উত্তরাধিকার (১৪ তম পর্ব)

রিয়াদ গাড়ি নিয়ে পুলিশ হেড কোয়ার্টারের সামনে অপেক্ষা করছে রিয়ার জন্য। অসাধারণ রকমের অনুভূতিপ্রবণ মন রিয়ার। এ মন নিয়ে কি করে পুলিশে কাজ করছে এটাই আশ্চর্য। রিয়াদকে পাঁচ মিনিটও অপেক্ষা করতে হয় না। মেয়েটির এটা আরেকটা বিশেষ গুণ। কখনো সে রিয়াদকে বসিয়ে রাখে না। পুলিশের পোশাকে রিয়াকে অসাধারণ লাগে। তার মোহনীয় দেহশ্রী দেখে কেউ ভাবতেই পারবে না যে, তার একটি ছেলে আছে। রিয়াদ তাকিয়ে থাকে রিয়ার হেঁটে আসা পথের দিকে। সে ড্রাইভিং আসন থেকে নেমে বাম দিকের দরজা খুলে ধরে। রিয়া সামনের সিটে উঠে বসে। রিয়াদ ঘুরে এসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। রিয়া বলে ওঠে,

– তুমি যেভাবে হেংলার মতো তাকিয়ে ছিলে আরেকটু হলেই তো পুলিশের পিটুনি খেতে।
– আমার বউকে দেখছিলাম কার কি?
– গায়ে কি তোমার বউয়ের সিল মারা আছে?
– আমাকে কিছু বললে পুলিশের খবর ছিল।
– কিভাবে?
– আমি চিৎকার করে বলতাম, বউ বাঁচাও।
– তুমি একটা পাগল।
– তুমি এতাদিনে বুঝলে? পুলিশের মনে রহম নেই।
– কিভাবে?
– সারা দিনে একবার দেখা হলো অথচ একটুও কিছু দিলে না।
– ওমা, কি দেব কিছু নিয়ে আসি নি তো?
– অন্তত পক্ষে একটা হামি দিতে পারতে।
– তুমি আসলেই একটা পাগল। এখানে কিভাবে?
– কেন সমস্যা কি?
– মানুষ হা করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে।
– দেখলে অসুবিধা কি?
– আপুর কাছে বিচার দেব আমি।

গাড়ি সচিবালয়ের সামনে দিয়ে প্রেসক্লাবের উল্টো দিকের রাস্তায় ঢুকে। শিল্পকলা একাডেমীর আশেপাশে বেশ কয়েকটি চমৎকার রেস্তোরা আছে। একটি রেস্তোরার সামনে গাড়ি পার্ক করে রিয়াদ। রিশার গাড়ি দেখতে পায়। ওরা আগেই চলে এসেছে। পুলিশ দেখে দৌঁড়ে আসে সিকিউরিটির লোকজন। রিয়াদ গাড়ি রেখে দোতলার দিকে হাটা শুরু করে। রিয়া টিপ্পুনি কাটে।
– আমাকে নেবে না?
– না, মামলা খাবার ভয় আছে। খোলামেলা জায়গায় পুলিশের গায়ে হাত দেব।
– এজন্যই তোমাকে এতো ভালোবাসি।
রিয়া এসে রিয়াদের হাতটি নিয়ে তার বগলের নিচে ঢুকিয়ে নেয়। চট করে একটা চুমো খেয়ে নেয়। রিয়াদ হাহাকার করে ওঠে,
– হায় হায়। আমার সাথে কাবিননামা নেই। কে বাঁচাবে আমাকে?
রিয়া বলে,
– ধুর বোকা, উপরে আপা দুলাভাই বসে আছে না।

দোতলায় ওঠেই তারা দেখতে পায় একটি টেবিলে রিশা এবং শোভন বসে আছে। রিয়াদ বলে,
– স্যরি, ভাইয়া, তোমাদের বসিয়ে রেখেছি।
রিশা ফোঁড়ন কাটে,
– আহ, শান্তি পেলাম জংলী আবার মানুষের মতো চিন্তা করছে।
শোভন হেসে জবাব দেয়,
– তা শালাবাবু, পুলিশ ঝুলে আছে কেন? কোন অপকর্ম করেছ নাকি?
– এসেছি মাত্র, বসার সময়টাও দিলে না। দুজনে মিলে একসাথে এ্যাটাকে চলে এলে?
রিয়া বলে,
– আপু, তোমার কাছে আমার বিচার আছে।
শোভন বলে ওঠে,
– আচ্ছা ঠিক আছে, খাবারের অর্ডারটা আগে দাও।
– না, আপু দেবে খাবারের অর্ডার।
রিয়াদ ক্ষেপে যায়,
– এই কিপটে খাবারের অর্ডার দিলে আমার পেট ভরবে না।
সবাই একসাথে হেসে ওঠে। রিয়াদ বেয়ারাকে ডেকে খাবারের অর্ডার দেয়।

শোভন রিয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– এবার মিটিং এর বিষয় প্রস্তাব কর।
রিয়াদ বলে ওঠে,
– ভাইয়া, তুমি এতো বুদ্ধিমান কেন?
– আচ্ছা পাম দিতে হবে না বলে ফেল।
রিশা ফোঁড়ন কাটতে ছাড়ে না।
– ব্যবসায়ী মানুষ কতো হিসেবি, কোথায় বাসায় নিয়ে বউয়ের হাতের রান্না খাওয়াবে তা না করে নিয়ে এসেছে হোটেলে?
– পুলিশ বিয়ে করিয়েছ কেন?
রিয়া কৃত্রিম কান্নাভেজা কন্ঠে বলে,
– আপু, আমাকে কিন্তু তোমরা ভাই বোন মিলে ইনসাল্ট করছো।
শোভন বলে ওঠে,
– সমস্যা নেই, আমি আছি না তোমার পক্ষে।
রিশা কপট অভিমানী কন্ঠে বলে,
– গোপনে গোপনে চলছে নাকি?
রিয়া উত্তর দেয়,
– এমন হ্যান্ডসাম এবং আমলাকে হাতের কাছে পেলে কেউ ছাড়ে?
রিয়াদ কন্ঠে কান্না ফুটিয়ে বলে,
– আপু, তোমার আর আমার কপালে খারাবি আছে। এখন থেকে আরো সাবধান হতে হবে।
ওয়েটার খাবার নিয়ে আসে। তাদের  খুনসুঁটিতে ছেদ পড়ে।

ওয়েটার খাবার দিয়ে যাবার পর তারা মূল আলোচনায় ফিরে আসে। রিয়াদ রিশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– আপু, তোমার রহিমউল্লা ভাইয়ের কথা মনে আছে? শয়তানটার শ্বশুর।
– মনে থাকবে না কেন? আমি কি তোর মতো ভুলো মন? তার কথা কেন?
– সে আমাকে ফোন দিয়েছিল।
– হঠাৎ কি মনে করে?
– বললো তো এমনি কিন্তু আমার বিশ্বাাস হয়নি।
– এইতো বুদ্ধি খুলছে। বাবা থাকতে কেন যে তোর বুদ্ধি হলো না?
রিয়াদের মনের আকাশে দপ করে নেমে আসে ঘুটঘুটে আঁধার। তার চোখ দুটো ছলছল করতে থাকে। রিশা বুঝতে পারে ভুল করে ফেলেছে। নিজের সিট ছেড়ে রিয়াদের পাশে বসে জড়িয়ে ধরে ছোট ভাইটিকে।
– স্যরি, ভাইয়া, আমি তো ফান করছিলাম।
হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে রিয়াদ। হালকা পরিবেশটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসে। রিয়াদের অপর পাশ থেকে রিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে।
– প্লিজ, আপু কষ্ট পাচ্ছে তো, তুমি এতো ছেলে মানুষ কেন?
শোভন ক্ষেপে ওঠে,
– রিশা, তুমি ওকে আর কখনো কষ্ট দিয়ে কথা বলবে না। তুমি জানো, তার মনটা একটা জায়গায় দুর্বল। অথচ তুমি ভুল করে সেটা মনে করিয়ে দাও। তোমাকে আরো সচেতন হতে হবে। তুমি ওর একমাত্র বোন। এটা তোমার মনে রাখতে হবে সব সময়।
রিশার চোখের কোণ ভিজে আসে। কন্ঠ ভারী হয়ে আসে। সে কোন কথার জবাব দিতে পারে না। কেউ না জানুক, বা না জানুক, সে তো জানে ভাইটাকে কত ভালোবাসে। নিজেকে চাপকাতে ইচ্ছে করছে রিশার।

কিছুটা সময়ের মাঝে রিয়াদ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। রিশাকে বলে,
– আপু, স্যরি, আমি সিনক্রিয়েট করে ফেলেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।
– ধুর বোকা, তোর কোন কাজে আমি কষ্ট পাইনা। তুই ছাড়া আমি কার সাথে দুষ্টমি করব বল। সবাই আমাকে কঠিন মনের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তোর কাছে এলে আমি নিজেকে ফিরে পাই।
রিয়া বলে ওঠে,
– আপু, এখনতো আমরা একসাথে থাকতে পারি। রিয়াদ এতো বড় বাড়ি করেছে তোমাদের কথা মাথায় রেখে।
– আমি জানি রিয়া, আমার ইচ্ছে হয় না তা বলব না। আমারও ইচ্ছে হয় আমি আমার ভাইটির পাশে থাকি সারাক্ষণ। কিন্তু শোভনের পরিবারের কাছে তাকে ছোট করি কিভাবে?
শোভন বলে ওঠে,
– রিশা, আমার পরিবারের কেউ কিছু মনে করবে না। তোমরা ভাই বোন একসাথে থাক।
রিশা শোভনকে হালকা ধমক দেয়,
– তুমি চুপ করো। নায়ক সাজতে এসো না। আমি তোমাদের পরিবারের সদস্য রিয়াদের পরিবারের না। আমি কি তোমার পরিবারের কাছে ছোট হবো না ভাইয়ের সংসারে থাকলে? এ বিষয়টি নিয়ে আর কখনো আমরা কথা বলব না। রিয়াদ আমাদের জন্য আলাদা কক্ষ সাজিয়ে রেখেছে। আমরা তো আছি তার বাড়িতে না থেকেও।
রিয়া শেষবারের মতো চেষ্টা করে,
– আপু, তোমরা তোমাদের সরকারী কোয়ার্টার ছেড়ে গুলশানে চলে এসো। কমপক্ষে পাশাপাশি বাসায় থাকি।
রিয়াদ লাফিয়ে ওঠে,
– আরে, পুলিশের মাথায় তো দারুণ বুদ্ধি! তোমার সুন্দর প্রস্তাবের জন্য তুমি আমার কাছে ট্রিট পাওনা হলে। আপু প্লিজ, তুমি আর না করো না। তোমার বাসা দূূরে হওয়াতে আমি মাকে কত ছলছাতুরি করে আটকে রাখি। তোমার বাসায় যেতে দেই না। ভয় হয় যদি আমি বাসায় ফিরে মাকে না দেখতে পাই।
এবার রিশা ক্ষেপে ওঠে,
– এজন্যই তো বলি, মাকে ফোন দিলে এতো অজুহাত দেয় কেন। রিয়া, তোমার হাসব্যান্ডকে রাজনীতিতে নামিয়ে দাও। অনেক বড় নেতা হবে।
– আপু, মন্দ হয় না। নিজেকে খুব কেউকেটা মনে হবে। আপু, আজ তুমি যে অন্যায় করেছ তার শাস্তি হিসেবে তোমরা অফিস থেকে সরাসরি রিয়াদের বাসায় চলে যাবে। আমাদের ভাগ্নে ভাগ্নিদের আনতে আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছি।
– ঠিক আছে, পুলিশের সাথে বেশি দ্বিমত থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। চলো এখন উঠে পড়ি। আমার অনেক কাজ জমা হয়ে আছে। স্যার খুঁজবে আমাকে।
রিয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– রিয়াকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে যাবি। চলো শোভন আমরা বের হই।
শোভন টিপ্পনি কাটে,
– খাবারের বিলটা আমি দেই। তুমি কেমন ধরণের বড় বোন? ছোট ভাইয়ের প্রতি মায়া মমতা নেই।
– দাও, তোমার এতো মায়া হলে।
রিয়া বলে,
– ভাইয়া তোমরা বের হও, তাহলে রাতে দেখা হবে। তোমার কোনো বিশেষ পছন্দের আইটেম করব। মাকে জানাতে হবে, তার জামাই রাতে খাবে।
– তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না, আমার শাশুড়ি বাসায় আছে না। উৎস প্রাপ্তিকে দেখলেই মা বুঝে যাবেন। আপাতত বিদায়।

রিয়াদ বিল মিটিয়ে গাড়িতে উঠতেই রিয়ার তোপের মুখে পড়ে।
– তুমি আপুকে আজ অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছ। কাজটা মোটেই ভালো করো নি।
– আরে বাবা, আমি কি করব? বাবার প্রসঙ্গ উঠলেই আমি ইমোশনাল হয়ে যাই। বাবার ইচ্ছে পূরণ করতে পারি নি তো। অবশ্য বাবা তোমাকে ছেলের বউ হিসেবে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। সেই সুযোগে তুমি বাবার সব আদর একা ভোগ করেছ। কিছু লাগলেই বলতেন, মা রিয়া কইরে?
– আসলেই বাবা আমাকে অনেক বেশি আদর করতেন। আল্লাহ বাবাকে আর কিছুটা দিন আমাদের মাঝে রাখতে পারতেন। কি এমন ক্ষতি হতো আল্লাহর।
রিয়ার চোখের কোণ ভিজে আসে। এমন দেবতুল্য শ^শুর সবার কাম্য থাকে। তার অফিসের সামনে চলে আসে। রিয়াদ গাড়ি থামিয়ে রিয়ার পাশের দরজা খুলে ধরে। রিয়া নেমেই তাকে জড়িয়ে ধরে। রিয়াদের একটু সময় লাগে বুঝতে। ততক্ষণে রিয়া তাকে ছেড়ে সরে দাড়ায়।
– আজ একটু আগে বাসায় চলে এসো। ব্যবসার চেয়ে বউয়ের দিকে একটু নজর দাও।
বলেই রিয়া বিদায় জানিয়ে হাটা শুরু করে। রিয়াদ গাড়ি নিয়ে চলে তার অফিসের দিকে। তাকে জড়িয়ে আছে ভালো লাগার পরশ।

চলবে———-

-বাউল সাজু

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.