অনুধাবন ( ৮ ম পর্ব )

চাচী, ও চাচী, আজিজ চাচা বাসায় আসে নাই এখনো?

– না গো বাবা, এখনো তো আসে নাই। ওনারে কি দরকার তোমাগো, বাবা?

ঐ তো দলিল দস্তাবেজ নিয়া কথা আর কি। আসলে বইলেন আমি আর লোকমান আসছিলাম।কালকে বিকাল বেলা আসুম আবার। কালকা তো ছুটির দিন আছে, চাচারে বাড়িত থাকতে কইয়েন।

– আইচ্ছা কমু বাবারা।

ছেলে দুটোকে বিদায় করে কোনরকমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন রোমেনা বেগম। দরজা খুলে পেছন দিয়েই বেরিয়ে এলো রোমেনা বেগমের তেরো বছরের মেয়ে রোশনী। ভেতর বাড়ীতে বউ ঝি রা ছাড়া বাইরের কেউ এলে রোশনীর বের হওয়া নিষেধ করেছেন রোমেনা বেগম। নিঃসন্তান রোমেনা বেগম তার মৃত খালাতো বোনের কন্যাটিকে নিজের মেয়ের মতোই বড় করছেন। তিনি আর তার স্বামী আজিজ মিয়া ছাড়া আর কেউই জানেনা এ মেয়ের পিতৃ পরিচয়।

– মা, তোমার মুখ শুকনা দেখা যায় ক্যান?

মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে রোমেনা বেগম জবাব দেন, গরমে বোধহয় রে মা।
কিন্তু মায়ের চোখের ভেতর স্পষ্ট আতংকের ছাপ নজর এড়ায়না রোশনীর। সে লক্ষ্য করে দেখেছে কিছু কিছু লোকের মুখোমুখি হলে তার বাবা মা এরকম অদ্ভুত আচরণ করেন।

– তাইলে তুমি এতো বড় বড় শ্বাস নিতাসো ক্যান? পানি খাইবা? পানি দিমু?

মেয়ের এই প্রশ্নের জবাব কি রোমেনা বেগম এক জীবনে দিতে পারবেন কি না জানেননা। তবু মেয়েকে পাশ কাটাতেই যেন বলে উঠলেন, ‘ হ রে মা, পানি আন, পানি খাই। বড় তেষ্টা পাইসে।’

পানির গ্লাস হাতে নিয়ে রোমেনা বেগম যেন এক নিমিষে তার অতীতে ডুব মারলেন। রোমেনা বেগম আর আমেনা ছিল কাছাকাছি বয়সের দুই খালাতো বোন। রোমেনা বয়সে খানিক বড় হলেও তাদের মধ্যে ছিল দারুন বন্ধুত্ব। রোমেনা বেগমের খালাতো বোন আমেনার রূপ ছিল দশগ্রামের মধ্যে দেখার মতো। কথায় বলে গরীবের মেয়ের রূপ থাকা ভয়ংকর ব্যাপার। সেইটা যে কোন সময় কারো না কারো ভোগে লাগে। কে যে কখন থাবা দিবে কেউ জানেনা। পাশের গ্রামের এক গৃহস্থ বাড়ীতে বিয়ে শাদীও ঠিক হয়েই ছিল। কিন্তু রাস্তার ধারে যে কেউ একজন নিত্য তাকে নজরে রেখেছিল তা বুঝি জানা হয়নি আমেনার। বিয়ের সপ্তাহখানেক আগে পুকুরঘাট থেকে ঘরে ফেরার পথে পুরো একদিনের জন্য আমেনা বেগম হারিয়ে যায়। কে বা কারা নিয়ে গিয়েছিল কাকপক্ষীও জানে নাই। তারপরের ইতিহাস বড় করুণ। কে আমেনাকে তুলে নিয়ে গেসিল তা না জানলেও কেউ নিয়ে গিয়েছিলো সেটা ঠিকই সবাই জেনে যায়। সমাজের অদ্ভুত কিন্তু হাস্যকর নিয়মে দুষ্কৃতিকারী সাজা পায়না, শুধু ভোগান্তীর শিকার হয় মেয়েটা আর তার পরিবার। ফলাফল বিয়ে ভেঙে যায়। আর পুরো পরিবার মেয়ের কোন দোষ না থাকা সত্ত্বেও একঘরে হয়ে যায় লোকের কথার দাপটে। মেয়ের গরীব বাবা পরের সপ্তাহে রাতের অন্ধকারে বৌ মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় কোথায় কেউ জানেনা।

নতুন জায়গায় টুকটাক কাজ করে সংসার চললেও কয়েক মাস না যেতেই ধরা পরে আমেনা পোয়াতি।পুরো পরিবারে নেমে আসে আসন্ন বিপদের ছায়া। কি করবে এই বাচ্চাকে নিয়ে তারা। তার ওপর নতুন জায়গাতেও আমেনার ওপর কারো কারো নজর পড়ছিল। বাপ মা মিলে সিদ্ধান্তে আসে হওয়ার পর বাচ্চাটা কাউকে দিয়ে দিবে। বারেবারে ঘর পাল্টে মেয়েকে আগলে রাখতে যেয়ে বাবা মা বুঝি নিজেদের মনের যন্ত্রনা নিয়েই বেশী ব্যস্ত ছিল। মেয়ের মনে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনটুকু যেন কারো চোখেই পড়েনি। অবশ্য গরীবের ঘরে মানসিক রোগ বোধহয় ঘোড়া রোগের সামিল। দিন দিন করে আমেনার একা একা নিজের সাথে বিড়বিড় করে কথা বলা, অকারণ ভয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠা কিংবা কখনো কখনো কাউকে চিনতে না পারার ব্যাপারটা জীবন সংগ্রামের ভারে সদা মুহ্যমান বাবা মায়ের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে যায়।

বাচ্চা হতে কোন রকম সমস্যা হয়না আমেনার। কিন্তু বাড়ি ফেরার এক সপ্তাহের মাঝেই একরাতে আমেনাকে খুঁজে পাওয়া যায়না তার ঘরে। সকালে তার বাবামায়ের ঘুম ভাঙে পাড়া প্রতিবেশীর চিৎকারে। বস্তির পাশের আমগাছে ঝুলন্ত আমেনাকে দেখে তার মায়ের গগনবিদারী চিৎকারে যখন দুনিয়া প্রকম্পিত তখনই আমেনার গ্রামের বাড়িতে তারই খালাতো বোন বাচ্চা না হওয়ার দোষে শ্বশুরবাড়ির লোকের কথায় জর্জরিত হয়ে আকুল হয়ে কাঁদছিল। একটা বাচ্চা জন্ম না দিতে পারার জন্য বুঝি বিয়েটাই ভেঙে যায় যায় অবস্থা।

তারপরের ঘটনাগুলো ঘটে গেলো সহসাই। শহরে কোথায় কবর দেবে বুঝতে না পেরে আমেনার লাশ নিয়ে তার বাবা মা আবার গ্রামে ফিরে আসে। আমেনার যে একটা বাচ্চা হয়েছে এরকম কিছুই তারা জানায়নি প্রতিবেশীদের শুধু নিজের বোনদের ছাড়া। সদ্য দুধের শিশুকে দেখলেই বুঝি আমেনার মায়ের নিজের মেয়ের কথা মনে পড়তো। বাচ্চাটাই তার মেয়ের মৃত্যুর কারণ মনে করে কেন যেন তারা দুজনের কেউই তাকে সহ্য করতে পারতোনা। খালার মনের এই অবস্থার সুযোগ নেয় রোমেনা।আজিজ মিয়ার সাথে পরামর্শ করে রোমেনা তাই যখন সেই বাচ্চাটিকে নিজের কোলে পিঠে করে মানুষ করতে চাইলো আজিজ মিয়া তখন আর বাঁধা দেয়নি। অন্তত কিছু একটা নিয়ে রোমেনা তাহলে ব্যস্ত থাকবে।

রোমেনা বেগমের বাবা কিছুতেই চাননি আজিজ মিয়ার কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে। তালুকদারের পরিবার বা তার আড়ত বা ব্যবসায় কাজ করা কারো সাথেই বিয়ে দেবেনা এরকম ইচ্ছাই ছিল সহজ সরল গৃহস্থ রোমেনার বাবার। অন্যদিকে আজিজ মিয়া তালুকদারের সবচেয়ে জটিল কাজ অর্থাৎ দলিলপত্র দেখা শোনা করে। কাজেই এক বাক্যেই বিয়ের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। কিন্তু নিত্য আজিজ মিয়ার ঘ্যানঘ্যান আর শেষমেষ তালুকদার সাহেবের কাছ থেকে শোনা কথায় মেয়ের বিয়েটা হয়েই যায় আজিজ মিয়ার সাথে মেয়ের বিয়ের বয়সের আগেই। গ্রামের নিয়মে বছর না ঘুরতেই দেখা যায় মেয়েরা পোয়াতি হয়ে যায়। কিন্তু কয়েক বছরেও রোমেনার ঘরে কোন নতুন মুখের খোঁজ না আসায় চারদিকে সবাই আজিজ মিয়াকে আরেকটা বিয়ে করতে বলে। রোমেনা বেগমকে আজিজ মিয়া সেই ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করে। বাচ্চা হওয়ার দোষে সবাই রোমেনাকে দোষারোপ করলেও তিনি শক্তহাতেই রোমেনার হাত ধরে রাখেন সবসময়।

রোশনীকে যেদিন নিজের মেয়ে করে বাড়ীতে নিয়ে আসেন বাড়ীর লোকে নানা কথা বললেও তারা স্বামী স্ত্রী কারো কথা কানে তোলেন নি। নিজের সমস্ত মায়া দিয়ে তিনি তাকে বড় করে তুলেছেন। কিন্তু যতোই বড় হচ্ছে মেয়ের চেহারায় মায়ের রূপের খানিকটা পাওয়ার সাথে সাথে তত তার বাবার ছাপও যেন স্পষ্ট হচ্ছে। তানিয়ার পিতৃ পরিচয় যে তিনি তার খালাকে দিব্যি কেটে বলেছেন কাউকে জানাবেন না। তাই ভয় পান, পাছে লোকে মেয়েটাকে কোনভাবে অন্য কোন কথা বলে। পারলে পাখি মায়ের মতো মেয়েকে প্রায় ডানার নীচে লুকিয়ে রাখেন যতোটা সম্ভব। স্কুলের সময় ছাড়া মেয়েকে বাড়ির বাইরে কোথাও যেতেই দেন না।

সময় থাকলে বুঝি ভাবনার জাল আরো ডালপালা মেলে বসতো। কিন্তু দরজার কাছে আজিজ মিয়ার গলার শব্দে হুঁশ ফেরে রোমেনার। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে এসেছে। অথচ তালুকদারের দুই ভাস্তে আজ আজিজ মিয়ার খোঁজে বাড়ি আসার পর থেকেই রোমেনা বেগমের মনে একটা চোরা অস্বস্তি ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। এর আগেতো আর কখনো বাড়ি পর্যন্ত আসেনি ছেলেগুলো।

– কি গো রোমেনা বেগম, তোমারে এমন পেরেশান দেখা যায় ক্যান?

কমু কি হইসে। তার আগে কন তালুকদারের ভাইস্তাগো লগে আপনের কি কাম? তারা আজকা বাড়িত আইসা আপনেরে খুঁইজা গেসে।

– তাগোরে তো বলছিলাম আড়তে আসতে। তারা বাড়িত আসছে ক্যান? কিছু কইয়া গেছে?

হ।কালকে বিকালে আইবো কইসে। আপনেরে বাড়িত থাকতে বলসে। কইলেন না কি কাম?

– আইচ্ছা কইতাসি। তালুকদার সাবের কাছে তারা তাদের ভাগের জমির দলিল চাইসে। সাবে কইসে আমি যেন দেখায়া দেই। আমি কইসি আড়তে আইতে। কিন্তু তারা বাড়িত ক্যান আসছে সেইটা তো আমিও বুঝতেসিনা।

‘সেই সকাল বেলা দুই পোলা আইলো আমাগো বাড়িত। সেই থেইকা মা গাল ঘুরায়া কি যে চিন্তায় বসছে, কিছু বলেও না, করেও না। বাপজান আপনে আইসাও সেই পোলাগোরে নিয়াই কথা শুরু করসেন। আমি একটা মানুষ ও থাকি এই বাড়িতে।’ মেয়ে রোশনীর এমন পাকা কথা শুনে বাপমা দুজনেই নিজেদের মনের শংকা জালকে দূরে ঠেলে হাসিমুখে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে।

……………..

ভাসা ভাসা চোখের স্নিগ্ধ রোশনীর দিকে তাকিয়ে অজানা আশংকায় থেকে থেকে কেঁপে ওঠে রোমেনা বেগমের বুক। মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। বিয়ের বাজারে কেউ যদি মেয়ের পিতৃ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে? কত বড় ঘরের মেয়ে হতে পারত সে? অথচ কপালের কি ফের বাপের চেহারা পাওয়াটাই যেন একটা বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েটার জীবনে।

দিশেহারা মন ভয়ে অকারণ
কাঁপে বুঝি শংকায়,
ভবিষ্যতের শংকারা যেন
থেকে থেকে উড়ে যায়।

 

চলবে….

-ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

Leave a Reply

Your email address will not be published.