আমার মায়ের ঈদ

প্রতি ঈদে আমি নিজে পছন্দ করে আমার মাকে দশটা শাড়ি কিনে দিই। ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী দশ দিনের জন্য দশটা শাড়ি। গোসলের পর পাটভাঙা নতুন শাড়ি পরা আমার মায়ের ভেজা মুখে বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটাগুলো যখন চিক চিক করে, তখন সেই মুখটা ঈদের চাঁদের চেয়েও আমার কাছে বেশি পবিত্র লাগে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখের কোনে জল জমতে শুরু করে। এই জল কিন্তু মোটেও নতুন শাড়ি দেবার আনন্দের জল নয়! এই জল যে কত কষ্টের, কত বেদনার সেটা আমি মাকে বুঝতে দিইনা কোনদিনও। কাউকেই বুঝতে দিইনা।

আমার মা ভীষণ বোকা। বোকা বলতে একেবারেই বোকা! মানুষের যে বুকে কোন ক্ষত থাকতে পারে, অতীতের কোন আঘাতের যন্ত্রণা মাঝে মাঝে নোংরা পুঁজ নিয়ে টন টন করে মাথাচারা দিতে পারে সেসব আমার মায়ের কাছে একেবারেই অজানা! সত্যি কথা বলতে এসব ব্যাপার নিয়ে খুব রাগ হয় আমার মায়ের উপর। বোকামির জবাবে বিরক্ত হয়ে মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে চিৎকার করে মাকে বলি, “কেন তুমি এত মহান হতে চাও? কেন সবাইকে ক্ষমা করতে হবে? কে বলেছে তোমাকে বাংলা সিনেমার নায়িকা হতে……?” আরো অনেককিছুই বলতে ইচ্ছে করে চিৎকার করে। ইচ্ছে করে ঘরের সব জিনিসপত্র, মায়ের সব দামী শাড়ি গয়না সব বাইরে ছুড়ে ফেলে দিই। ইচ্ছে করে ঈদের সকালে মায়ের কষ্ট করে রান্না করে রাখা টেবিল ভর্তি গরম গরম সব খাবার বাইরের কুকুর বেড়ালদের খাইয়ে দিই। মায়ের নিমন্ত্রিত মেহমানদের সামনেই! কিন্তু পারিনা। আমি কিছুই করতে পারিনা। দাঁতে দাঁত চেপে আমি আমার বুকের চাপা কষ্টটাকে মিথ্যে হাসির ছায়ায় নিভিয়ে রাখি। আমার ভীষণ বোকা মা বোঝে না, কিছুই বোঝে না। মা বোকা বালিকাদের মত শাড়ি পাঞ্জাবীর স্তুপ নিয়ে ঘরে ঘরে ছোটাছুটি করে, চাচা চাচীদের কাছে গিয়ে গায়ে হাত দিয়ে জোরাজুরি করে বেছে নিতে বলে। সবাই নিয়ে যা থাকে সেটা নিজের জন্য নিয়ে হাসি মুখে আমার সামনে এসে বলে, “খোকা দেখতো, এইটা আমার জন্য একেবারে পারফেক্ট। তাইনা”! আমার তখন ইচ্ছে করে মায়ের বুকের কাছে ধরে থাকা সেই কাপড়ে আগুন জ্বালিয়ে দিই। রাগে আমার মাথা ধপ ধপ করে। পিশাচগুলার কাছে গিয়ে আমার কষ্টের টাকার শ্রাদ্ধ করে আসার কারণে মাকে দু চার কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আমি পারিনা, কিছু করতে পারিনা। আমি সংযমের মাসে অতি সংযমী হবার যুদ্ধে নামি। লোভী পিশাচগুলোর মুখের নির্লজ্জ হাসি আমাকেও পিশাচ হবার জন্য খোঁচাতে থাকে অবিরাম। কিন্তু আমি পারিনা, পশু হতে পারিনা। আমার মায়ের বোকা বোকা হাসিটার কাছে আমি হেরে যাই। এই বোকা বোকা হাসিটার জন্য আমি ওদের মত নিচে নামতে পারিনা।

ঈদ আসলে আমার মা একেবারেই বাচ্চা মেয়েদের মতন হয়ে যায়। যতই ঈদের দিনটি ঘনিয়ে আসে, মা কিশোরী মেয়েদের মতো ছটফট করে আর আমি একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। মা ঈদের আগের রাতে না ঘুমিয়ে দুই হাতের কনুই পর্যন্ত মেহেদী লাগাবে, চুলে মেহেদী লাগাবে, ঘর ভর্তি তাজা ফুল এনে ভরে ফেলবে, ছয় সাত রকমের মিষ্টি খাবার, পিঠা, বিরিয়ানি, ভুনা মাংস, ছোট চাচার পছন্দের দেশী মুরগীর ঝাল রোস্ট, সেজ চাচার অতিপ্রিয় কাটা মসলায় গরুর মাংস, চাচীদের জন্য হাতের পুলি…হাবিজাবি সব বানিয়ে ঘর ভরিয়ে ফেলবে। ঈদের দিনে সকাল সকাল পাড়ার এতিমখানার সব বাচ্চারা আমার মায়ের কাছে চলে আসে, মা নিজ হাতে তাদের খাবার বেড়ে দেয়, নতুন কাপড় আর চকচকে নোট গুঁজে দেয় হাতে। অপূর্ব সুন্দর একটা আলো ছড়িয়ে পরে আমার মায়ের চোখ মুখ থেকে আমাদের নতুন ঘরের মেঝেতে, দেয়ালপ,আকাশে,বাতাসে। সেই সুন্দর সকাল গুলোতেও পিশাচগুলো নির্লজ্জ হাসি তাদের নোংরা ঠোঁটে ঝুলিয়ে, কবজি ডুবিয়ে মায়ের রান্না করা মজার মজার সব খাবার গলাধঃকরণ করে। অসহ্য লাগে আমার এসব দেখতে! ইচ্ছে করে ঘাড় ধরে এক একটাকে ঘর থেকে বের করে দিই, যেমন করে ত্রিশ বছর আগে ভাতের প্লেট কেড়ে নিয়ে এঁটো হাতে আমাকে গলা ধরে চাচা ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। আমার অপরাধ ছিল, আমার সামনে আমার মাকে অপমান করায় চাচাকে সেদিন বলেছিলাম, “আপনি যদি আমার মুরুব্বী হবার কারণে সন্মান দাবী করতে পারেন, তাহলে আমার মা ও আপনার মুরুব্বী। মায়ের সাথে সন্মানের সাথে কথা বলুন।”

এতিম এক কিশোরের এমন উদ্ধত আচরণে সেদিন চাচা অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিল। দুধকলা দিয়ে কালসাপ পোষার জন্য নিজেকে নিজে গালি দিতে দিতে আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল আমার আপন চাচা! মায়ের ভাষায় – আমার রক্ত, আমার বাবার আপন ভাই! আজো, এতগুলো বছর পরও আমার ঘাড়ে সেই এঁটো হাতের চটচটে নোংরা অপমান লেগে আছে! আমার আপন রক্তের নির্মমতা আমাকে এখনো কাঁদায়! আমি ভুলতে পারিনা। কিছুতেই পারিনা। ভুলে যাওয়া কি এতোই সহজ! আমার কাছে কেন জানি মনেহয়, সৃষ্টিকর্তা ইচ্ছে করেই কিছু কিছু আঘাত জিইয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন! সব আঘাত যদি মানুষ ভুলতে পারত তাহলেতো সবাই সবাইকে শুধু আঘাতই করত!

তখন আমি আর মা দুই চাচার আশ্রয়ে থাকি। মা সারাদিন দুই চাচার বাসার সব কাজ করে আর আমি রাতদিন টেবিলে বসে বসে পড়ি। মা আমাকে বলত, আমাদের সুখী ভবিষ্যৎ এই বইয়ের পাতায় পাতায়। মা আমাকে বলত, এই পরীক্ষার নাম্বারগুলোই পারে আমাদের মুক্তি দিতে! ছোট্ট আমি তখন মনে করতাম আমার মা এই পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান একজন মানুষ! আমি মায়ের কথার যাদুতে ভুলে গিয়ে পাঠ্যবইয়ের রাজ্যে ডুবে যেতাম। আমার মা সারাদিন চাচাদের ঘরের মসলা বাঁটে, কাপড় কাচে, ঘর মোছে আর আমি পরীক্ষার সাদা খাতায় কালো কালির খস খস শব্দে ঝড় তুলে আমাদের মা ছেলের মুক্তির যুদ্ধে নামি। এক ঈদে সালাম করতে গিয়ে হাতে সালামির টাকা গুঁজে দেবার সময় সেজো চাচাকে বলেছিলাম, “চাচা, আমার কিছু দরকারি বই কিনতে হবে”। চাচা সেদিন ’ফকিরনির বাচ্চা’ বলে আমার ঈদটাকে মাটি চাপা দিয়েছিল। সেই ঈদে আমার বোকা মা আমার কাছে লুকিয়ে পাড়ার একজনের কাছ থেকে যাকাতের টাকা চেয়ে এনে আমার বই কিনে দিয়েছিল। আমাকে আর মাকে কথায় কথায় পিশাচ ডেকে বাবার অসুখের সময় টাকার বিনিময়ে জমি লিখে নিয়েছিল এই চাচারা! এই চাচারা চায়নি আমি আর মা বেঁচে থাকি মানুষের মতন। এঁটো খাবার ড্রেনে ফেলে দেবার মত উদার ছিলেন উনারা কিন্তু আমাদের ক্ষুধার্ত মুখ উনাদের চোখে কোনদিনও পরেনি! আর আজ যখন আমি মুক্তির যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে সরকারের একজন উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা, তখন আমার আর আমার মায়ের পরিচয় দিতে গিয়ে অহংকারে উনাদের বুকের ছাতি চার ইঞ্চি ফুলে উঠে!

বছরে একটা দুটো ঈদ! ক্ষমা! উদারতা! সৌহার্দ, সম্প্রীতি!! আরে ভাই, মানুষ চেনেনতো!
মানুষের মন জানেন? মানুষ হয়ে জন্ম নেবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে মন! এই মনটা কিছুই ভুলেনা, ভুলে যাবার ভান করে। তবে আজকে আমার একটাই সফলতা, আমার বোকা মায়ের জন্য ঈদ আসে মহা সমারোহে!

-তাসলিমা শাম্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.