরে কুত্তার বাচ্চা?
পরাজয় স্বীকার করে নেয়া কুকুরের মতো লেজ দু’পায়ের ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছে বদু। যদিও তার লেজ নেই। সে তার দু’হাত দু’পায়ের ফাঁকে নিয়ে ঢলতে ঢলতে হাতের দাগ তুলে ফেলার উপক্রম করে ফেলেছে। যদিও তার হাতে আদৌ দাগ আছে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যে হারে হাত কচলায় বদু, তাতে এতোদিনে তার হাত লেভেল হয়ে যাবার কথা।

নুরা পড়েছে ভয় সঙ্কটে। কাউকে সেভাবে জিজ্ঞেস করতে পারছে না। যদি আবার কেউ গোপনে শাহরিয়ার সাহেবের কাছে চলে যায়। এ ভয়ে কুঁকড়ে আছে সে। কেন যেন তার ভয় হতে থাকে। মনে হয় এতোদিনে সে কোন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখে পড়েছে। তাকে উড়িয়ে নিয়ে ফেলবে এঁদো পুকুরে। যেখানে পঙ্কিলতার আবর্তে সে দাঁড়াতে পারবে না কোমর সোজা করে। তার সব অর্জন ধুলোয় লুটাবে অবলীলায়।

-বাউল সাজু

Leave a Reply

Your email address will not be published.